সীমান্ত সুরক্ষায় বেড়া-চৌকি নির্মাণে কেন্দ্রকে 105 একর জমি দেওয়ার পথে রাজ্য
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে জমি দেওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়৷ এবার মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষা৷

Published : March 2, 2026 at 9:05 PM IST
কলকাতা, 2 মার্চ: সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং নতুন বর্ডার আউটপোস্ট বা সীমান্ত চৌকি তৈরির জন্য কেন্দ্রকে জমি দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত ছাড়পত্র দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সব মিলিয়ে প্রায় 105 একর জমি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার প্রশাসনিক সূত্রে এই খবর জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত 27 জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যকে বিএসএফের হাতে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য জমি তুলে দিতে নির্দেশ দিয়েছিল৷ আগামী 31 মার্চের মধ্যে জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট৷ এবার জমি দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরুর পথে রাজ্য সরকার৷
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় 2216 কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় এখনও কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ হয়নি। কোথাও ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, আবার কোথাও সরাসরি জমি-জটের কারণে বেড়া দেওয়ার কাজ থমকে ছিল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু পাচার, জাল নোটের কারবার-সহ নানা আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে নিশ্ছিদ্র বেড়া না-থাকাটা বিএসএফের কাছে বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই নিয়ে প্রায়ই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন বিজেপি নেতারা৷ এমনকী এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের বিরুদ্ধে৷ সামনেই বিধানসভা নির্বাচন৷ সেখানেও এই নিয়ে আক্রমণ শানাতে হয়তো দেখা যাবে বিজেপিকে৷ তবে তার আগেই বিএসএফ-কে দেওয়া নিয়ে একধাপ এগিয়ে গেল রাজ্য৷

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী গঠন করে দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার নবান্নে ওই মন্ত্রিগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এই মন্ত্রিগোষ্ঠীর রাজ্যের তিন মন্ত্রী — চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাস। সেখানেই বিএসএফ-কে জমি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় ও নীতিগতভাবে জমি দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এবার প্রয়োজন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের৷ সেই কারণেই বিষয়টিকে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়েছে৷
নবান্নের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, "সীমান্তে বেড়া দেওয়া এবং বিওপি তৈরির জন্য বিএসএফের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রস্তাবটি নিয়ে বৈঠকে বিশদে আলোচনা হয়েছে। রাজ্যের কতটা জমি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং কোথায় কোথায় জমি দেওয়া সম্ভব, তা খতিয়ে দেখেছেন মন্ত্রীরা। এই প্রস্তাবটি এবার মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হবে। সেখান থেকে সবুজ সংকেত মেলার পর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করা হবে।"
কতটা জমি ও ঠিক কী উদ্দেশ্যে তা বিএসএফকে দেওয়া হচ্ছে, তার একটি রূপরেখা তৈরি করেছে নবান্ন। প্রশাসন সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় সরকার মূলত 17 কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য রাজ্যের কাছে জমির আবেদন জানিয়েছিল। একই সঙ্গে ওই এলাকায় নজরদারি নিশ্ছিদ্র করতে ন’টি নতুন সীমান্ত চৌকি বা বিওপি নির্মাণেরও প্রয়োজন ছিল। রাজ্যের মন্ত্রিগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মোট 105 একর জমির মধ্যে প্রায় 67 একর জমি ব্যবহার করা হবে ওই 17 কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য। অন্যদিকে, ন’টি নতুন সীমান্ত চৌকি তৈরির জন্য বরাদ্দ করা হবে প্রায় 18 একর জমি। কিন্তু সমস্যা হল এই সমস্ত জমি সরাসরি রাজ্যের হাতে নেই। এর জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে৷
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, রাজ্যের বর্তমান জমি নীতি অনুযায়ী কোনও অবস্থাতেই কৃষকদের কাছ থেকে বলপ্রয়োগ করে জমি অধিগ্রহণ করা হয় না। যে 85 একর (67+18) জমির কথা বলা হচ্ছে, তার প্রায় সবটাই বর্তমানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কৃষিজমি বা বাস্তুভিটে। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জোর করে নয়, বরং সরাসরি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে, ন্যায্য বাজারদরে তাঁদের কাছ থেকে এই জমি কিনে নেওয়া হবে। আর এই কাজ সম্পন্ন হবে জেলাশাসকদের মাধ্যমে। মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা জমি মালিকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করবেন। সরকার নিজে জমি কিনে তারপর তা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেবে বিএসএফের হাতে।
এর পাশাপাশি ওই ন’টি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় রাজ্যের নিজস্ব মালিকানাধীন কিছু খাস বা সরকারি জমিও রয়েছে। মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে স্থির হয়েছে, এই ধরনের প্রায় 20 থেকে 25 একর সরকারি জমিও বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এবং সরকারি জমি মিলিয়ে মোট প্রায় 105 একরের একটি বড় ভূখণ্ড পেতে চলেছে কেন্দ্র।
নবান্নের এক পদস্থ কর্তার কথায়, "এই গোটা প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হল সীমান্ত এলাকায় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটানো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করা।"

