এবারও কি বাংলাদেশকে ছাড়াই হবে কলকাতা বইমেলা, কী বলছে গিল্ড
সোমবার কলেজ স্ট্রিটের অদূরে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বইয়ের মেলা হল৷ ভেজা বইয়ের সেই মেলা থেকে কমদামে পছন্দমতো বই কিনলেন বইপ্রেমীরা৷

Published : November 3, 2025 at 9:28 PM IST
কলকাতা, 3 নভেম্বর: আশ্চর্য সমাপতন! আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার থিম কান্ট্রি যেদিন ঘোষণা হল, সেইদিনই মহানগরের বইপাড়া কলেজ স্ট্রিটে দেখা অভিনব বইমেলা৷ তাই সব মিলিয়ে 3 নভেম্বর সোমবার দিনটা কলকাতা-সহ বাংলার বিভিন্ন অংশের বইপ্রেমীদের কাছে উল্লেখযোগ্য হয়ে রইল৷
এদিন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজক পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের তরফ থেকে এবারের বইমেলার থিম কান্ট্রির নাম ঘোষণা করা হয়৷ এবার থিম কান্ট্রি হচ্ছে মেসি-মারাদোনার দেশ আর্জেন্টিনা৷ অন্যদিকে এদিনই কলেজ স্ট্রিটের অদূরে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে হল ভেজা বইয়ের মেলা৷ মাসখানেক আগে বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত বইগুলিকে কম দামে বিক্রি করা হল সেখানে৷
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা
শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। আগামী 22 জানুয়ারি থেকে 3 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা চলবে। এই বছর বইমেলার 39তম বছর। থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা। প্রতিবছরের মতো এবারেও বিভিন্ন দেশ অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু সেই নামের তালিকায় এবারেও বাদ পড়েছে বাংলাদেশ। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, "আমরা চাই বাংলাদেশ দিল্লি ঘুরে আসুক।" অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নিয়েই বইমেলায় অংশ নিক সেই কথাই পরোক্ষভাবে বোঝাচ্ছে গিল্ড।
বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় অংশ নিয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু এই বছর প্রথম থিম কান্ট্রি হিসাবে মেসি-মারাদোনাদের দেশকে তুলে ধরা হচ্ছে। সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল আর্জেন্টিনার দূতাবাস থেকে আগত দুই প্রতিনিধি। তাঁদের এক প্রতিনিধি বলেন, ‘‘কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা আমাদের জাতীয় দলকে যে ভালোবাসা দেয়, তা সত্যিই অনন্য। আমরা আশা করছি, আগামীবারও চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেই ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে পারব। শেষ পর্যন্ত, আমরা আশা করি যে 2026 সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় আর্জেন্টিনা আবারও অংশ নেবে — যা এই সুন্দর সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করবে।”
গতবছর বইমেলায় বই বিক্রি হয়েছিল 23 কোটি টাকার। গত বছর স্টলের সংখ্যা ছিল প্রায় 1035। সভাপতি সুধাংশু শেখর দে বলেন, "আগামী বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য অনেক নতুন প্রকাশক আবেদন জানিয়েছেন। বইমেলা প্রাঙ্গণের পরিষদ একটুও বানানো যায়নি। তাও গতবছর আমরা সামান্য কিছু নতুন স্টল দিতে পেরেছি। আগামী বইমেলায় স্টলের সংখ্যা বাড়ানো আর সম্ভব হচ্ছে না। শেষ কিছু বছরের মতো এই বছরেও বইমেলা হচ্ছে বইমেলা প্রাঙ্গণ অর্থাৎ সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কে। এই বছর মেট্রো পরিষেবা আরও বিস্তারিত হওয়ায় গিল্ড আশা করছে বহু বইপ্রেমীর।’’
গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, "যেকোনও জায়গা থেকে হাওড়া এসে সে অনায়াসেই মেট্রো করে বইমেলা প্রাঙ্গণ চলে আসতে পারবে। আমরা আশা রাখব এই সময়টায় অন্তত দু’টো মেট্রোর মধ্যে সময়ের যে ফারাক, সেটা কম করা হবে।"
ভেজা বইয়ের মেলা
বাংলা প্রকাশনার 200 বছরের ইতিহাসে এই ঘটনা প্রথমবার। কলেজ স্কোয়ারের গেটের সামনে বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে বৃষ্টিতে ভেজা বইয়ের মেলা। সেই মেলায় উপচে পড়া ভিড় ক্রেতাদের। আপ্লুত আয়োজক প্রকাশকরা। নির্ধারিত সময়ের বহু আগে থেকেই বই কেনার জন্য ভিড় জমে ছিল। কিন্তু পাঠক বা প্রকাশক কেউই চাইছেন না এরকম বইমেলা হোক। তাঁদের বক্তব্য, "কলকাতার অলিতে গলিতে ছোট আকারে যেকোনও সময় বই মেলা হতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি ভেজা বইমেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত বইয়ের মেলা যেন না-বসাতে হয় প্রকাশকদের।"

