শাহজাহান মামলায় সাক্ষীর গাড়ি দুর্ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য, কাঠগড়ায় পুলিশ
ন্যাজাট-কাণ্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য ! ঘাতক ট্রাকের পারমিট এবং ফিটনেস ছিল 'ফেল'। তারপরও কীভাবে রাস্তায় অবাধ চলাচল ? উঠছে প্রশ্ন ।

Published : December 11, 2025 at 8:11 AM IST
বসিরহাট, 11 ডিসেম্বর: ন্যাজাট-কাণ্ডে এবার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে ৷ ঘাতক ট্রাকের পারমিট এবং ফিটনেস ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ । এমনকী সেই ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন থেকে বিমার কাগজপত্র সমস্ত কিছুর মেয়াদ-ও পেরিয়ে গিয়েছিল । কিন্তু, তারপরও সন্দেশখালি থেকে বাসন্তী হাইওয়েতে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। বুধবার সেই পারমিট 'ফেল' করা ট্রাকের ধাক্কাতেই প্রাণ যায় দু'জনের।
যার মধ্যে রয়েছেন, শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের করা মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ। অন্যজন দুর্ঘটনাগ্রস্ত চারচাকা গাড়ির চালক শাহানুর আলম। তবে, দুর্ঘটনায় বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন ভোলানাথ।
তাঁর পরিবারের অভিযোগ, জেলবন্দি শাহজাহানের ইন্ধনেই পরিকল্পনা করে ঘাতক ট্রাকের চালক আব্দুল আলিম মোল্লা গাড়িতে ধাক্কা দিয়েছেন।ভোলানাথকে খুন করার উদ্দেশ্যই ছিল অভিযুক্ত ট্রাক চালকের। এমনকী, দুর্ঘটনার তত্ত্ব উড়িয়ে ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পিছনে সরাসরি খুনের অভিযোগও করেছেন ভোলনাথের বড় ছেলে বিশ্বজিৎ ঘোষ। তার মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে পারমিট এবং ফিটনেস 'ফেল' করার পরও কীভাবে রাস্তায় অবাধে চলছিল ট্রাকটি ? পুলিশই বা কী করছিল ? কেন তাদের নজরে এল না বিষয়টি ?

যদিও এ নিয়ে এখনও পর্যন্ত পুলিশের সেভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে পুলিশের একটি সূত্রের খবর, ঘাতক ট্রাকের পারমিট ও ফিটনেস 'ফেল' করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কারও গাফিলতি থাকলে সেটিও তদন্তের মধ্যে আনা হবে। এদিকে, ঘাতক ট্রাকের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করেছেন সন্দেশখালির আরেক প্রতিবাদী মুখ, বিজেপি নেত্রী পিয়ালি ওরফে মাম্পি দাস।

তিনি বলেন, "যে ট্রাকটি-কে দিয়ে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে সেই গাড়িটি গত দেড় বছর ধরে ইএমআই দিচ্ছিল না। বুধবার সেই গাড়িটির ইএমআই দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে পরিকল্পনা করে শেখ শাহজাহান-মামলার সাক্ষীকে খুনের চেষ্টা করা হল।" ঘটনার পর কীভাবে ঘাতক টাকের চালক বাইক পেলেন ? কীভাবেই বা সে ঘটনাস্থল থেকে ফেরার হয়ে গেলেন ? তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সন্দেশখালির এই বিজেপি নেত্রী।
বুধবার বসিরহাট আদালতে শেখ শাহজাহানের দায়ের করা একটি পুরনো মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল সরবেড়িয়ার বাসিন্দা ভোলানাথ ঘোষের।সেই উদ্দেশে তিনি সকালে একটি চারচাকা গাড়িতে করে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে আদালতের দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে ভোলানাথ ছাড়াও ছিলেন তাঁর ছোট ছেলে সত্যজিৎ এবং গাড়ির চালক শাহানুর। বাসন্তী হাইওয়ে ধরে গাড়িটি এগোতেই উল্টো দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রাক আচমকা ধাক্কা দেয় সেই চারচাকার গাড়িতে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ায় গাড়িটির সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায়। সজোরে ধাক্কা দেওয়ায় সেটি গিয়ে পড়ে পাশের নয়ানজুলিতে।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘাতক ট্রাকটিও সোজা ঢুকে পড়ে খালে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সত্যজিৎ ও গাড়ির চালক শাহানুরের। অল্পবিস্তর জখম হন শাহজাহানের বিরুদ্ধে মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ। তবে, ঘটনার পর বাইক নিয়ে পালিয়ে যায় ঘাতক ট্রাকের চালক আব্দুল আলিম মোল্লা। তিনি যে ট্রাকের চালকের আসনে বসেছিলেন এবং এক লেন থেকে আরেক লেনে গিয়ে গাড়িটিতে সরাসরি ধাক্কা মারেন, তা পুলিশের কাছে দেওয়া বয়ানেও স্পষ্ট জানিয়েছেন ভোলানাথ।

