পাটের বদলে প্লাস্টিকের বস্তা! গিরিরাজ সিংকে চিঠি ঋতব্রতর, কাঠগড়ায় তুলছেন কেন্দ্রীয় নীতিকেই
বুধবার কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংকে চিঠি পাঠিয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ তথা তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

Published : January 7, 2026 at 9:57 PM IST
কলকাতা, 7 জানুয়ারি: খাদ্যশস্য সংগ্রহের জন্য পাটের বস্তার পরিবর্তে বিপুল পরিমাণে প্লাস্টিকের বস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র, আর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই এবার কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংকে চিঠি দিলেন রাজ্যসভার সাংসদ তথা তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার লেখা ওই চিঠিতে ঋতব্রত অভিযোগ করেছেন, 2026-27 সালের রবি মরশুমের (RMS) জন্য খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রক যে 9.22 লক্ষ বেল প্লাস্টিকের বস্তা (এইচডিপিই/পিপি) ব্যবহারের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তাতে বস্ত্রমন্ত্রকেরও পূর্ণ সম্মতি রয়েছে।
সাংসদের মতে, কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ কোনও সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ‘রাষ্ট্র-অনুমোদিতভাবে পাট শিল্পের গুরুত্ব কমানোর’ একটি প্রচেষ্টা। তিনি চিঠিতে লিখেছেন, যখন পাট শিল্প প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে 9.22 লক্ষ বেল প্লাস্টিকের বস্তার বরাত দিয়ে সরকার সচেতনভাবে পাটের চাহিদা কমিয়ে দিল। একে তিনি বস্ত্রমন্ত্রকের গত দু'বছরের ‘নীতিগত ব্যর্থতা’র চরম পর্যায় বলে অভিহিত করেছেন।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চিঠিতে অভিযোগের সুরে লিখেছেন, বিগত বেশ কয়েকটি মরশুম ধরে পাট চাষিদের কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। যখন পাটের দাম ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (MSP) নিচে ছিল, তখন চাষিদের বাঁচাতে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। তাঁর কথায়, সরকারের সংগ্রহ প্রক্রিয়া ছিল ‘সাময়িক এবং লোকদেখানো’, যার সঙ্গে কোনও বাফার স্টক বা বাজার স্থিতিশীল করার কাঠামোর কোনও যোগ ছিল না।
চিঠিতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যখন পাটের ফলন বেশি ছিল, তখন তা দিয়ে কোনও মজুত ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়নি, ফলে চাষিরা অভাবী বিক্রি বা ডিসট্রেস সেলে বাধ্য হয়েছেন। আর এখন যখন বাজারে পাটের জোগান কম, তখন সেই অভাবকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে প্লাস্টিকের বস্তা আমদানি করা হচ্ছে। সাংসদের ভাষায়, "এই সংকট প্রাকৃতিক নয়, এটি নীতিপঙ্গুত্ব বা পলিসি প্যারালাইসিসের সরাসরি ফলাফল।" তিনি লেখেন, সরকারের এই ‘স্টপ-স্টার্ট’ বা থেমে-থাকা নীতি বাজারের আস্থা ধ্বংস করেছে এবং পাট বলয় জুড়ে জীবিকার সংকট তৈরি করেছে।

চিঠিতে ঋতব্রত পরিবেশগত দিক থেকেও কেন্দ্রের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে এক চরম স্ববিরোধিতা। তাঁর প্রশ্ন, একদিকে যখন সরকার পরিবেশ রক্ষা এবং 'সিঙ্গল-ইউজ প্লাস্টিক' কমানোর কথা বলছে, তখন অন্যদিকে জৈব বা বায়োডিগ্রেডেবল পাটের বদলে কেন পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক প্লাস্টিক প্যাকেজিংকে সরকারি অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে? একে তিনি ‘পলিসি প্রাগমাটিজম’ বা বাস্তববাদী নীতি নয়, বরং ‘পলিসি অ্যাবডিকেশন’ বা দায়িত্ব থেকে পলায়ন বলে উল্লেখ করেছেন।
সাংসদ সতর্ক করে লিখেছেন, এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে চলেছে। তাঁর মতে, দুর্বল এমএসপি ব্যবস্থার কারণে যাঁরা এতদিন কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, প্লাস্টিকের এই আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির ফলে সেই চাষিদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। পাশাপাশি, লক্ষ লক্ষ চটকল শ্রমিক কাজ হারাবেন কারণ নিশ্চিত চাহিদা কমে যাওয়ায় মিলগুলো তাদের শিফট কমিয়ে দিচ্ছে এবং উৎপাদন স্থগিত রাখছে।

চিঠির শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, পাট অর্থনীতির এই ধস আকস্মিক নয়, এটি একাধিক ভুল সিদ্ধান্তের ফল। প্রথমে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে অস্বীকার করা এবং এখন শ্রমিকদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া - বস্ত্রমন্ত্রক এভাবেই পাট শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, "এই রেকর্ড থেকে যাবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও শ্রমিকরা মনে রাখবেন কারা ভারতের এই প্রাকৃতিক তন্তুর পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর কারা তার বদলে প্লাস্টিককে জায়গা করে দিয়ে তাদের উচ্ছেদ হওয়ার অনুমোদন দিয়েছিল।"

