বাংলা সম্প্রীতির পীঠস্থান ! প্রমাণ করল পুইনানের বিশ্ব ইজতেমা
পরপর তিনদিন দেশ বিদেশের লাখো লাখো মানুষের জমায়েত হয়েছে ৷ আজ বিশ্ব ইজতেমা শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয়েছে ।

Published : January 5, 2026 at 8:20 PM IST
পুইনান (হুগলি), 5 জানুয়ারি: যেদিকে চোখ যায়, শুধু মানুষের মাথা, ত্রিপলের ছাউনির ছোট বড় তাঁবু । হুগলির পুইনান গ্রামে বিশ্ব ইজতেমা যেন মানুষের মিলনমেলা । যা ধর্মের রাজনীতি করা হিংসার কারবারিদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল ।
এ বছরে হুগলি দাদপুর থানার পুইনানে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজিত হয় । যা ছাব্বিশের বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বললে ভুল বলা হবে না । কারণ, হুগলি জেলার হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ নজির গড়েছেন । পরপর তিনদিন দেশ বিদেশের লাখো লাখো মানুষকে আপ্যায়ন করেছেন তাঁরা । আগত অতিথিদের সহযোগিতা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় সবরকম বিশৃঙ্খলা এড়ানো গিয়েছে । আজ ফজরের নমাজে (ভোরের নামাজ) শেষ দোয়ার পর বিশ্ব ইজতেমা শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয়েছে ।

60 বর্গ কিলোমিটার জুড়ে আয়োজিত বিশ্ব ইজতেমায় হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের চাষের জমি । কেউ ধান চাষ করেছিলেন তো কেউ অন্যান্য সবজি । কিন্তু এই লাখ লাখ মানুষের জন্য সকলেই ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ নিয়ে এই মহাআয়োজনের জন্য জমি ছেড়ে দিয়েছিলেন । এসাইনদের বক্তব্য হিন্দু মুসলিম যে কোনও সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে সকলের উপস্থিতি কাম্য। আন্তর্জাতিক স্তরের এ ধরনের কর্মসূচিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকলে পাশে না দাঁড়ালে তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না ।
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেরই মুখে শোনা গেছে,"মুসলিম তো কী হয়েছে ! আমাদের জমি আছে জমিতে ফসল ছিল । ক্ষতিপূরণ দিয়েছে জমি দিয়ে দিয়েছি । বাকি টাকাও দেওয়া হয়নি, আমরাও নিতাম না । শান্তিপূর্ণভাবে প্রার্থনা চলছে । চলুক না ।" এই বিপুল মানুষের সমাগমকে ঘিরে ছোটখাটো চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ঘুগনি-মুড়ি বা অন্যান্য খাবারের দোকান শীতবস্ত্রের দোকান বসেছিল । হিন্দু মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিও সেখানে দেখা গেছে । পথচলতি ভিন ধর্মের টোটো চালক ও রিক্সাচালকও ইজতেমায় আগতদের নানা রকম ভাবে সহযোগিতা করেছেন ।

