হাসনাবাদে ঘুমের মধ্যে যুবকের মৃত্যুর নেপথ্যে এসআইআর 'আতঙ্ক', হাওড়ায় শুনানির লাইনেই প্রাণ হারালেন বৃদ্ধ
নতুন বছরে উত্তর 24 পরগনায় এসআইআর আতঙ্কে মোট 5 জনের মৃত্যুর অভিযোগ ৷ বিজেপি ও কমিশনকে নিশানা তৃণমূলের ৷ পাল্টা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির অভিযোগ ৷

Published : January 9, 2026 at 9:36 PM IST
হাসনাবাদ ও লিলুয়া, 9 জানুয়ারি: এসআইআর আতঙ্কে জোড়া মৃত্যু ! একটি উত্তর 24 পরগনার হাসনাবাদে ৷ অপরটি হাওড়ার লিলুয়ায় ৷ হাসনাবাদের ঘটনায় মৃত যুবকের নাম ফিরোজ মোল্লা ৷ এসআইআর-এ তাঁকে শুনানিতে তলব করা হয়েছিল ৷ অভিযোগ, যা নিয়ে আতঙ্কে ভুগছিলেন তিনি ৷ এদিন ঘুমের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে ৷ অন্যদিকে, হাওড়ার লিলুয়ার ঘটনায় এসআইআর শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন বছর 65-র মদন ঘোষ ৷ পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক ৷ দু’টি ঘটনাতেই তৃণমূলের তরফে এসআইআর 'আতঙ্ক'-কে দায়ী করা হয়েছে ৷
হাসনাবাদে এসআইআর 'আতঙ্কে' মৃত্যু !
এসআইআর ‘আতঙ্কে’ মৃত্যুর তালিকায় আরও একটি নাম ৷ মধ্যমগ্রামে এসআইআর-এর শুনানিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যুবকের মৃত্যুর ঘটনার 24 ঘণ্টা কাটতে না-কাটতে, আরেক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল ৷ এবার উত্তর 24 পরগনার হাসনাবাদের ভেবিয়া এলাকায় ৷ জানা গিয়েছে, ঘুমের মধ্যে মারা গিয়েছেন 38 বছরের ফিরোজ মোল্লা ৷ আর এই মৃত্যুর নেপথ্যে এসআইআর 'আতঙ্ক' দায়ী বলে দাবি করেছে মৃতের পরিবার ৷
জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকালে ফিরোজকে ডাকতে গিয়ে কোনও সাড়া পাননি পরিবারের লোকজন ৷ তখনই তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন ৷ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে এলাকায় । শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর ৷ শাসক শিবির যুবকের মৃত্যুর নেপথ্যে 'অপরিকল্পিত' এসআইআর-কে দায়ী করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছে ৷ পাল্টা, এই নিয়ে শাসক দলের বিরুদ্ধে 'আতঙ্ক' সৃষ্টি করার অভিযোগ এনেছে বিজেপি ৷
ফিরোজের পরিবারের অভিযোগ, এসআইআর 'আতঙ্কে' তাঁর মৃত্যু হয়েছে ৷ তাঁরা জানিয়েছেন, 2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকার ‘হার্ড কপি’তে ফিরোজের বাবা-মায়ের নাম রয়েছে ৷ কিন্তু, বিএলও অ্যাপে অনলাইন রেকর্ডের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাচ্ছিল না ৷ তা নিয়ে প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তায় ছিলেন যুবক ৷ আর তার জেরেই ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের ৷
জানা গিয়েছে, ফিরোজ এসআইআর-এর এন্যুমারেশন ফর্ম পূরণ করেছিলেন ৷ 2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় থাকা বাবার নামের তথ্য দিয়ে এন্যুমারেশন ফর্ম জমা দিয়েছিলেন বিএলও-র কাছে ৷ তার পরেও নির্বাচন কমিশনের তরফে শুনানির নোটিশ হাতে পান তিনি ৷ নোটিশে তাঁকে গত 3 জানুয়ারি তলব করা হয়েছিল ৷
সেই মতো ওই দিন ফিরোজ বিডিও অফিসে গিয়েছিলেন শুনানিতে হাজিরা দিতে ৷ সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন 2002 সালের ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের (মোবারেক মোল্লা এবং জরিনা মোল্লা) নাম থাকলেও অনলাইনে 2002 সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবা-মায়ের নাম পাওয়া যাচ্ছিল না ৷ ফলে কী হবে, তা নিয়ে ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যুবক ফিরোজ ৷
এই বিষয়ে ফিরোজের স্ত্রী সেলিনা মোল্লা বলেন, "এসআইআর-এর শুনানিতেও বাবা-মায়ের নাম অনলাইনে মিল না-হওয়ায় প্রচণ্ড দুঃশ্চিন্তায় ভুগছিল ও ৷ আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে এই নিয়ে আবারও কথা বলে ৷ তারপর আবার শুয়ে পড়ে ৷ ডাকতে গিয়ে দেখি নড়াচড়া করছে না ৷ তখন চিৎকার করে সকলকে ডাকি ৷ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ও'কে মৃত বলে ঘোষণা করেন ৷ আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য এসআইআর আতঙ্কই দায়ী ৷"
ফিরোজের মা জরিনা মোল্লা বলেন, "ছেলে এসআইআর নিয়ে সব সময় টেনশন করত ৷ বলত, মা কী হবে আমার ৷ ওঁরা ধরে নিয়ে যাবে না-তো ? আমি ও'কে সব সময় সাহস জোগাতাম ৷ বলতাম, কিছু হবে না ৷ অতো টেনশন করার দরকার নেই ৷ 3 তারিখ শুনানি থেকে আসার পর ভেঙে পড়েছিল ৷ কত করে বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করিস না ৷ কিন্তু, সেই দুঃশ্চিন্তা করতে-করতেই মারা গেল ছেলেটা ৷"
