ETV Bharat / state

পৌষমেলায় দূষণ-দুর্নীতি রুখতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কমিটি গঠন বিশ্বভারতীর

আগামী 23 ডিসেম্বর মেলা শুরু৷ শেষ হবে 28 ডিসেম্বর৷ এবার স্টল বুকিং হবে অনলাইনে৷ বৃহস্পতিবার হওয়া একটি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে৷

Visva Bharati on Poush Mela
পৌষমেলা (ফাইল ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 11, 2025 at 7:44 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

বোলপুর, 11 ডিসেম্বর: আগামী 23 ডিসেম্বর থেকে শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লির মাঠে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলা। চলবে 28 ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারের মেলাকে দুর্নীতিমুক্ত ও দূষণমুক্ত করতে একাধিক পদক্ষেপ করল বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ৷

স্টল বুকিং নিয়ে প্রতিবার যে অভিযোগ ওঠে, তা বন্ধ করতে এবার পুরো ব্যবস্থাটাই অনলাইনে করা হবে৷ পাশাপাশি একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে৷ ওই কমিটি খতিয়ে দেখবে মেলা সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ উঠছে কি না৷

পৌষমেলায় দূষণ-দুর্নীতি রুখতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কমিটি গঠন বিশ্বভারতীর (নিজস্ব ছবি)

বৃহস্পতিবার বিশ্বভারতীর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সভাকক্ষে মেলা সংক্রান্ত বিষয়ে বৈঠক হয়৷ সেখানে মেলা নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত হয়৷ কী কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, দেখে নেওয়া যাক একনজরে -

  • সম্পূর্ণ অনলাইনে প্লট বুকিং হবে৷
  • 2024 সালে যাঁরা মেলায় স্টল দিয়েছিলেন, তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন।
  • 15 ও 16 ডিসেম্বর তাঁরা প্লট বুক করতে পারবেন।
  • 17 ডিসেম্বর সকলের জন্য অনলাইন বুকিং সাইট খুলে দেওয়া হবে৷
  • প্লট বুকিংয়ের ফি গত বারের মতো থাকছে।
  • 28 ডিসেম্বরে পর কোনোভাবে মেলা রাখা যাবে না৷
  • 22 ডিসেম্বর থেকে প্লট বুকিংয়ের দুর্নীতি রুখতে তৈরি কমিটি মাঠে প্রদক্ষিণ করবে৷
  • পরিবেশ দূষণ রুখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷

উল্লেখ্য, প্রতিবছরই মেলার মাঠে স্টল বুকিং নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠে৷ একাধিক প্লট বুক করে তার পর চড়াদামে তা বিক্রি করে দেওয়া কিংবা অন্যের প্লট দখল করে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে৷ এই অভিযোগের প্রতিকার করতেই এবার অনলাইনে বুকিংয়ের ব্যবস্থা করছে বিশ্বভারতী৷ পাশাপাশি 22 তারিখ সংশ্লিষ্ট কমিটি মাঠে গিয়ে দেখবে যে যাঁরা প্লট বুক করেছিলেন, তাঁরাই স্টল দিয়েছেন কি না!

Visva Bharati on Poush Mela
পৌষমেলা (ফাইল ছবি)

এছাড়া 2016 সালে পৌষমেলায় দূষণ হচ্ছে, এই অভিযোগ তুলে জাতীয় পরিবেশ আদালতে একটি মামলা করেছিলেন পরিবেশ কর্মী সুভাষ দত্ত। সেই মামলার রায়ে একাধিক দূষণবিধি বেঁধে দিয়েছে পরিবেশ আদালত৷ সেই বিষয়টিও কমিটি খতিয়ে দেখবে ও প্রয়োজন মতো ব্যবস্থা নেবে বলে জানা গিয়েছে৷

বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীরকুমার ঘোষ বলেন, "কোনোরকম কালোবাজারি চলবে না৷ অনলাইনে বুকিং হবে৷ 2024 সালে যাঁরা মেলায় স্টল দিয়েছিলেন, তাঁরা 15 ও 16 ডিসেম্বর অনলাইনে প্লট বুক করতে পারবেন৷ 17 ডিসেম্বর থেকে বাকিরা সকলেই অনলাইনে প্লট বুক করতে পারবেন৷ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতেও অনেক পদক্ষেপ করা হচ্ছে।"

রাজ্যের কারামন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ বলেন, "প্রতি বছরের মতো বীরভূম জেলা প্রশাসন সুষ্ঠভাবে পৌষমেলা করতে সবরকম সহযোগিতা করবে৷ বিশ্বভারতী যা যা সহযোগিতা চেয়েছে, সব পাবে৷ ছ’দিনের মেলা হবে, অনলাইনে প্লট বুক হবে, এটা ঠিক হয়েছে।"

Visva Bharati on Poush Mela
পৌষমেলা নিয়ে বৈঠক (নিজস্ব ছবি)

বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি ফায়জুল হক ওরফে কাজল শেখ বলেন, "এই মেলা আন্তর্জাতিকস্তরের মেলা। বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। জেলা পরিষদের তরফে মেলার জন্য যাবতীয় সহযোগিতা করব আমরা৷ বিশ্বভারতীর প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাই আমরা মেলার আয়োজনে বাড়তি নজর দিচ্ছি।"

অতিরিক্ত বীরভূম জেলা পুলিশ সুপার (বোলপুর) রানা মুখোপাধ্যায় বলেন, "মেলায় সর্বক্ষণের পুলিশ ক্যাম্প থাকবে৷ নিরাপত্তার জন্য সাদা পোশাকের পুলিশ, মহিলা পুলিশ, সার্ভিল্যান্স টিম, সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার প্রভৃতি থাকবে৷ ট্রাফিকের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে।"

বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন?

বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীরকুমার ঘোষের তত্ত্বাবধানে হওয়া এই বৈঠকে ছিলেন কর্মসচিব বিকাশ মুখোপাধ্যায়, ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ-সহ বিশ্বভারতীর আধিকারিকেরা। ছিলেন শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের সম্পাদক অনিল কোনার ও সদস্য কালীকারঞ্জন চট্টোপাধ্যায়।

রাজ্য সরকারের তরফে ছিলেন রাজ্যের কারামন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ, বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি ফায়জুল হক ওরফে কাজল শেখ, বোলপুর মহকুমাশাসক অনিমেষকান্তি মান্না, বোলপুর পুরসভার চেয়ারপার্সন পর্ণা ঘোষ-সহ বিদ্যুৎ বিভাগ, দমকল বিভাগ, শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদের আধিকারিকেরা। বীরভূম জেলা পুলিশের তরফে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বোলপুর) রানা মুখোপাধ্যায়, বোলপুরে এসডিপিও রিকি আগরওয়াল-সহ বোলপুর থানার আইসি, শান্তিনিকেতন থানার ওসি প্রমুখ। ভার্চুয়ালি বৈঠকে ছিলেন বীরভূমের জেলাশাসক ধবল জৈন ও জেলা পুলিশ সুপার আমনদীপ সিং।

পৌষমেলার ইতিহাস

উল্লেখ্য, 1843 সালে 21 ডিসেম্বর (7 পৌষ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। এরপরেই ব্রহ্মধর্মের প্রসার ও প্রচার বৃদ্ধি পায়। দীক্ষিত হওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ও ব্রহ্মধর্মের প্রসারের স্বার্থে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর 1845 সালে কলকাতার গোরিটির বাগানে উপাসনা, ব্রহ্ম মন্ত্রপাঠের ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনাকেই পৌষমেলার সূচনা বলে ধরা হয়।

Visva Bharati on Poush Mela
পৌষমেলা নিয়ে বৈঠক (নিজস্ব ছবি)

পরবর্তীকালে 1862 সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার ভাবনা শুরু করেন। সেই মতো প্রতিষ্ঠিত হয় আশ্রম। 1891 সালে (7 পৌষ) ব্রহ্মমন্দির বা উপাসনা গৃহ প্রতিষ্ঠা হয়। এটিকে শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসব সূচনার সময় হিসাবে ধরা হয়। 1894 সালে এই পৌষ উৎসবের পাশাপাশি মন্দির সংলগ্ন মাঠে শুরু হয় পৌষমেলা।

অন্যদিকে, 1888 সালের 8 মার্চ মহর্ষি ন্যাস বা ট্রাস্ট ডিডে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌষমেলা সম্পর্কে স্পষ্ট উল্লেখ করে গিয়েছেন যে শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট প্রতি বছর একটি মেলার আয়োজন করবে। এই মেলা মূলত, সকল ধর্মের মানুষের মিলন ক্ষেত্র হবে, কোনও প্রকার মূর্তি পুজো হবে না, কুৎসিত আমোদ উল্লাস হবে না, মদ-মাংস ব্যতীত এই মেলায় সকল প্রকার খাবার বেচা-কেনা হবে।

এই ডিডে আরও বলা রয়েছে, যদি এই মেলা থেকে কোনও প্রকার আয় হয়, সেই টাকা আশ্রমের উন্নতিকল্পে ব্যয় করা হবে। 1941 সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণে মেলা বসলেও তা প্রাণহীন ছিল। 1943 সালে দেশে দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তরের জন্য প্রথম পৌষমেলা বন্ধ ছিল। 1944 সাল থেকে মেলার সময় সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু হয়।

Visva Bharati on Poush Mela
পৌষমেলা নিয়ে বৈঠক (নিজস্ব ছবি)

1950 সালে মেলার পরিসর বাড়তে থাকায় ব্রহ্মমন্দিরের পরিবর্তে ছাতিমতলায় উপাসনা শুরু হয়। এরপরে 1961 সালে এই পৌষমেলার স্থান পরিবর্তন হয়। মন্দির সংলগ্ন মাঠ থেকে মেলা পূর্বপল্লির মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই থেকে এই মাঠেই চলে আসছে মেলা।

তবে কোভিডের সময় ও পরে অন্য কিছু কারণে মেলা বন্ধ ছিল কয়েকবছর৷ 2024 সাল থেকে বিশ্বভারতীর তত্ত্বাবধানে আবার মেলা শুরু হয়৷

আরও পড়ুন -