আমার বিরুদ্ধে মামলা কেন ? আদালতে সওয়াল শতদ্রুর, দোষ দেখছেন না নিকটজনেরা
লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় শতদ্রুর জামিনের আবেদন খারিজ ৷ 14 দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ বিধাননগর মহকুমা আদালতের ৷

Published : December 14, 2025 at 3:29 PM IST
|Updated : December 14, 2025 at 8:42 PM IST
কলকাতা ও হুগলি, 14 ডিসেম্বর: কলকাতায় লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় আয়োজক শতদ্রু দত্তের জামিনের আবেদন খারিজ করল বিধাননগর মহকুমা আদালত ৷ রবিবার তাঁকে 14 দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক ৷ তবে, এ দিন আদালতে শতদ্রু দত্ত প্রশ্ন তোলেন, স্টেডিয়ামে যে ঘটনা ঘটেছে, এর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কেন মামলা হল ? অন্যদিকে, রিষড়ায় শতদ্রুর পাড়া এবং তাঁর অন্যান্য পরিচিতদের একাংশের দাবি, তাঁকে অকারণে ফাঁসানো হচ্ছে ৷ তবে, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার অভাব যে ছিল, তা মানছেন সকলেই ৷
এদিন আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে শতদ্রু দত্ত দাবি করেন, তিনি কোনও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করেননি এবং মাঠে যা ঘটেছে, সেই ঘটনার দায়ও তাঁর নয় ৷ আইনজীবীর সওয়াল, "আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে একাধিক ধারা দেওয়া হয়েছে, এমনকি এমপিও (মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার) আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে ৷ তিনি কী এমন কাজ করেছেন, যার জন্য এই আইনে মামলা হবে ?" এ দিন শতদ্রুর জামিনের আবেদনও জানানো হয় ৷
আদালতে শতদ্রু আরও দাবি করেন, "আমি এমন একজন মানুষকে নিয়ে এসেছি, যিনি শিশুদের শিক্ষা দেবেন, অনুপ্রাণিত করবেন ৷ স্টেডিয়ামে যা ঘটেছে, তার জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা কেন ? 14 দিনের পুলিশি হেফাজত কেন প্রয়োজন ?" এমনকি এই ঘটনার পর তাঁর পূর্বের 'খ্যাতি' ক্ষুণ্ণ হয়েছে ৷
তবে, সরকারি আইনজীবী শতদ্রু ও তাঁর আইনজীবীর করা দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন ৷ পাল্টা সওয়ালে তিনি বলেন, "তদন্তে উঠে এসেছে যে, ধৃত ব্যক্তি অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গেও একই ধরনের কাজ করেছেন ৷ মেসির সামনে কে যাবেন, আর কে যাবেন না, তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব আয়োজকের ৷ আয়োজক নিজের লোকজনকে নিয়ে এমনভাবে মেসিকে ঘিরে রেখেছিলেন, যাতে সাধারণ দর্শকরা তাঁকে ঠিকভাবে দেখতে পাননি ৷" যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য একপ্রকার শতদ্রু দত্তকেই দায়ী করেন সরকারি আইনজীবী ৷

শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসিকে এক ঝলক দেখার আশায় হাজার-হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিলেন দর্শকরা ৷ কিন্তু, অনুষ্ঠানের বেশির ভাগ সময়েই আর্জেন্তাইন ফুটবল তারকাকে ঘিরে ছিলেন আয়োজক, রাজ্যের নেতা-মন্ত্রী এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ লোকজন ৷ ফলে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে থাকা অধিকাংশ মানুষ মেসিকে দেখতে না-পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ৷ মেসি মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সেই ক্ষোভই বিশৃঙ্খলার আকার নেয়।