এই ঘটনার খবর পেয়ে নিহত যুবকের বাড়িতে যান ভেবিয়া পঞ্চায়েতের প্রধান অলিউল মণ্ডল-সহ স্থানীয় তৃণমূল নেতারা ৷ এ নিয়ে পঞ্চায়েতের প্রধান অলিউল মণ্ডল বলেন, "এসআইআর-এর জন্য মারা গেল ছেলেটা ৷ পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ৷ ওঁর অবর্তমানে পরিবারের কী হবে, ভাবতে পারছি না ৷ ছোট-ছোট বাচ্চা আছে... আমরা পরিবারের পাশে আছি ৷ তৃণমূলের তরফে যতটুকু সাহায্য দেওয়া যায়, আমরা করব ৷ নির্বাচন কমিশনের অপরিকল্পিত এসআইআর-এর জন্য রাজ্যে বহু মানুষের প্রাণ যাচ্ছে ৷ আমরা এই অপদার্থ নির্বাচন কমিশনকে ধিক্কার জানাই ৷"
এই বিষয়ে বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার যুব মোর্চার সভাপতি পলাশ সরকার বলেন, "যে কোনও মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক ৷ কোনও মানুষের মৃত্যু হলেই এসআইআর বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ৷ এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যু, এটা একেবারে ভুল কথা ৷ আসলে তৃণমূল কংগ্রেস এসআইআর-এর ভয়ে এতটাই ভীত হয়ে পড়েছে যে, তারা এখন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে ৷ এসআইআর শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয় ৷ ভারতের অনেক রাজ্যেই চলছে ৷ কিন্তু, কোথাও কোনও মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে না ৷ এর থেকে বোঝা যায়, তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে ৷ সেই কারণে এসআইআর নিয়ে মিথ্যে প্রচার করতে হচ্ছে শাসক দলকে ৷ সেটা বুঝতে পেরেছে সকলেই ৷ ছাব্বিশের ভোটে তৃণমূলকে উচিত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলার জনগণ ৷"
প্রসঙ্গত, নতুন বছরের শুরুতেই এসআইআর 'আতঙ্কে' স্বরূপনগর, হিঙ্গলগঞ্জ, নৈহাটিতে পরপর তিন জনের মৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছিল ৷ বৃহস্পতিবারই মধ্যমগ্রামে এসআইআর-এর শুনানিতে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে আরও এক যুবকের মৃত্যু হয় ৷ সেখানেও তৃণমূলের তরফে এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ করা হয় ৷ এবার একই অভিযোগ উঠল হাসনাবাদের ঘটনাতেও ৷ শুধুমাত্র উত্তর 24 পরগনা জেলাতেই এসআইআর আতঙ্কে মোট পাঁচজনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠল ৷ যাকে হাতিয়ার করে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে তৃণমূল ৷
হাওড়ায় এসআইআর 'আতঙ্কে' মৃত্যু !
অন্যদিকে, হাওড়ার লিলুয়ার চকপাড়ার বাসিন্দা মদন ঘোষের (65) আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় এসআইআর-কে দায়ী করল স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব ৷ শুক্রবার এসআইআর শুনানিতে হাজিরা দিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই বৃদ্ধ ৷ শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন ৷ এই ঘটনায় ব্লক অফিসে প্রশাসনিক অব্যবস্থার অভিযোগ উঠেছে ৷
পরিবারের দাবি, ডোমজুড় বিধানসভা কেন্দ্রের 235 নম্বর বুথের ভোটার মদন ঘোষকে সপরিবারে হাজিরা দিতে বলা হয়েছিল বালি-জগাছা ব্লকের কোনা বিডিও অফিসে ৷ সকাল থেকেই সেখানে উপচে পড়া ভিড় ছিল ৷ দীর্ঘ লাইন এবং চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাঁকে ৷ অভিযোগ, অপেক্ষার মধ্যেই হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান তিনি ৷
সহযোগিতার অভাবে প্রথমে ঘটনাস্থলেই সময় নষ্ট হয় বলে পরিবারের অভিযোগ ৷ পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন ৷ বৃদ্ধ মদন ঘোষের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ডোমজুড়ের বিধায়ক কল্যাণ ঘোষ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ডোমজুড় কেন্দ্রের সভাপতি তথা জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ তাপস মাইতি ৷ মৃতের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে তাঁরা সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন ৷
বিধায়ক কল্যাণ ঘোষ বলেন, "এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে মানসিক ও শারীরিক চাপ দেওয়া হচ্ছে ৷ আজ তার ফল প্রাণহানি ৷ এর নৈতিক দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে না ৷" তাপস মাইতির কটাক্ষ, "ভোটারদের ভয় দেখিয়ে, অযথা শুনানির ডাক দিয়ে বিজেপি ও কেন্দ্র সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার নামিয়ে এনেছে ৷"
তৃণমূল সূত্রে খবর, ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে দলীয় স্তরে ৷ এসআইআর শুনানি ঘিরে পরপর মৃত্যুর অভিযোগ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়েছে ৷

