হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই হবে পশুবলি, বালুরঘাটে মহা সমারোহে শুরু বোল্লা কালীপুজো
নতুন করে কালীপুজোর প্রস্তুতি। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী বোল্লা রক্ষাকালী মাতার পুজো শুরু হয়েছে শুক্রবার রাত থেকে ৷ দেখুন ভক্তদের সমাগম ৷

Published : November 8, 2025 at 5:35 PM IST
বালুরঘাট, 8 নভেম্বর: ফের মাতৃআরাধনায় মুখর বালুরঘাটের বোল্লা। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বোল্লা গ্রামে প্রতিবছর যেমন আয়োজিত হয় উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী বোল্লাকালী পুজো। প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও রাস পূর্ণিমার পর যে শুক্রবার আসে সেদিনই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বোল্লা রক্ষাকালীর পুজো অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বালুরঘাট ব্লকের বোল্লা এলাকায় এই রক্ষাকালীর পুজো উপলক্ষে শুরু হয়ে উত্তরবঙ্গের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মেলা (রাস মেলার পর) চলবে তিন দিন ধরে ৷
রাস পূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবার থেকে মায়ের বাৎসরিক পুজো শুরু হয় ও সোমবারে প্রতিমার বিসর্জন হয়। উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের রাসমেলার পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা হিসেবে বিবেচিত। দুই দিনাজপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা ও রাজ্য, এমনকী বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ এই পুজো দেওয়ার পাশাপাশি মেলা দেখতে আসেন।
বোল্লা কালীপুজোর প্রচলন
কথিত আছে, জনৈক এক ব্যক্তি মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুকুর থেকে মায়ের শিলাময় রূপটি উদ্ধার করেন ও প্রতিষ্ঠা করে নিত্য পুজো শুরু করেন। এই সময়ে মাকে 'মরকা কালী' বলে অভিহিত করা হত। প্রতি জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যায় হত মায়ের বিশেষ পুজো। এরপর ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার মুরারীমোহন চৌধুরী ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ঘটনাক্রমে বহু গ্রামবাসী-সহ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তিনি মড়কা কালী মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন। দেবীর কৃপায় তিনি বেকসুর খালাস পান। তখন জ্যৈষ্ঠ মাস আসতে দেরি থাকায় সেই সময় তিনি ধার্য করেন যে, রাস পূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবারে মায়ের পুজো করবেন। সেই থেকে দেবীর বাৎসরিক পুজো ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
বোল্লা নাম কেন ?
শোনা যায়, বল্লভ মুখোপাধ্যায় বলে কোনও জমিদারের নাম থেকে অঞ্চলটির নাম হয় বোল্লা। বোল্লা গ্রামে অবস্থিত রক্ষা কালী মাতা 'বোল্লা রক্ষা কালী' বা 'বোল্লা কালী' নামে ভক্ত মহলে সুপ্রসিদ্ধ। আর সেই থেকেই ভক্তি ও শ্রদ্ধা-সহ বোল্লা কালী মাতার পুজো হয়ে আসছে ৷
বোল্লা কালীপুজো
বর্তমানে সাড়ে সাত হাত উচ্চতার মাতৃমূর্তি পুজো করা হয় এখানে ৷ কয়েক হাজার পাঁঠাবলি ও একটি মহিষ বলি হতো আগে। প্রায় 14 কেজি সোনার গয়নায় মায়ের প্রতিমা সজ্জিত হয়। মায়ের হাতের খড়গ থেকে পুরো শরীর পর্যন্ত সোনার গয়নায় মোড়া থাকে। এছাড়াও বহু ভক্তদের মানত করা ছোট ছোট কালী মূর্তিও দেবীর উদ্দেশে পুজো দেওয়া হয় ৷ বোল্লা পুজোর অন্যতম ভোগ বাতাসা বা মিষ্টান্ন ভোগ। পুজোর ক'য়েকদিন হাজার হাজার কুইন্ট্যাল বাতাসা বিক্রি হয়। জেলা-সহ বাইরে থেকে বাতাসা বিক্রেতারা বোল্লা মেলায় পসরা সাজিয়ে বসেন। বোল্লার রক্ষাকালী মাতার পুজো উপলক্ষ্যে চলে বিশেষ কদমা ও বাতাসা লুট। বোল্লার বিখ্যাত-বাতাসা, কদমা, চিনির তৈরি বিভিন্ন পুতুল লুটের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন ভক্তরা।

হাইকোর্টের নির্দেশে দু'টি বলি হবে এবার
কয়েক বছর আগেও পুজোর দিন হাজারের উপর ছাগ বলি দেওয়া হত। যদিও, এবার কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই এবছর বলি দেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ ও পুরোহিতের কাছ থেকে ৷ জানা গিয়েছে, এবার প্রকাশ্য স্থানে বলি না-দিয়ে ঘেরা জায়গায় দু'টি পাঁঠা বলি দেওয়া হবে। বাকি মানত করা ভক্তদের পাঁঠা উৎসর্গ করে ছেড়ে দেওয়া হবে।
ভক্ত, পুরোহিত ও পুলিশের বক্তব্য
শিলিগুড়ি থেকে আগত ভক্ত কার্তিক পাল জানান, মায়ের কাছে মানত করেছিলাম পাঁঠা বলি দেব। এখানে এসে জানতে পারছি বলি দেওয়া হবে না উৎসর্গ করে ছেড়ে দেওয়া হবে। তাই যা নিয়ম সেটাই মেনে চলব ৷
পূজারী অরূপ চক্রবর্তী জানান, সকাল থেকে নিয়ম করে ঘট ভরে মায়ের পুজোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চ আদালত যেভাবে নির্দেশ দিয়েছে সেভাবেই বলি দেওয়া হবে ৷

বোল্লা কালীপুজোয় কড়া নিরাপত্তা
প্রতিবছর বোল্লা কালী মায়ের পুজো ও মেলায় লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। মেলা উপলক্ষে বসানো হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার চিন্ময় মিত্তাল জানান, নিরাপত্তার যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাইরোড থেকে মন্দির পর্যন্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা-সহ মহিলা পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার, সাদা পোশাকের পুলিশ, পুলিশ আধিকারিক-সহ প্রায় 2 হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার চিন্ময় মিত্তাল। পাশাপাশি, প্রচুর সিসি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হয়েছে মেলা চত্বর। মেলার প্রথম দিনই দুপুরের মধ্যে 14 জনকে পকেটমারি ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