এ ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বা ইজতেমায় ছবি বা ভিডিয়োগ্রাফি নিষিদ্ধ । যে কারণে মূল মঞ্চ থেকে বহু দূর থেকে কখনও ড্রোন ভিডিয়ো, কারও বাড়ির ছাদ থেকে নেওয়া ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে । বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বী সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী এই বিশাল আয়োজন সম্পর্কে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন । শান্তিপূর্ণভাবে এ ধরনের আয়োজন যে সম্ভব তা তারা বলছেন । শুধু তাই না এই বিশাল এলাকা জুড়ে আয়োজিত ইজতেমা কেন্দ্রের মাঝে একটি হিন্দু মন্দিরও দেখা গেছে। যা সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে । আগত মুসলিমদের কেউ মন্দির নিয়ে বিদ্বেষ পোষণ করেননি । বরং, ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রেখে সম্মান জানিয়ে নিজের ধর্মীয় রেওয়াজ সেরেছেন ।
তবে, আয়োজকদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন,"ছবি ভিডিয়ো তোলা নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিকদের ভিড় কম ছিল । রাজ্যের শাসক দলের একাধিক মন্ত্রী পদাধিকারী যেমন এসেছিলেন ঠিক তেমনি কংগ্রেস-সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও আমাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে গেছেন । ঠিক তেমনি জেলাশাসক মহকুমা শাসক থেকে শুরু করে রাজ্য পুলিশের ডিজিও এসেছিলেন । সকলের সহযোগিতায় স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে সুষ্ঠুভাবে শান্তিপূর্ণভাবে ইজতেমা সম্পন্ন হয়েছে । এটাই হল বড় ব্যাপার ।"
আজ বিশ্ব ইজতেমার শেষদিন উপলক্ষে ভারত-সহ অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, ইরান-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেকর্ড সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা জড়ো হন । তাঁদের অনেকে সকালে পৌঁছে রাতে বাড়ি ফিরেছেন । কেউ এই প্রবল শীতে খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটিয়েছেন । ঠিক কত মানুষ এসেছেন ? তার সঠিক হিসেব করা কার্যত অসম্ভব । কেউ বলছেন 50 লক্ষ, কেউ 80 লক্ষ, আবার কারও মতে সংখ্যা ছুঁয়েছে কোটির কাছে । এই বিপুল মানুষের সমাগমে প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করা ।
সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হয়েছে বলা চলে । কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা ছিলই । যদিও 'দ্বীনে'র কাজে আগত মুসল্লিদের নিষ্ঠায় ঢাকা পড়েছে । যানজট নিয়ন্ত্রণে ইজতেমা স্থলের প্রায় চার পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় । চুঁচুড়া, তারকেশ্বর রুটের চুঁচুড়া চন্দননগর স্টেশন পশ্চিমে ধনেখালি হল্ট স্টেশন, মহেশ্বরপুর দুর্গাপুর রোড হয়ে পায়ে হেঁটে কাতারে কাতারে মানুষ পুইনানে পৌঁছায় । মহেশ্বরপুরের রাস্তায় পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেছে পুলিশ প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা । এখনও পর্যন্ত কোনও বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি । এই চার পাঁচ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার ক্ষেত্রে তরুণ বা যুবকরা সক্ষম হলেও বহু ক্ষেত্রে ভারী ব্যাগ বয়ে নিয়ে যেতে বয়স্কদের অসুবিধা হয়েছে । কিন্তু 'দ্বীনে'র কাজে আগত মুসল্লিরা, সেই কষ্টকে মনে সয়েছেন ।
ইজতেমায় যোগ দিতে এসে বিভিন্ন কারণে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন । তাঁদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য দফতরের উদ্যোগে প্রায় 60 বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ইজতেমা ময়দানের আশপাশে চারটি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলা হয় । সেখানে মোট 120টি শয্যা, 24 ঘণ্টা চিকিৎসক পরিষেবা, লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা রাখা হয় । পাশাপাশি একাধিক মোবাইল স্বাস্থ্য পরিষেবা ও অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন ছিল । কেউ অসুস্থ হওয়ার খবর পেলেই দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ।
জেলা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত তিন দিনে প্রায় 40 হাজার মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়েছে । এর পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা পেয়েছেন প্রায় 3 হাজার জন । গুরুতর অসুস্থ হয়ে 360 জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে । তবে, চিকিৎসা চলাকালীন পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে ।
হুগলি জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক মৃগাঙ্ক মূলিকির বলেন, রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সম্ভাব্য সকল সহায়তা প্রদান করেছে । হুগলি জেলার স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লকের বিএমওএইচরাও এই কাজে জড়িত ছিলেন । যেহেতু ইজতেমা পোলবা-দাদপুর ব্লক এলাকায় ছিল, তাই পোলবা ব্লক হাসপাতালের কর্মীদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল । বিপুল জনসমাগম সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণভাবে ইজতেমা সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসন, আয়োজক কর্তৃপক্ষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে ।

