সোনারপুরে হামলার জেরে বাড়ল নিরাপত্তা, এক্স ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাবেন অভিষেক
সোনারপুরে হামলার ঘটনার পর রাজ্য সরকারের তরফে অভিষেকের নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবার তাঁকে ‘এক্স’ ক্যাটেগরির সুরক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।

Published : May 31, 2026 at 2:59 PM IST
কলকাতা, 31 মে: সোনারপুরে তুমুল বিক্ষোভ ও হেনস্তার শিকার হওয়ার পর আপাতত নিজের বাড়িতেই চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাইপাসের ধারের দুটি বেসরকারি হাসপাতাল তাঁকে পরীক্ষা করে ‘ফিট’ সার্টিফিকেট দিলেও, তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এদিকে, সাংসদের উপর এই অভাবনীয় হামলার ঘটনার পর রাজ্য সরকারের তরফে তাঁর নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিষেকের নিরাপত্তা বাড়িয়ে এবার তাঁকে ‘এক্স’ ক্যাটেগরির সুরক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। এরই পাশাপাশি, সোমবার বিধানসভার জাল সই কাণ্ডে তাঁকে ভবানীভবনে তলব করেছে সিআইডি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি এই তলবে সাড়া দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
জানা গিয়েছে, শুক্রবার সোনারপুরে এক মৃত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আচমকা বিক্ষোভকারীদের হাতে ঘেরাও এবং মারধরের শিকার হন অভিষেক। এই ঘটনার পর যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি সরাসরি বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছন। কিন্তু সেখানে তাঁর সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না, এই অভিযোগ তুলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং তাঁকে নিজের গাড়িতে করে অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। দ্বিতীয় হাসপাতালেও বিশদ স্বাস্থ্য় পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন যে, অভিষেকের শরীরে গুরুতর কোনও চোট আঘাত নেই এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি রাখারও কোনও প্রয়োজন নেই। এরপর পরপর দুটি হাসপাতাল থেকে পর্যায়ক্রমে ‘ফিট’ সার্টিফিকেট পেয়ে রাতেই কালীঘাট রোডের বাড়িতে ফেরেন এই তৃণমূল নেতা।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও বাড়িতে তাঁকে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁর বাড়িতে কার্যত মিনি হাসপাতালের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সূত্রের খবর, হামলার ওই ঘটনার পর থেকে তাঁর রক্তচাপ বারবার ওঠা-নামা করছে। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে শনিবার রাতের পর রবিবার সকালেও তাঁকে একবার অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। বাড়িতে আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য স্যালাইনের ব্যবস্থাও মজুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে আইসিইউ-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। চিকিৎসক সূত্রের খবর, অভিষেকের চোখের পুরনো একটি সমস্যা রয়েছে। শুক্রবারের অনভিপ্রেত হামলায় তাঁর চশমা ভেঙে যাওয়ায় চোখে নতুন করে কোনও আঘাত লেগেছে কি না, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখছেন চিকিৎসকরা।
শনিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছিলেন যে, অভিষেকের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে তাঁকে ফোন করেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি। এমনকী, উন্নত চিকিৎসার জন্য অভিষেককে হায়দরাবাদে নিয়ে যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। তবে এই মুহূর্তে তৃণমূল সাংসদকে হায়দরাবাদে নিয়ে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা পরিবারের নেই বলেই সূত্রের খবর। যেহেতু গোটা ঘটনাটি জনসমক্ষে ঘটেছে এবং তাঁর উপর দিয়ে ব্যাপক ধকল গিয়েছে, তাই মানসিক ও শারীরিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আপাতত তাঁকে বাড়ি থেকে না বেরনোর কড়া নির্দেশ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি, অভিষেকের বাড়িতে বাইরের লোকজনের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই হামলার ঘটনার পর ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে অভিষেকের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় পদক্ষেপ করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। এরপরই অভিষেকের দীর্ঘদিনের ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে মাত্র দু'জন নিরাপত্তারক্ষী বরাদ্দ করা হয়েছিল। সরানো হয়েছিল তাঁর হরিশ মুখার্জি রোডের বাসভবনের পুলিশি নিরাপত্তাও। কিন্তু সোনারপুরের ঘটনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, স্থানীয় কয়েকজন যুবক সাহায্য না করলে বড়সড় বিপদ ঘটতে পারত। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও অভিযোগ করেন যে, নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ নিয়েই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের পরই রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর তড়িঘড়ি অভিষেকের নিরাপত্তা বাড়িয়ে ‘এক্স’ ক্যাটেগরি করল। ফলে এখন থেকে সার্বক্ষণিকভাবে তিনজন সশস্ত্র রক্ষী তাঁর নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকবেন।
একলপ্তে শারীরিক অসুস্থতা এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধির আবহের মাঝেই বিধানসভার জাল সই কাণ্ডে অভিষেককে তলব করেছে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি। শনিবার দুপুরে তদন্তকারী আধিকারিকরা প্রথমে তাঁর হরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে পৌঁছন। সেখানে তাঁকে না পেয়ে কালীঘাট রোডের বাড়ির সামনে গিয়ে অভিষেকের হাতে নোটিস ধরানো হয়। ওই নোটিসে সোমবার তাঁকে ভবানীভবনে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতিতে তাঁর সিআইডি দফতরে হাজিরা দেওয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকদের সম্পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশ অমান্য করে তিনি সোমবার সিআইডির ডাকে সাড়া দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তীব্র ধন্দ রয়েছে। অভিষেক সুস্থ হওয়ার জন্য সিআইডির কাছে আরও কিছুদিন সময় চেয়ে আবেদন করেন, নাকি সোমবারই কড়া নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ভবানীভবনে পৌঁছন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।

