বারুইপুর-কাণ্ডে পাচারচক্রের আশঙ্কা ! 10 হাজার টাকার লোভ দেখিয়ে নাবালিকাকে ফাঁদে ফেলার অভিযোগ, সিটের হাতে 'ডিজিটাল প্রমাণ'
ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা এক বিস্ফোরক তথ্যের পর নারীপাচার চক্রের দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ ও বিশেষ তদন্তকারী দল।

Published : July 6, 2026 at 10:44 PM IST
কলকাতা, 6 জুলাই: বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ৷ শুধু ধর্ষণ ও খুন নয়, এই ঘটনার নেপথ্যে নারীপাচার চক্রের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও এখন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা ৷ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা এক বিস্ফোরক তথ্যের পর এই দিকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু করেছে পুলিশ এবং বিশেষ তদন্তকারী দল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত প্রভাস মণ্ডল জেরায় দাবি করেছে, মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার তাকে বলেছিল, নাবালিকাকে ফুসলিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসতে পারলে তাকে 10 হাজার টাকা দেওয়া হবে। এই বক্তব্য সামনে আসতেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। কারণ, দক্ষিণ 24 পরগনার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই নারীপাচার চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে ৷ সেই কারণেই তদন্তকারীদের অনুমান, নাবালিকাকে প্রথমে অন্য কোনও উদ্দেশ্যে, সম্ভবত পাচারের জন্যই অপহরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনও এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি তদন্তকারী দল।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, নৃশংস অপরাধ ঘটানোর আগে অভিযুক্তরা একত্রিত হয়ে মাদক সেবন করেছিল। পুলিশের দাবি, মাদকের নেশায় আচ্ছন্ন অবস্থাতেই তারা এই বর্বর পরিকল্পনা কার্যকর করে। ঘটনার আগে এবং পরে তাদের গতিবিধি খতিয়ে দেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে ৷ এই বিষয়ে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সিটের এক আধিকারিক বলেন, "আমরা সবদিক খতিয়ে দেখছি। আমাদের হাতে একাধিক তথ্য আছে ৷ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।"
তদন্তে বড় ভূমিকা নিয়েছে সিসিটিভি ফুটেজও । ঘটনার আগে একটি ফুটেজে দেখা যায়, লাল রঙের টি-শার্ট এবং নীল রঙের টুপি পরা এক যুবকের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে ওই নাবালিকা। সেই ফুটেজ প্রকাশ্যে আসতেই এলাকার বাসিন্দারা ওই যুবককে প্রভাস মণ্ডল বলে শনাক্ত করেন। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তে গতি আসে।
এরপর পুলিশ বারুইপুর বাজার এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে গ্রেফতার করে ৷ ধীরে ধীরে গ্রেফতার করা হয় মামলায় জড়িত অন্য অভিযুক্তদেরও। তদন্তকারীদের দাবি, প্রত্যেকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং কে কোন পর্যায়ে এই অপরাধে জড়িত ছিল, তার পূর্ণ চিত্র তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা জেরার বয়ান নয়, পুলিশের হাতে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণও। কল ডিটেল রেকর্ড এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ঘটনার দিন রাত প্রায় 8টা থেকে সাড়ে 11টা পর্যন্ত আনন্দ সর্দার, দিবাকর, প্রভাস এবং প্রবীর মণ্ডলের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন একই এলাকায় ছিল। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্য প্রমাণ করে যে অভিযুক্তরা ঘটনার সময় একসঙ্গেই ছিল এবং পরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটিত করেছে।
তদন্তকারী দলের একাংশের মতে, এটি কোনও আকস্মিক অপরাধ নয়; বরং পরিকল্পনা করেই নাবালিকাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। এখন পুলিশ খতিয়ে দেখছে, এই ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনও অপরাধচক্র বা নারীপাচার চক্রের সদস্যদের যোগাযোগ ছিল কি না। সেইসঙ্গে অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন, ফোনে যোগাযোগ এবং পূর্ব অপরাধের রেকর্ডও খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। তদন্তকারীদের আশা, জেরা, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই এই ঘটনার কারণ স্পষ্ট হবে।

