বাংলাদেশে শিক্ষকতা করেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা নিচ্ছেন নদিয়ার মহিলা
অভিযোগ, মহিলা একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিক ৷ দুই দেশের সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন ৷ রয়েছে ভারতের ভোটার থেকে আধার কার্ড ৷

Published : November 12, 2025 at 5:51 PM IST
কৃষ্ণগঞ্জ, 12 নভেম্বর: একই সঙ্গে দুই দেশের নাগরিক । বাংলাদেশের স্কুলে শিক্ষিকতা করেন ৷ পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে রেশন, সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধাও নিচ্ছেন ৷ এমনকি নির্বাচনের সময় ওপার বাংলা থেকে পাড়ি দিয়ে এদেশে এসে ভোট দিয়ে যান ৷ এমনই অভিযোগ শিউলি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ৷ ননদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নদিয়ার গৃহবধূ মৌসুমী মণ্ডলের।
মৌসুমীর অভিযোগ, ননদ শিউলি ও ননদের স্বামী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস তাঁরা দু'জনেই বাংলাদেশে গোপালগঞ্জ ওড়াকান্দির বাসিন্দা । পেশায় দু'জনই শিক্ষক এবং বাংলাদেশের ভোটার ৷ ওপার বাংলার স্কুলে দু'জনেই শিক্ষকতা করেন ৷ তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে ৷ কিন্তু শিউলি ও বিশ্বজিৎ বাংলাদেশের পাশাপাশি নদিয়ার বগুলার ভোটার ৷
মৌসুমীর আরও অভিযোগ, ননদের স্বামী বিশ্বজিৎ বিশ্বাসও এদেশে ভোটার তালিকায় নাম তুলিয়েছেন ৷ এমনকি বিশ্বজিতের রয়েছে এদেশের আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং রেশন কার্ড । একইসঙ্গে তাঁর ননদ শিউলি বিশ্বাস বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এখনও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি সুযোগ সুবিধা যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং রেশন পাচ্ছেন ৷
এ নিয়ে কৃষ্ণনগর জেলা পুলিশের ডিএসপি শিল্পী বলেন, "ইতিমধ্যেই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে । আমরা তদন্ত শুরু করেছি । যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে ।"
মৌসুমীর আরও অভিযোগ, ননদের দুই সন্তান থাকে বাংলাদেশে ৷ সেখানকার স্কুলে পড়ে তারা ৷ পাশাপাশি তাদেরকে এখানে গাড়াপোতার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা রয়েছে । তারা কোনও ঝঞ্ঝাট ছাড়াই, সশরীরে স্কুলে উপস্থিত না-থেকেও প্রতি বছর এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে ৷ এসআইআর আবহে মৌসুমীর এই অভিযোগ সামনে আসার পরই শোরগোল পড়ে গিয়েছে জেলাজুড়ে ৷
অভিযোগকারী গৃহবধূ মৌসুমী মণ্ডলের বাড়ি নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের মাজদিয়া নাঘাটা এলাকায় । বছরখানেক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুমীর বিয়ে হয় বগুলার কলেজ পাড়ার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে (মৌসুমীর ননদের নামও বিশ্বজিৎ বিশ্বাস)। মৌসুমী দাবি করেন, তাঁর স্বামী কলকাতা পুরনিগমে কর্মরত । বিয়ের পর সংসার সুখেই চলছিল তাঁদের ৷ হঠাৎ মাস দেড়েক আগে তাঁর সন্দেহ হয়, স্বামী গোপনে কী যেন ওষুধ খান । মৌসুমী এরপর গোপনে স্বামীর ব্যাগ থেকে সেই ওষুধ সংগ্রহ করে চিকিৎসককে দেখান ৷ চিকিৎসক তাঁকে জানান, তাঁর স্বামী কঠিন রোগে আক্রান্ত । এরপর মৌসুমীর পরিবারের লোকজন জামাইকে কলকাতার একটি দামি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান ।
এই ঘটনার পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে । অভিযোগ, তারপর মৌসুমীকে শ্বশুর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় ৷ এমনকি বাড়িতে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় । এরপর মৌসুমী সমস্ত ঘটনা জানিয়ে হাঁসখালি থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন । সেই অভিযোগপত্রে তিনি জানান, তাঁর শ্বশুর সুনীল কুমার বিশ্বাস-সহ পুরো পরিবার বাংলাদেশের নাগরিক ৷ শ্বশুর বাংলাদেশে শিক্ষকতা করতেন এবং পাশাপাশি এদেশে একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকও। তাঁর স্বামীরা দুই ভাই ৷ দুই ভাই বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরি করেন ৷ মৌসুমীর স্বামী কলকাতা পুরনিগমের কর্মী ৷ আর ভাসুর বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে চাকরি করেন ৷
মৌসুমী মণ্ডল বলেন, "এসআইআর আবহে আমার শ্বশুর সুনীল বিশ্বাস মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বগুলার বাড়িতে এসে রয়েছেন । শাশুড়ি জবারানি বিশ্বাস তাঁর পাসপোর্ট বাংলাদেশে পাঠিয়ে পুড়িয়ে দেন ৷ তিনি এবার থেকে এখানেই থেকে যাবেন বলে এই কাণ্ড করেছেন ৷ আমাকে ওরা ঠকিয়েছেন ৷ আমি চাই, পুরো পরিবারের শাস্তি হোক ৷ আমি পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছি ৷" মৌসুমীর মা মঞ্জু মণ্ডল বলেন, "যখন মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম তখন জানতাম না ওরা বাংলাদেশি ৷ ওদের শাস্তি চাই ৷"
যদিও মৌসুমীর তোলা অভিযোগ কথা মানতে নারাজ শাশুড়ি জবারানি বিশ্বাস ৷ এমনকি তাঁর যে মেয়ে বাংলাদেশে থাকেন সেটাও তিনি অস্বীকার করেন । তিনি বলেন, "আমার দুই ছেলে ৷ কোনও মেয়ে নেই । আমার বউমা মিথ্যা অভিযোগ করছে ৷ আমরা এখানকার বাসিন্দা ৷ আমার বউমা খুব বাজে ৷ কাঁচি দিয়ে আমার চুল কাটতে গিয়েছিল ৷ ও আমাদের উপর অনেক অত্যাচার করেছে ৷ আমার ছেলেকে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে চায় ৷" যদিও প্রতিবেশীদের দাবি, জবারানির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে ৷
বিজেপি নেতা অমিত প্রামাণিক বলেন, "আমরা যে আশঙ্কা করছিলাম সেটাই সত্যি প্রমাণ হল । এই জন্যই তো এসআইআর-এর প্রয়োজন । জাল ভোটার কার্ড, জাল আধার কার্ড, জাল পাসপোর্ট, পাশাপাশি অন্য দেশে বাস করে টাকা দিয়ে স্কুলের শিক্ষককে কিনে একের পর ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়া অপরাধ ৷ ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এদের বিরুদ্ধে । দুই দেশের নাগরিকত্ব ও দুই দেশের সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে ৷ এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী রাজ্য সরকার ।"
পাশাপাশি তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, "গৃহবধূ পুলিশকে লিখিতভাবে সমস্ত ঘটনা জানানো সত্যেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি ৷ কারণ শাসক দলের মদতে এরা এই সমস্ত কাজ করে চলেছে । যার জন্য পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না ।" স্থানীয় তৃণমূল নেতা অনুপ দাস বলেন, "এটা অপরাধ ৷ একই ব্যক্তি দুই দেশে বসবাস করছে, দুই দেশের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে, এটা ঘোরতর অন্যায় । প্রশাসন নিশ্চয়ই এর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে ।"

