15 বছরের তৃণমূল জমানায় 'দুর্নীতি' প্রকাশ্যে আনতে কড়া নবান্ন, শ্বেতপত্র প্রকাশে তৈরি বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী
এই বিশেষ কমিটির মাথায় থাকছেন রাজ্যের বর্তমান অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত । কমিটিতে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়-সহ মোট পাঁচ জন সদস্য থাকছেন।

Published : July 2, 2026 at 10:48 PM IST
কলকাতা, 2 জুলাই: গত 15 বছরে বাংলায় কী কী আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, এবার তার একেবারে গভীরে পৌঁছতে চাইছে বিজেপি সরকার। পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলের যাবতীয় দুর্নীতির হিসেব প্রকাশ্যে আনতে তৎপর প্রশাসন ৷ এর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে চলেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার নবান্নে ছিল রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক। সেখানেই একটি বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ৷
এর আগে বাজেট অধিবেশনে জবাবি ভাষণ দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছিলেন, পূর্বাতন সরকারের প্রায় সর্বত্রই দুর্নীতির পাহাড়। এই সরকার চায় আগের সরকার কী করেছে, তা মানুষের সামনে নিয়ে আসতে। আর সেই জন্য প্রত্যেক দফতর ধরে ধরে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। আর সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দুর্নীতির ফিরিস্তি মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর আজ অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাজ্য মন্ত্রিসভার এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কেন্দ্রে মনমোহন সিং সরকারের আমলে যেমন 'গ্রুপ অফ মিনিস্টার্স' কাজ করত, এটিও ঠিক সেই ধাঁচেই তৈরি হয়েছে ৷ এই বিশেষ কমিটির মাথায় থাকছেন রাজ্যের বর্তমান অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত । কমিটিতে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়-সহ মোট পাঁচ জন সদস্য থাকছেন। শুধুমাত্র অর্থমন্ত্রীর উপর গোটা দায়িত্ব না-ছেড়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে এই কমিটিতে রেখেছে নবান্ন। এর থেকেই স্পষ্ট, তারা এই বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

ক্যাবিনেট বৈঠকে স্থির হয়েছে, মূলত পাঁচটি বিষয়ের উপর জোর দিয়ে আগের সরকারের আমলের যাবতীয় অব্যবস্থার খতিয়ান তৈরি করবে এই বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী।
প্রথমত, রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। বিশেষ করে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট চক্র এবং মহিলাদের উপর হওয়া অপরাধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাহাড়প্রমাণ নিয়োগ দুর্নীতি। শিক্ষা দফতর, স্বরাষ্ট্র, পুরসভা থেকে শুরু করে সমবায়—সব ক্ষেত্রেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার গভীরে গিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে।
তৃতীয়ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন বা বিজিবিএস। গত সরকারের আমলে এই সম্মেলনগুলির প্রকৃত খরচ ঠিক কত ছিল এবং খাতায়-কলমে কী হিসাব দেখানো হয়েছিল, তার ফারাক খতিয়ে দেখা হবে। চতুর্থত, রাজ্যের ভেঙে পড়া সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো। বিশেষ করে আরজি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার পর প্রশাসনিক যে চরম অব্যবস্থা প্রকাশ্যে এসেছিল, তার নিখুঁত তদন্ত হবে। পঞ্চম বিষয়টি হল নবান্নের 14তলার প্রশাসনিক অনিয়ম। শীর্ষ স্তরের মদতে চলা যাবতীয় অব্যবস্থা ও বেনিয়মের হিসেবও জায়গা পাবে এই শ্বেতপত্রে।
প্রশ্ন উঠতে পারে কি এই শ্বেতপত্র ? রাজনীতির ময়দানে এই 'শ্বেতপত্র' আদতে একটি সরকারি প্রামাণ্য দলিল। এর মাধ্যমে রাজ্যের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বা নির্দিষ্ট দপ্তরের কাজের তথ্য ও পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের দশ বছরের কাজের সমালোচনা করে এমন শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তেলেঙ্গানাতেও ক্ষমতায় এসেই আগের সরকারের বিপুল ঋণের বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র এনেছিল কংগ্রেস। তাত্ত্বিকভাবে এটি স্বচ্ছতার প্রতীক। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে এটি বিরোধীদের কোণঠাসা করার অন্যতম কৌশলগত হাতিয়ার ৷
রাজ্যের বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হেঁটে পূর্বতন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বড়সড় রাজনৈতিক ও আইনি চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিছুদিন আগেই বিধানসভায় বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত এই শ্বেতপত্র আনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবারের ক্যাবিনেট বৈঠকের পর স্পষ্ট হয়ে গেল, সরকার শুধু আর্থিক খতিয়ানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নারী নিরাপত্তা থেকে স্বাস্থ্য—সবকিছুই আসছে এই তদন্তের আওতায়।
শিল্প ক্ষেত্রে জোয়ার আনাই এখন বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। তাই তারা নিজেদের কাজের নিখুঁত হিসাবও মানুষের সামনে রাখতে চাইছে। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এদিন পুরোনো সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন,"আমরা আগের সরকারকেও বারবার শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে বলেছিলাম। বিজিবিএসে কত ইনভেস্টমেন্ট হল, কোন কোন সেক্টরে বিনিয়োগ হল, কোন সেক্টরে কত ছেলেমেয়ে চাকরি পেল, আমরা বারবার জানতে চেয়েছি ।"
নিজেদের আমলের স্বচ্ছতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "আমরা কী করছি, কত বিনিয়োগ এল, আমরা কোথায় কোথায় কোন সেক্টরে ইনভেস্টমেন্ট আনছি, কত ছেলে চাকরি পাচ্ছে, আমরা জানাতে চাই।" এই লক্ষ্যেই রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ টানতে এদিন একটি আলাদা বিনিয়োগ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছেন তাপস রায়।

