ETV Bharat / state

রাজ্যের ক্যানসার চিকিৎসার মডেল এবার আফ্রিকায় প্রয়োগ করছে ব্রিটেন

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য রাজ্যে তৈরি করা হয়েছে 'পিঙ্ক করিডর'। ডাক্তার দীপ্তেন্দ্র সরকার দাবি করেছেন, সারা পৃথিবীতে এটাই প্রথম মডেল ।

ETV BHARAT
রাজ্যের ক্যানসার চিকিৎসার মডেল এবার আফ্রিকায় প্রয়োগ করছে ব্রিটেন (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 26, 2026 at 7:58 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

তারক চট্টোপাধ্যায়

আসানসোল, 26 ফেব্রুয়ারি: শুধু দেশের মধ্যে অন্যতম নয়, রাজ্যে যে মডেলে সরকারি স্তরে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা হচ্ছে, সেই 'পিঙ্ক করিডর' মডেল গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত হয়েছে ব্রিটেনেও । ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন দেশে ক্যানসারের চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে থাকে ৷ এবার তারা আফ্রিকাতে পশ্চিমবঙ্গের ক্যানসার চিকিৎসার মডেলকে প্রয়োগ করতে চলেছে । এ কথা জানিয়েছেন রাজ্যের 'ক্যানসার কেয়ার' দফতরের শীর্ষ আধিকারিক ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার ।

সম্প্রতি আসানসোল জেলা হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্যের কাহিনিগুলি নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল । ভিডিয়ো কনফারেন্সে সেখানে পিজি হাসপাতাল থেকে যোগ দিয়েছিলেন রাজ্যের বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক তথা ক্যানসার সংক্রান্ত চিকিৎসা বিভাগের নোডাল অফিসার ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার ।

ভিডিয়ো কনফারেন্সে পিজি হাসপাতাল থেকে ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার (নিজস্ব ভিডিয়ো)

তিনিই ইটিভি ভারতের প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তরে জানান, "রাজ্যের এই ক্যানসার চিকিৎসার মডেল উপস্থাপিত হয়েছে ইউনাইটেড কিংডমে । সেখানে আন্তর্জাতিক সেমিনারে তা গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত হয়েছে । আফ্রিকাতেও ক্যানসার চিকিৎসায় এই মডেলকেই প্রয়োগ করা হবে ।"

রাজ্যে ক্যানসার চিকিৎসায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ

একসময় ক্যানসার মানেই ছিল 'নো আনসার'। বহু পরিবার চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে । কিন্তু বর্তমানে এই রাজ্যে বিনামূল্যে ক্যানসার চিকিৎসায় নজির সৃষ্টি করেছে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতর । বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছে 'পিঙ্ক করিডর'। স্বাস্থ্য ইঙ্গিত পোর্টাল দ্বারা জেলা স্তরের হাসপাতালের সঙ্গে যোগসূত্র হয়েছে এসএসকেএমের । যার ফলে দ্রুত রোগ নির্ধারণ ও চিকিৎসা শুরু হয়ে যাচ্ছে । ফলে রোগীরা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন ।

দেশের মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এই মডেল

এসএসকেএম হাসপাতালের বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক তথা রাজ্যের ব্রেস্ট ক্যান্সার বিভাগের নোডাল অফিসার ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, সরকারি স্তরে এই চিকিৎসা পদ্ধতির মডেল দেশে এটা প্রথমবার । 2023 সাল থেকে এই মডেলেই চিকিৎসা চলছে । এই কারণে রাজ্যে মোট 37টি কেন্দ্র তৈরি করা হয়, তার মধ্যে 9টি হাব ও 28টি স্পোক । জেলা স্তরের হাসপাতালগুলিকে স্পোক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে । সেখানেই বায়াপসি-সহ অন্যান্য পরীক্ষা-নীরিক্ষা সম্পন্ন হচ্ছে ৷ এরপর রোগীর সমস্ত তথ্য তুলে দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য ইঙ্গিত পোর্টালে ।

