কীভাবে শুরু আস্থা ভোট ও ভারতীয় রাজনীতিতে কোন পথে এগিয়ে চলেছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের এই পরীক্ষা ?

author img

By ETV Bharat Bangla Desk

Published : Feb 13, 2024, 6:15 PM IST

Nitish Kumar

Testing the floor: ফ্লোর টেস্ট, যাকে 'আস্থা ভোট'ও বলা হয়, দু’টি প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও বিহারে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’বার অনুষ্ঠিত হয়েছে । রাজ্যসভার প্রাক্তন মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত আইএএস বিবেক কে. অগ্নিহোত্রী, আইএএস ভারতের সংসদ ফ্লোর টেস্ট এবং এর উৎপত্তি সবিস্তারে আলোচনা করেছেন ।

হায়দরাবাদ, 13 ফেব্রুয়ারি: আস্থা ভোট৷ সরকার গঠনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে যা অত্যন্ত জরুরি ৷ সম্প্রতি পাশাপাশি দু’টি রাজ্যে দু’টি আস্থা ভোট বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছে ৷ ঝাড়খণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন হওয়ায় একই জোট সরকারকে আবার আস্থা ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হয়েছে ৷ অন্যদিকে বিহারে একই নেতা আবার ক্ষমতায় ফিরেছেন অন্য জোটের মাধ্যমে ৷ তাই তিনি তাঁর সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছেন আস্থা ভোটে ৷

গত 31 জানুয়ারি ঝাড়খণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে হেমন্ত সোরেন ইস্তফা দেন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট তাঁকে গ্রেফতার করার ঠিক আগে ৷ এরপর ক্ষমতাসীন জোট তাদের নেতা হিসেবে চম্পাই সোরেনকে বেছে নেয় এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চম্পাইকে নিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে রাজ্যপালের কাছে একটি চিঠি জমা দেয় । কিছুটা অচলাবস্থার পর রাজ্যপাল সম্মতি দেন এবং চম্পাইকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান । চম্পাই ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ৷ এর পর গত 5 ফেব্রুয়ারি তাঁর সরকার ঝাড়খণ্ড বিধানসভায় 47 ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে ৷ বিরোধীরা পায় 29টি ভোট৷ আস্থা ভোটের আগে রাজ্যপাল পঞ্চম ঝাড়খণ্ড বিধানসভার 14তম অধিবেশনে ভাষণ দেন ও আস্থা প্রস্তাবের উপর আলোচনা হয় ।

বিহারে গত 28 জানুয়ারি জেডিইউ-আরজেডি ও কংগ্রেসের মহাজোটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেন নীতীশ কুমার ৷ ওই দিনই তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে সামিল হয়ে ফের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেন ৷ গত 12 ফেব্রুয়ারি বিহার বিধানসভায় আস্থা ভোট হয় ৷ তা শুরু হয় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে ৷ কারণ, অধ্যক্ষ পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিলেন ৷

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ 179 (সি) এর প্রথম বিধান অনুসারে স্পিকারের বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব কমপক্ষে 14 দিনের নোটিশ দেওয়ার পরেই উত্থাপন করা যেতে পারে । যেহেতু 28 জানুয়ারি বিজেপি নেতা নন্দ কিশোর যাদবের তরফে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাই এই প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য বিধানসভা অধিবেশন 12 ফেব্রুয়ারি ডাকা হয়েছিল ।

2022 সালের অগস্টে একই ঘটনা ঘটার পরিস্থিতি তৈরি হয় ৷ তখন বিহার বিধানসভায় অধ্যক্ষ ছিলেন বিজেপি নেতা বিজয় কুমার সিনহা (বর্তমানে নতুন সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী) ৷ তখন বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আরজেডি, কংগ্রেস ও বামেদের নিয়ে সরকার গড়েন নীতীশ কুমার ৷ সেই সময় বিজয় কুমার সিনহা প্রথমে পদত্যাগে অস্বীকার করেন ৷ তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়৷ কিন্তু তার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন ৷ অনুচ্ছেদ 181 (1) অনুসারে, যাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, তিনি সভা পরিচালিত করতে পারেন না ৷