সেই প্রেক্ষিতেই আদালতে সরকারি আইনজীবী বলেন, "জনসমাগম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে আয়োজকরা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন ৷" সব পক্ষের সওয়াল শোনার পর আদালত শতদ্রু দত্তের জামিনের আবেদন খারিজ করে 14 দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় ৷
অন্যদিকে, শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে মেসির অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রাক্তন ফুটবলার সমীর চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ৷ তাঁরা ভিভিআইপি বক্সে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৷ স্টেডিয়ামের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল ৷ সমীর চৌধুরী অব্যবস্থার কথা মেনে নিলেও, শতদ্রু দত্তকে দায়ী করতে চাইলেন না ৷
তিনি বলেন, "আমি শতদ্রুকে দোষ দেব না ৷ ওকে ফাঁসানো হল ৷ এর আগেও ও কাফুকে এনেছে, রোনাল্ডিনহোকে এনেছে, পেলেকে এনেছে ৷ হ্যাঁ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল ৷ লোকজন মেসিকে ঘিরে রেখেছিল ৷ নামগুলো আর বলছি না ৷ তবে, মেসির পর্যায়ের খেলোয়াড়ের জন্য ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার হওয়া উচিত ছিল ৷"
পাশাপাশি, মাঠের দর্শকদের ক্ষোভ নিয়ে প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার বলেন, "যাঁরা টাকা খরচ করে টিকিট কেটেছেন, তাঁদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে ৷ মেসির অনুষ্ঠানে 500 জন লোক মাঠে নেমে পড়েছে ৷ মেসিকে দেখাই যাচ্ছিল না ৷ কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না ৷ পুলিশও চুপ করে বসেছিল ৷ দর্শকরা কেউ 15 হাজার, 18 হাজার, 32 হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছেন ৷ আমরাই দেখতে পাইনি, তো অন্যান্য দর্শকদের কী অবস্থা বোঝা যাচ্ছে ৷"
তবে, প্রাক্তন ফুটবলারের পরিবারের সদস্যরা কোনও রাখঢাক করলেন না ৷ নাম না-করেও সরাসরি আয়োজক শতদ্রুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিলেন ৷ সমীর চৌধুরীর স্ত্রী সোমা চৌধুরী বলেন, "চোখে জল চলে এল কালকের ওই দৃশ্য দেখে ৷ মেসির নিরাপত্তারক্ষীরা কোথায় ছিল, একজন মাইক হাতে ঘুরছিল, তাঁকেই মনে হল মেসির ব্যক্তিগত সিকিউরিটি ৷ এমন তাঁর ভাব ৷ মাঠে আরও দু’জন ফুটবলার ছিলেন ৷ তাঁরাও কোনও গুরুত্ব পাননি ৷ কোনও ব্যবস্থা ঠিক ছিল না ৷"
সমীর চৌধুরীর মেয়ে সৌরিশা ক্ষোভ উগড়ে দিলেন আয়োজক তথা শতদ্রুর সংস্থার বিরুদ্ধে ৷ তিনি বলেন, "মেসিকে কলকাতায় নিয়ে আসার মতো পরিকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা আমাদের নেই ৷ তাই দূর থেকে টিভি-তেই আমাদের ভালোবাসা পাক মেসি ৷ এমন অব্যবস্থা ভাবা যায় না ৷ আমরা মেসিকে সামনে থেকে দেখার যোগ্য নই ৷"
এদিন শতদ্রু দত্তের রিষড়ার বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল সংবাদ মাধ্যম ৷ সেখানে দেখা গেল পুলিশের তরফে বাড়ির সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ৷ পুলিশের টহলদারি গাড়ি ও প্রিজন ভ্যান রাখা ছিল ৷ সেখানেই দেখা গেল এক মহিলাকে শতদ্রু দত্তের বাড়িতে ঢুকতে ৷ তাঁকে প্রশ্ন করা হলে জানা যায়, তিনি শতদ্রু দত্তের স্ত্রীর মেকআপ আর্টিস্ট ৷ তিনি জানান, বাড়িতে কাজের লোকজন ছাড়া কেউ নেই ৷ শনিবার থেকেই শতদ্রু দত্তের স্ত্রী এবং ছেলে বাড়িতে আসেননি ৷

