হুগলিতে চারটি জুটমিল ফের খোলার ঘোষণা রাজ্যের, স্বস্তিতে কয়েক হাজার শ্রমিক পরিবার
শ্রমিকরা বর্তমান রাজ্য সরকারের উপর ভরসা রাখছেন ৷ তবে জুটমিল খোলার ব্যাপারে এখনই নির্দেশিকা আসেনি বলে দাবি করছেন সেখানকার কর্মচারীরা ।

Published : July 9, 2026 at 12:59 PM IST
চন্দননগর/শ্রীরামপুর, 9 জুলাই: রাজ্যে পালাবদলের পরই এল সুখবর ৷ দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে খুলতে চলেছে গোন্দলপাড়া, ইন্ডিয়া, হেস্টিংস, ওয়েলিংটন-হুগলির চারটি জুটমিল । আগামী 10 জুলাই থেকে এই জুটমিলগুলি খোলা হবে বলে ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে । আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই খুশির হাওয়া হুগলির শ্রমিক মহল্লায় । শ্রমিকরা আশবাদী, ধীরে ধীরে খুলবে বাকি বন্ধ থাকা জুটমিলগুলিও ৷
বুধবার শ্রীরামপুরের বিধায়ক ও প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য জুটমিলগুলি খোলার ব্যাপারে বলেন, "জুট শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে । হুগলি জেলায় চারটি জুটমিল খোলা হচ্ছে । অবশ্যই শ্রমিকদের মুখে হাসি ফুটবে । আমরা মালিকদের কাছে আবেদন করেছি, জুটমিল খোলার এখন সমস্তরকম সুবিধা পাবেন শ্রমিকরা । এমনকি জুটমিল মহল্লাগুলিরও অবস্থা খারাপ, সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মালিকপক্ষকে আবেদন করা হয়েছে । শ্রমিক মালিকদের সহাবস্থানের মাধ্যমেই আমরা চলতে চাই । আগামিদিনে সরকারের সহযোগিতায় মিল কলকারখানা ভালোভাবেই চলবে ।"
জুটমিল বন্ধের জের
জানা গিয়েছে, চলতি বছরে ভোটের আগে 26 জুন বন্ধ হয়েছিল গোন্দলপাড়া জুটমিল । এই জুটমিলে স্থায়ী অস্থায়ী মিলিয়ে 4 হাজার শ্রমিক কাজ করতেন । কিন্তু বর্তমানে তলানিতে ঠেকছে কাজ । জুটের চায়না মেশিন আনার ফলে সমস্ত শ্রমিক কাজ পায় না । মাঝে মধ্যেই বন্ধ থাকতো একটি ইউনিট । যার ফলে ভোগান্তির মুখে পড়তে হত শ্রমিকদের । তাই বেশিরভাগ শ্রমিক কাজের জন্য অন্যত্র চলে গিয়েছেন । আর যাঁরা আছেন তাঁরা অন্য জায়গায় কোনওরকমে কাজ করেন, নয়তো টোটো চালান । দুর্দশার শেষ নেই শ্রমিকদের ।

গোন্দলপাড়া জুটমিলের সেলাই ঘরে কাজ করা এক শ্রমিক প্রমোদ মণ্ডল বলেন, "এই জুটমিল বছরে ছয় থেকে সাত মাস বন্ধ থাকে । নতুন সরকার এসেছে আমাদের এই সরকারের প্রতি আশা ভরসা রয়েছে । যদি জুটমিল ভালো করে চলে তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ঠিকমতো হবে । গোন্দলপাড়া শ্রমিক মহল্লার মেয়েদের বিয়ে হয় না । কোনও ব্যাংকের তরফেও লোন পাই না আমরা । সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থেকেই বঞ্চিত । সরকারি তরফে বলা হচ্ছে যে, জুটমিল খুলবে কিন্তু কবে ? আমরাও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছি । জুটমিল চালু হলে যেন সকলেরই কাজ হয় ৷ একজন কাজ করবে, আর একজন বসে থাকবে, সেটাও যেন না হয় ৷ সেটা সরকারকেই দেখতে হবে ।"

