ETV Bharat / state

কৃত্রিম রং নয়, আদিবাসীদের বাহা উৎসবে জল-ফুলের রেণু মাখিয়ে প্রকৃতি উদযাপন

ধামসা-মাদল নিয়ে নাচছেন পুরুষ ও মহিলারা । একইসঙ্গে তাঁরা একে অন্যের মাথায় জল ঢেলে আনন্দ করছেন ।

ETV BHARAT
আদিবাসীদের বাহা উৎসবে জল-ফুলের রেণু মাখিয়ে প্রকৃতি উদযাপন (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : March 3, 2026 at 5:23 PM IST

3 Min Read
Choose ETV Bharat

তারক চট্টোপাধ্যায়

আসানসোল, 3 মার্চ: জল, জঙ্গল আর জমি । আদিবাসীদের জীবনযাত্রা প্রকৃতির এই তিন উপাদানেই ভিত্তি ক'রে রয়েছে । আর তাই বাংলা তথা গোটা দেশের মানুষ যখন দোল বা হোলি উৎসবে মেতে উঠেছেন, তখন আদিবাসীরা মাতেন 'বাহা' আনন্দ উৎসবে । এই উৎসব যেন প্রকৃতির আরাধনা করা । প্রকৃতির সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠা । আর তাই বাহা উৎসবে কোনও কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না । বরং এই উৎসবে একে অন্যকে জল ও ফুলের রেণু দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় ।

হীরাপুরের রাঙাপাড়া হারামডিহি গ্রাম । এই গ্রামটি মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত । গ্রামে গিয়ে দেখা গেল গোটা গ্রামের মাটির বাড়ি নিকানো হয়েছে প্রাকৃতিক রঙে । গ্রামকে সাজানো হয়েছে ফুলে, মালায় । আর তারই মাঝে ধামসা-মাদল নিয়ে নৃত্যরত আদিবাসী নারী-পুরুষেরা । একইসঙ্গে তাঁরা একে অন্যের মাথায় জল ঢেলে আনন্দ করছেন । অনাবিল আনন্দে মেতে উঠেছেন আদিবাসী গ্রামের মানুষজন ।

বাহা উৎসবে ধামসা-মাদলে রঙের উৎসব পালন আদিবাসীদের (নিজস্ব ভিডিয়ো)

কী এই বাহা উৎসব

গোটা বাংলা এবং দেশের মানুষ যখন হোলি ও দোলে মেতে উঠেছেন । তখন আদিবাসীরা মাতেন তাঁদের নিজস্ব বাহা উৎসবে । কী এই বাহা উৎসব ?

ETV BHARAT
ধামসা-মাদলের তালে নাচছেন পুরুষ ও মহিলারা (নিজস্ব চিত্র)
হারামডিহি গ্রামের বাসিন্দা মোতিলাল সরেন জানালেন, "দোল বা হোলির সঙ্গে এই উৎসবের কোনও সম্পর্ক নেই । এটা আদিবাসীদের নিজস্ব একটা উৎসব । এই উৎসব মূলত তিনদিনের । প্রথম দিন আমরা গ্রামের একটা জায়গায় গিয়ে ঠাকুরের স্থান তৈরি করি । পাশাপাশি ওই দিন বাড়ির পুরুষেরা জঙ্গলে গিয়ে শালফুলের রেণু সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন । তা বাড়িতে এনে শুদ্ধ জলে ডুবিয়ে রাখা হয় । দ্বিতীয় দিনে সেই জল নিয়ে যাওয়া হয় ওই ঠাকুরের স্থানে । সেখানে পুজো-আর্চা হয় । এরপর আমাদের ধর্মীয় গুরু এই শুদ্ধ জলকে প্রতি বাড়িতে দিয়ে আসেন । তৃতীয় দিন সেই জল নিয়েই আমাদের খেলা হয় ।"
ETV BHARAT
এই উৎসব যেন প্রকৃতির আরাধনা করা (নিজস্ব চিত্র)

তিনি আরও জানান, "একদিকে আনন্দে নাচ-গান হয়, অন্যদিকে জল ও ফুলের রেণু ঢেলে দেওয়া হয় একে অন্যের মাথায় । তবে এই জল যে কেউ কারও মাথায় ঢালতে পারে না । যাঁর সঙ্গে আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে, ঠাট্টা তামাশা চলে যাঁর সঙ্গে, যেমন দাদু-নাতি বা নাতনি, জামাইবাবু এবং শ্যালক-শ্যালিকা, এই ধরনের যাঁদের সঙ্গে আমাদের আনন্দের সম্পর্ক রয়েছে, তাঁদের মাথাতেই এই জল ঢেলে দেওয়া হয় । তবে জল ঢালার সঙ্গে সঙ্গেই একে অন্যকে শ্রদ্ধা জানানো হয় ।"

ETV BHARAT
একে অন্যের মাথায় জল ঢেলে আনন্দ করছেন আদিবাসীরা (নিজস্ব চিত্র)

বাহা উৎসবের মাঝেও বার্তা

মোতিলাল সরেন জানালেন, "প্রকৃতিকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে । সবাই বলছেন গাছ লাগান, আমরা বলি গাছ বাঁচান । গাছ প্রকৃতির নিয়মে নিজে থেকেই হবে । গাছকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে । বাহা উৎসবের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতিকে বাঁচানোরই কথা বলি । প্রকৃতি না-বাঁচলে এই বিশ্ব বাঁচবে না ।

ETV BHARAT
বাহা উৎসবে কোনও কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয় না (নিজস্ব চিত্র)

কী রকম আনন্দ হয়

বাহা উৎসবের তৃতীয় দিনে আনন্দে মেতে ওঠেন আট থেকে আশির সবাই । ধামসা মাদলের তালে হয় নাচ-গান । তার সঙ্গে সঙ্গেই চলে একে অন্যের গায়ে জল ঢেলে আনন্দ করা । স্থানীয় বাসিন্দা জানালেন, "আমরা কোনও কৃত্রিম রং আমাদের এই খেলায় ব্যবহার করি না । আমরা প্রকৃতির জল এবং ফুলের রেণু দিয়েই একে অন্যকে মাখিয়ে আনন্দ করি । এই উৎসবে আমাদের আত্মীয়রা সবাই ঘরে আসে । পাশাপাশি আত্মীয়তার বন্ধনে এই তিনদিন আমাদের নাচে-গানে, খাওয়া-দাওয়ায় আনন্দ করে কাটে ।"

ETV BHARAT
হীরাপুরের রাঙাপাড়া হারামডিহি গ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত (নিজস্ব চিত্র)