অন্যদিকে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বুধবার সন্ধ্যায় সোজা গাড়িতে করে ন্যাজাট থানার অন্তর্গত রাজবাড়ি ফাঁড়িতে এসে পৌঁছন তিনি। সেখানে গিয়ে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে আসেন। তবে, অভিযুক্ত ট্রাক চালকের কোনও হদিশ এখনও মেলেনি। তার খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ। তারই মধ্যে ঘাতক ট্রাকটি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে। জানা যাচ্ছে, গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন করা হয় 2020 সালের 14 সেপ্টেম্বর।ট্রাকটির ফিটনেসের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে চলতি বছরের 2 নভেম্বর। পারমিট-ও ফেল হয়ে গিয়েছে 12 অক্টোবরে। এ-ও জানা যাচ্ছে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল বারাসত আঞ্চলিক পরিবহণ দফতর থেকে।
সূত্রের খবর,পারমিট 'ফেল' করা এই ট্রাক (গাড়ির নম্বর WB65D3284)-এর মালিকের নাম আব্দুল সামাদ মোল্লা। তিনি সন্দেশখালি 1 নম্বর ব্লকের সরবেড়িয়া আগারাটি পঞ্চায়েতের সদস্যও বটে। বাড়ি লাউখালি গ্রামে। ঘটনার পর থেকে তাঁরও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গিয়েছেন। ফলে, তাঁকে ঘিরেও বাড়ছে রহস্য। যদিও সামাদের পরিবারের দাবি, ট্রাকটির বর্তমান মালিক নজরুল মোল্লা নামে এক ব্যক্তি। আট মাস আগে ট্রাকটি বিক্রি করে দেওয়া হয় নজরুলের কাছে। এই নজরুলের বাড়িও লাউখালি গ্রামে। তাঁরও কোনও খোঁজ মিলছে না। খাতায় কলমে ট্রাকের মালিক সামাদ হলেও তা দেখভাল করেন নজরুল-ই।
তবে, আব্দুল সামাদ কিংবা নজরুল মোল্লা কাউকেই তিনি চেনেন না বলে দাবি করেছেন সন্দেশখালির তৃণমূল বিধায়ক সুকুমার মাহাতো। তাঁর কথায়, "কে কাকে গাড়ি বিক্রি করছে, কে গাড়ির আসল মালিক তা দেখার বিষয় আমার নয়। তার জন্য পরিবহণ দফতর রয়েছে। যেখান থেকে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে তারাই বিষয়টি ভালো বলতে পারবে। তদন্ত হলে সমস্ত কিছুই বেরিয়ে আসবে।"
ভোলানাথের পরিবারের অভিযোগ প্রসঙ্গে তৃণমূল বিধায়ক বলেন, "যে কেউ খুনের চক্রান্তের অভিযোগ করতে পারে। অভিযোগ করলেই কেউ দোষী হয়ে যায় না। পুলিশ তদন্ত করছে। নিশ্চয় কিছু না কিছু বেরিয়ে আসবে। আমি কোনও বিশেষজ্ঞ নই যে খুন না দুর্ঘটনা তা দেখেই বলে দিতে পারব।ঘটনার নেপথ্যে কী মোটিভ আছে তা তদন্তকারীরা বলতে পারবে। আমি আশা করছি, পুলিশ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সামগ্রিক বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।পুলিশ তার তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। তারা ঘটনাস্থলেও গিয়েছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছে। পুলিশের ওপর আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে।"
তদন্তে পুলিশের কোনও গাফিলতি নেই বলেও মনে করছেন বিধায়ক সুকুমার মাহাতো। তবে, ন্যাজাট-কাণ্ডে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিজেপি নেত্রী পিয়ালি দাস। তিনি বলেন, "এই ভাবে যদি কাউকে গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় ? এই ঘটনা আগামিদিনে অন্য কারও সঙ্গেই ঘটতে পারে। এই সরকারের কাছ থেকে কোনও সুরক্ষা পাওয়া যাবে না। যতদিন তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকবে ততদিন সন্দেশখালিতে হুমকি ও সন্ত্রাস চলতেই থাকবে। মানুষ এই সরকারের থেকে পরিত্রাণ চাই। বিজেপিকেই তাঁরা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বেছে নেবে বলে আশা করছি।"
প্রসঙ্গত, ভোলানাথ সিবিআইয়ের পাশাপাশি ইডি-র ওপর হামলার ঘটনার মামলাতেও অন্যতম সাক্ষী। এই ভোলানাথের সঙ্গে এক সময়ে সখ্যতা ছিল শেখ শাহজাহানের। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে তাঁর অনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে প্রতিবাদ করায় বিরোধ বাধে বলে অভিযোগ। তার জেরে শাহজাহানের রোষের মুখে পড়তে হয় ভোলানাথ ও তাঁর পরিবারকে। গত 2021 সালে ভোলানাথের বাড়িঘর ভাঙচুর করে এলাকাছাড়া করা হয় তাঁকে। কিন্তু, রেশন দুর্নীতি মামলা-সহ একাধিক অভিযোগে শাহজাহান গ্রেফতার হতেই ফের নিজের বাড়িতে ফেরেন ভোলানাথ। এরপরেই সিবিআইয়ের কাছে শাহজাহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি। অভিযোগ, তারপর থেকেই শাহজাহান ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছেন। বুধবারের ঘটনা সেটাই যেন আরও স্পষ্ট করে দিল বলে দাবি করছে ভোলানাথের পরিবার।