কর্মহীন কয়েক হাজার শ্রমিক
একই অবস্থা ইন্ডিয়া, হেস্টিংস, ওয়েলিংটনের মতো জুটমিলগুলিরও ৷ চলতি বছরের 16 জানুয়ারি বন্ধ হয়ে যায় ইন্ডিয়া জুটমিল ৷ প্রায় 2 হাজার শ্রমিক কাজ করতেন সেখানে । হেস্টিংস জুটমিল 3 জুন বন্ধ হয়েছিল । 4 হাজার শ্রমিক কাজ করতেন । আর ওয়েলিংটন জুটমিল চার মাস আগে বন্ধ হয়েছিল, 2200 শ্রমিক কাজ করতেন এখানে । আরেক জুটমিল শ্রমিক অশোক চৌবের কথায়, "এটাও দেখতে হবে জুটমিল পুরো খুলছে না হাফ ৷ সেটা মালিকের উপরেই নির্ভর করবে । সরকার যদি চায় আগের মত জুটমিল চালু থাকুক তাহলে খুবই ভালো হবে ।"

অন্যদিকে ভিক্টোরিয়া জুটমিলে 3 হাজার শ্রমিক কাজ করেন । বর্তমানে মূল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে 2 জুন থেকে । তাতেই 2 হাজার শ্রমিক বসে গিয়েছেন । বাকি শ্রমিকদের নিয়ে মেন্টেনেন্সের কাজ চলছে । শ্রমিক সংগঠনের তরফে শোনা গিয়েছে, এখনই মিল খোলার ব্যাপারে কোনও সদুত্তর নেই মালিক পক্ষের কাছে ।

এই কারখানাতেই ফিনিশ ডিপার্টমেন্টের কাজ করতেন শ্রমিক অজয় দাস ৷ তিনি বলেন, "স্থানীয় বিধায়ক ও শ্রমমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রীকে আমরা বলতে চাই যে, যাতে সারাবছর কাজ হয় তার ব্যবস্থা করুন । আমাদের মজুরের উপর সংসার চলে, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা থেকে ওষুধ সবকিছুই নির্ভর করে রোজগারের উপর । 623 টাকা প্রতিদিনের মজুরি । বর্তমানে এই জুটমিল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে । কবে খুলবে বুঝতে পারছি না । যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে সেই হারে আমাদের মজুরি বৃদ্ধি হোক, এটাই আমাদের সরকারের কাছে দাবি ।"
জুটমিলগুলি চালু রাখার দাবি
সিটু(CITU) রাজ্য কমিটির সদস্য হীরালাল সিং বলেন, "দীর্ঘদিন ধরেই আমরা রাজ্য সরকারের কাছে জুটমিলগুলি চালু রাখার দাবি করে আসছি । জুটমিল বন্ধ থাকার ফলে শ্রমিকদের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে । কোনও কিছু না-পেয়ে শ্রমিকরা টোটো চালাচ্ছেন বা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন । মালিকরা সদর্থক ভূমিকা নিয়ে জুটমিলগুলো চালু রাখুক ।"

আর এই অবস্থা থেকেই শ্রমিকদের দাবি, পূর্বতন সরকার জুটমিল খোলার ব্যাপারে ব্যবস্থা করলেও মাঝেমধ্যেই বন্ধ হয়ে যেত সেগুলি । তার ফলেই বারেবারে সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে সমস্ত শ্রমিকদের । রাজ্যের নতুন সরকার জুটমিল খোলার ব্যাপারে ব্যবস্থা করছে ঠিকই, কিন্তু নিয়মিত কাজের ব্যাপারে ও মজুরি বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা করুক রাজ্য সরকার । আবারও যাতে জুটমিল বন্ধ না হয়ে যায় তাই সঠিক ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ।

মিল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে বর্তমানে হুগলির জুটমিলগুলি সারাইয়ের কাজ চলছে । মিল খোলার ব্যাপারে এখনও নির্দেশিকা আসেনি বলেই দাবি করছেন সেখানকার কর্মচারীরা । গোন্দলপাড়া জুটমিলের এক ম্যানেজার শুভেন্দু পাল বলেন, "এখন মেনটেনেন্সের কাজ চলছে । জুটমিল কবে খুলবে বলতে পারব না । কোনও অর্ডার আসেনি এখনও ।"

