মুখ্যমন্ত্রীর হেলিপ্যাড বানানোর জন্য দফারফা সীমানার, এবার রাজবংশীর জমি দখলের চেষ্টা !
গাজোলে মুখ্যমন্ত্রীর সভার জন্য অস্থায়ী হেলিপ্যাড ওই জমিতেই ৷ দখলের চেষ্টার অভিযোগে প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ৷

Published : December 29, 2025 at 8:19 PM IST
মালদা, 29 ডিসেম্বর: ক’দিন আগেই এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ আদিবাসী ও রাজবংশী অধ্যুষিত গাজোলের সভায় বলেছিলেন, এই দুই সম্প্রদায়ের জমি যাতে কোনওভাবেই মাফিয়ারা হাতাতে না-পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে প্রশাসন ৷ কিন্তু, তাঁর জানা ছিল না, সেই সভার জন্য তৈরি অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণের সময় রাজবংশী সম্প্রদায়ের এক প্রতিনিধির জমির সীমানায় থাকা কাঁটাতারের পিলারের অধিকাংশ নষ্ট করা হয়েছে ৷ অভিযোগ, ওই রাজবংশীর জমি হাতানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মমতার দল আশ্রিত লোকজন ৷
এমনটাই অভিযোগ করেছেন জমির ক্রেতা ৷ যিনি আবার প্রাক্তন কেএলও জঙ্গি ছিলেন ৷ তিনি মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে সাড়া দিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন ৷ এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন ওই ব্যক্তি ৷ যদিও তিনি অভিযোগ করেছেন, এখনও পর্যন্ত প্রশাসন তাঁর আবেদনে কর্ণপাত করেনি ৷ কোন পদক্ষেপও করেনি ৷ আর এই জমি দখলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মালদা সফরের আগে ক্ষোভে ফুঁসছে গাজোলের রাজবংশী সমাজ ৷ অন্যদিকে, এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি বলে দাবি স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের ৷
অভিযোগকারী নাম সতীশ রাজবংশী ৷ একসময় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন ৷ রাজ্য সরকারের আবেদনে সাড়া দিয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন তিনি ৷ তাঁর অভিযোগ, "আমি ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালাই ৷ প্রয়োজনে আমাকে দিনমজুরিও করতে হয়েছে ৷ 2021 সালে গাজোলের বাসিন্দা অমিত প্রসাদ এবং সুমিত প্রসাদের কাছ থেকে আমি জমিটা কিনেছিলাম ৷ সে’বছরই জমির পুরো দাম আমি মিটিয়ে দিই ৷ তাঁরা আমাকে জায়গা বুঝিয়ে দেন ৷"
জমির পরিমাণ ও দাম নিয়ে সতীশ রাজবংশী বলেন, "জমির আয়তন 89 শতক (প্রায় আড়াই বিঘা) ৷ 852 ফুট লম্বা ও 45 ফুট চওড়া ৷ জমির দাম ধার্য হয়েছিল এক কোটি 36 লাখ 36 হাজার 262 টাকা ৷ এই জায়গার চারদিকে সিমেন্টের পিলার তুলে ত্রিস্তর কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলাম ৷ কিন্তু, এখনও আমাকে জমির রেজিস্ট্রি দেওয়া হচ্ছে না ৷ উলটে আমাকে এই জমি থেকে উৎখাত করার চেষ্টা করছেন অমিত ও সুমিত প্রসাদ ৷ তাঁরা শাসকদলের ছত্রছায়ায় রয়েছেন ৷ পুলিশ ও প্রশাসনকে হাত করে তাঁরা আমাকে জমি থেকে বিতাড়িত করতে চাইছেন ৷ আমাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে ৷ মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলেছেন, রাজবংশী ও আদিবাসীদের সম্পত্তি থেকে বিতাড়িত করা যাবে না ৷ কিন্তু, এখানে উল্টো ঘটনা ঘটছে ৷ আমরা যাতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে না-পারি, আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে পড়াশোনা করে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না-পারে, তার জন্যই এসব করা হচ্ছে ৷"