বাংলার মনন ও মেধার আঁতুড়ঘর, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বইয়ের বাজার কলেজ স্ট্রিট। গত 23 সেপ্টেম্বরের অতিবৃষ্টিতে প্রায় সব প্রকাশনা ও পুস্তক বিক্রেতারা কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ভিজে যায় প্রচুর সংখ্যক বই। ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে 10 কোটি টাকা। বৃষ্টি ভেজা সেই বইয়ের ঝাড়াই বাছাই করে মেলা বসে সোমবার।
রাস্তার উপর টেবিল, চেয়ার ও ছাতার নীচে এই মেলায় অংশ নেয় 36টি প্রকাশনা। সকাল 11টা থেকে রাত 8টা পর্যন্ত। কার্যত, টানা এই স্টলগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন হাজার হাজার পাঠক। হুগলির শ্রীরামপুর থেকে একাধিক থলে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন প্রবীণ পাঠক কিরীটি রায়। তিনি বলেন, "ভালো উদ্যোগ। এরকম বইমেলা আরও হলে ভালো হয়। দু'হাজার টাকার বই কিনতে এসেছি। সাত আটটা বই কেনা হয়েছে। আরও খুঁজে খুঁজে কিনতে হবে।"

আরেক পাঠক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "ভিজে বইয়ের মেলা হিসেবে নয়, বইমেলা হিসেবেই মনে রাখতে চাই। কারণ, এর সঙ্গে চোখের জল রয়েছে। তাই, সেইসব প্রকাশক, কর্মীদের পাশে এসে দাঁড়ানোটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন সেখান থেকে অন্তত দুটো হলেও বই কিনতে পারি। কিন্তু বই যেন পুড়ে না-যায়, বই যেন ভিজে না-যায়, অক্ষত ভালো বই কিনতে চাই।"
সল্টলেক থেকে বই কিনতে এসেছিলেন তিথি হালদার। তিনি বলেন, "এতগুলো বই নষ্ট হয়ে গেল। এটা ভালো জিনিস না। দুঃখের। এখন পছন্দ মতো বই কিনে নিয়ে রোদে শুকিয়ে পড়তে হবে। নাটক ফিকশন ছড়া কবিতা বিভিন্ন ধরনের বই এখানে আছে। কারণ, মূলত নষ্ট হয়ে যাওয়া বই বা ড্যামেজ হওয়া বই কিন্তু এখানে আছে। ফলে যে বইটা আপনি পছন্দ করবেন, যদি আপনি তার দ্বিতীয় কপি চান, তা পাওয়াটা কিন্তু খুব চাপের।"

মূল্যের উপরে ছাড়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বইয়ের কন্ডিশনের উপরে ছাড় পাওয়া যাচ্ছে। 500 টাকার বই যেমন 400 টাকাতে পাওয়া যাচ্ছে, অবস্থা খারাপ হলে 50 টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে।’’
কলকাতা ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে সম্পাদক অভিষেক ঘোষ বলেন, "অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি পাঠকদের থেকে। মেলা শুরু হওয়ার কথা সকাল 11টায়। 10টার আগে থেকে বহু মানুষ এসে জড়ো হয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি স্ট্রিটে। মেলার শুরুতেই বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর টেবিলে সাজানোর আগেই ভিজে বই কিছু সময়ের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। তাদের দুই তিনবার করে বই নিয়ে আসতে হচ্ছে টেবিলে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘কার্যত সকলের ক্ষেত্রে এরকমটা ঘটছে। পাঠক বন্ধুরা যেভাবে নতুন বইয়ের পাশে থাকে, ঠিক সেভাবেই এই ভিজে যাওয়া নষ্ট হয়ে যাওয়া বইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বিভিন্ন সময় আমরা কলকাতার বাইরে ছোটখাটো বইমেলার আয়োজন করে থাকি। আগামী নতুন পরিকল্পনা রয়েছে খুব শীঘ্রই সে বিষয়ে আমরা জানাব।"

কলকাতা ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে সভাপতি মারুফ হোসেন বলেন, "রাস্তার জল ঘরে ঢুকে ভিজিয়ে দিয়েছে বই। কয়েক ঘণ্টায় এত ক্ষতি আগে কখনও হয়নি হয়তো। তাই প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতারা সেই ভেজা বই নিয়ে আজ রাস্তায়। এখানে নতুন প্রজন্মের বহু পাঠক এসেছেন। এটা আশার আলো। তারা বই কিনছেন।
একই সঙ্গে আজ আমরা অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশনা, পুস্তক বিক্রেতা ও মুদ্রণ সহযোগী, যাঁরা আমাদের কাছে সহায়তার আবেদন করেছিলেন, এমন 65টি সংস্থাকে 3 লক্ষ 42 হাজার টাকার সহায়তা চেক প্রদান করা হয়েছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘মূলত এই সংস্থাগুলি ছোটো পুঁজির সংস্থা। এছাড়া মেলা থেকে অ্যাসোসিয়েশন প্রায় 66 হাজার টাকার ভেজা বই কিনে উপস্থিত পাঠক, লেখক ও বিশিষ্ট মানুষদেরকে উপহার হিসাবে দেওয়া হয়েছে। পাঠকেরাও কিনেছেন কয়েক লক্ষ টাকার ভেজা বই - এ এক অমূল্য স্মারক। দিল্লি বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন দিল্লির 20টি পুজো কমিটি ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে 2 লক্ষ টাকা সহায়তা করেছে কলেজ স্ট্রিটের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। স্বনির্ভর সংগঠন অর্থিক সহায়তা করেছে এই বইমেলা আয়োজনে।"

উল্লেখ্য, কলকাতা ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকাশনা এবং পুস্তক বিক্রেতাদের জন্য ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ ঘোষণার অনুরোধ করা হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের জন্য ডেডিকেটেড একটি পাম্পিং স্টেশন ও একটি ফায়ার স্টেশনের দাবি জানানো হয়েছে।