গত 12 ফেব্রুয়ারি বিহার বিধানসভার দুই কক্ষের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন রাজ্যপাল ৷ শুরু হয় বাজেট অধিবেশন ৷ অধিবেশনের কার্যবিবরণীতে প্রথমেই ছিল অধ্যক্ষ অবধ বিহারী চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ৷ ওই অনাস্থা প্রস্তাবের সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার মহেশ্বর হাজারী । 125 জন বিধায়ক প্রস্তাবের পক্ষে এবং 112 জন বিরোধিতা করে ভোট দিয়ে স্পিকারকে অপসারণ করেন ৷ মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার তখন নতুন এনডিএ সরকারের জন্য আস্থা ভোট চেয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করেন । বিরোধীরা ওয়াক আউট করার পর ধ্বনিভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবটি 129-0 ভোটে পাশ হয় ।

এর আগে একই রকম পরিস্থিতিতে বা অচলাবস্থায় যখন রাজ্যপালদের সরকার পরিচালনার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা স্বেচ্ছাচারী বিচক্ষণতার প্রয়োজন ছিল, তখন বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হত । কখনও কখনও কোনও নেতা সরকার গঠনে আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য বিধায়কদের সমর্থন সংক্রান্ত স্বাক্ষরিত চিঠি রাজ্যপালের কাছে জমা দিতেন ৷ কখনও কখনও আবার রাজ্যপাল সমর্থন দেওয়া বিধায়কদের রাজভবনে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিতেন ৷ কিন্তু সবসময় এটা কার্যকরী হত না ৷ শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় বিরোধীরা সরকার ফেলে দিতে অনাস্থা প্রস্তাব আনত ৷ ফলে পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু হত ৷

তাহলে আস্থা ভোটের নিয়ম কী এবং এটি কীভাবে চলছে ? এসআর বোম্মাই বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (1994) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য আস্থা ভোটের উৎপত্তি হয়, এমনটা বলা যেতে পারে । এসআর বোম্মাই 13 অগস্ট 1988 থেকে 21 এপ্রিল 1989-র মধ্যে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন । ভারতের রাষ্ট্রপতি 21 এপ্রিল 1989 সালে এসআর বোম্মাই সরকারকে 356 অনুচ্ছেদের অধীনে বরখাস্ত করেছিলেন ৷ কারণ, হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে ওই সরকার বহু বিধায়কের দলত্যাগের পরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে ৷ তার পর ওই রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয় । এসআর বোম্মাই বিধানসভায় তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরীক্ষা করার সুযোগ চেয়েছিলেন ৷ কিন্তু কর্ণাটকের তৎকালীন রাজ্যপাল তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন । পরবর্তীকালে নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও হিমাচল প্রদেশে রাজ্য সরকারগুলিকে বরখাস্ত করা এবং আইনসভাগুলি ভেঙে দেওয়ার অন্যান্য ঘটনা ঘটে ।

রাজ্য সরকারগুলির নির্বিচারে বরখাস্ত ও রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করার পাশাপাশি ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের লড়াই সংক্রান্ত মামলার পটভূমিতে সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতির বেঞ্চ (এসআর বোম্মাই মামলা) জানায় যে বিধানসভায় আস্থা ভোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে একমাত্র উপায় ৷ রাজ্যপালের মতামত নয় ৷ ওই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ফ্লোর টেস্ট শব্দটি ব্যবহার করে ৷ সেখান থেকেই ফ্লোর টেস্ট শব্দটি এসেছে ৷

আরও পড়ুন:

  1. লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের ফসল সংবিধান রক্ষাই আসল চ্যালেঞ্জ
  2. 'নীতীশ কুমার ক্লান্ত মুখ্যমন্ত্রী, লোকসভা নির্বাচনেই শেষ হবে জেডিইউ', মন্তব্য লালু-পুত্র তেজস্বীর
  3. 'জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী', আস্থাভোটের আগের রাতে রাঁচি ফিরে জানালেন জোটের বিধায়করা
ETV Bharat Logo

Copyright © 2024 Ushodaya Enterprises Pvt. Ltd., All Rights Reserved.