সেই মতো এসএসকেএম হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা টেলিমেডিসিনের সাহায্যে একদিকে যেমন রোগীকে উন্নত চিকিৎসা দিতে পারছেন, তেমনই তার পাশাপাশি স্পোক হাসপাতালগুলিতেই প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার সেরে ফেলা হচ্ছে । আসানসোল জেলা হাসপাতালে এখনও পর্যন্ত স্তন ক্যানসার থেকে শুরু করে কোলন ক্যানসার, প্যানক্রিয়াসে ক্যানসার ও কিডনির ক্যানসারে অস্ত্রোপচার হয়েছে । শুধু তাই নয়, আসানসোল জেলা হাসপাতালের মতো একটি প্রান্তিক হাসপাতালে ব্রেস্ট ট্রান্সপ্লান্ট পর্যন্ত হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে যা ভাবা যায় না ।

সময় কমছে, বাঁচছে চিকিৎসার খরচ

অতীতে স্পোক হাসপাতালগুলি যখন ছিল না, তখন ক্যানসারের পরীক্ষা-নীরিক্ষা কিংবা চিকিৎসার জন্য দরিদ্র মানুষজনকে ছুটতে হতো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে । সেখানে বায়োপসি করা বা অন্যান্য পরীক্ষা করাতে অনেকটা সময় চলে যেত । ফলে ক্যানসারও সেই সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তো সারা শরীরে । এখন সেই সুবিধে হয়ে গিয়েছে স্পোক হাসপাতালগুলিতেই । অর্থাৎ দ্রুততার সঙ্গে রোগের নির্ধারণ এবং চিকিৎসা শুরু হয়ে যাচ্ছে । যার ফলে মানুষজনের সময় বাঁচছে, বাঁচছে খরচও । দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষজন খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারছেন ।

পিঙ্ক করিডর কী ?

ডাক্তার দীপ্তেন্দ্র সরকার দাবি করেছেন, সারা পৃথিবীতে এটাই প্রথম মডেল । একজন রোগী প্রথমে জেলা স্তরের হাসপাতালে বা ক্যানসার স্পোকে এলেন । সেখানেই নানান পরীক্ষা-নীরিক্ষায় তাঁর রোগের নির্ধারণ হল । এরপর তাঁর সমস্ত তথ্য স্বাস্থ্য ইঙ্গিত পোর্টালে তুলে দেওয়া হল । সঙ্গে সঙ্গে পিজির সঙ্গে ভার্চুয়াল বোর্ড হল, পরের দিন থেকে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল । অর্থাৎ রোগীকে নানা বাধা পেরিয়ে আর এখন পিজিতে যেতে হয় না । পিজির ডাক্তাররাই কার্যত রোগীর কাছে আসছেন । এই মডেলকেই বলা হয় 'পিঙ্ক করিডর'।

এই মডেলই গ্রহণ করেছে ব্রিটেন

ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার ইটিভি ভারতকে জানিয়েছেন, "ভারত সরকারের তিনটি স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চলে । প্রথম হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যানসার, দ্বিতীয় ওরাল ক্যানসার এবং তৃতীয় হচ্ছে সারভাইকাল ক্যানসার । সব রাজ্যই সেটা ফলো করে । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতর এক্সক্লুসিভ একটা নিজস্ব মডেল তৈরি করেছে । ব্রিটিশদের যে 'ব্রেস্ট সোসাইটি ' আছে, তার আমি এডুকেশন কমিটিতে আছি । ব্রিটিশরা যখন আফ্রিকার তিনটি দেশে ক্যানসার সংক্রান্ত চিকিৎসার পরিষেবা দেওয়ার জন্য কমিটি তৈরি করে, তখন আমাকেও সেই কমিটিতে রাখা হয়েছিল । তখন আমি ওদের বলি যে, তোমরা যে ইংল্যান্ডের মডেল তৈরি করেছো, সেটা যদি আফ্রিকার উগান্ডায় গিয়ে তোমরা সেটাকে প্রয়োগ করো, তার সফলতা কতটা পাবে ! তখন আমি আমাদের মডেলের কথা ওদেরকে জানাই এবং ওরা উচ্ছ্বসিত হয়ে এই মডেলটিকে গ্রহণ করেছে ৷ আফ্রিকাতে ওরা ক্যানসার ট্রিটমেন্ট আমাদের রাজ্যের মডেলেই করছে ।"

বলাই বাহুল্য, বিশ্ব দরবারে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের ক্যানসার মডেল সমাদৃত হচ্ছে এবং এই মডেলে আন্তর্জাতিক স্তরে চিকিৎসা চলছে, যা রাজ্যের ক্যানসার কেয়ার বিভাগের জন্য অবশ্যই একটি সাফল্যের পালক ।