সতীশ বলছেন, "এই জমি কেনার জন্য আমাকে অনেক জায়গা বিক্রি করতে হয়েছে ৷ বাজার থেকে সুদে ঋণ নিতে হয়েছে ৷ জমিটি 12 নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে ৷ এই জমিতেই মুখ্যমন্ত্রীর হেলিপ্যাড হয়েছিল ৷ সেই সময় জমির পিলার ও কাঁটাতার নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ৷ আমি জেলাশাসককে লিখিতভাবে গোটা ঘটনা জানিয়েছি ৷ তার কপি বিডিও এবং গাজোল থানার পুলিশকেও দিয়েছি ৷ আমি চাই, আমার জমির সীমানা যেমন ছিল, তেমন করে দেওয়া হোক ৷ একইসঙ্গে আমাকে যাতে জমি দ্রুত রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়, তার ব্যবস্থা করা হোক ৷ কিন্তু, এখনও প্রশাসনের তরফে কোনও সদুত্তর পাইনি ৷"
স্থানীয় বাসিন্দা তথা আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতা রসক রাজবংশী বলছেন, "গাজোল হল রাজবংশী ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ৷ সতীশ রাজবংশী নিজের জায়গা বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে এই জায়গাটি কেনেন ৷ কিন্তু, 2021 সাল থেকে জমির মালিক তাঁকে নানা অছিলায় জমির রেজিস্ট্রি দিচ্ছেন না ৷ শাসকদলের সঙ্গে জোট বেঁধে, পুলিশ ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে আমাদেরই জনজাতির একজনের সঙ্গে প্রতারণা করছেন তাঁরা ৷ এটা ভীষণ দুঃখজনক ৷ এখানে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও মানা হচ্ছে না ৷ আমরা চাই, সতীশ রাজবংশীর জমির সীমানা দ্রুত ঠিক করে দেওয়া হোক এবং তাঁকে জমির রেজিস্ট্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক ৷ সতীশের সঙ্গে যেভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে, তাতে আগামীতে এখানকার রাজবংশী এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ একজোট হয়ে প্রশাসন ও জমির মালিকের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেব ৷"
বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলকে কড়া ভাষায় বিঁধেছে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ৷ বিজেপির উত্তর মালদা সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক অভিষেক সিংহানিয়া বলেন, "তণমূল হল সমাজবিরোধী ৷ তারা রাজবংশী ও মতুয়া বিরোধী ৷ তারা শুধু নাটক করে বলে রাজবংশীদের সঙ্গে রয়েছে ৷ তৃণমূলের কাজই হল গরিব মানুষের জমি, বাড়ি দখল করা ৷ এই রাজবংশী ভাইয়ের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে ৷ এই সমাজবিরোধীদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে ৷"
এনিয়ে প্রশাসনের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি ৷ ফোন ধরেননি জেলাশাসক প্রীতি গোয়েল ৷ এমনকি অমিত প্রসাদ এবং সুমিত প্রসাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও, তাঁরা সামনে আসেননি ৷ তবে, তৃণমূল পরিচালিত গাজোল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন সতীশ রাজবংশীর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ৷
তাঁর দাবি, "আমরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৈনিক ৷ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হিসাবে বলতে পারি, গাজোল ব্লক তৃণমূল এসবের তোয়াক্কা করে না ৷ এখানে প্রোমোটার রাজ চলে না ৷ এখানে বিরোধী বা অন্য কেউ তৃণমূলকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছে ৷ এসব করে কিছু হবে না ৷ যদি দলের কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে দল নিশ্চয়ই কড়া হাতে ব্যবস্থা নেবে ৷ আমরাও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাব ৷ দলের কেউ এই ঘটনায় জড়িত থাকলে তার শাস্তি হবেই ৷"

