ETV Bharat / state

GI ট্যাগের 15 বছর পার ! ভোটের আগে হাব তৈরির ঘোষণা, কী অবস্থা ধনিয়াখালির তাঁতশিল্পের

নির্বাচনের আগে এসব হাব তৈরির ঘোষণা মিথ্যা আশ্বাস বলে দাবি করেছে বিজেপি । পালটা তৃণমূলের দাবি, শুধু মিথ্যা অপপ্রচার করছে বিরোধীরা ।

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁতশিল্প (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 26, 2026 at 5:11 PM IST

|

Updated : February 26, 2026 at 5:17 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

পলাশ মুখোপাধ্যায়

ধনিয়াখালি, 26 ফেব্রুয়ারি: সামনেই বিধানসভা নির্বাচন ৷ তার আগে হুগলির ধনিয়াখালিতে তাঁত হাব তৈরি করার ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার ৷ যদিও আজ থেকে 15 বছর আগে জিআই ট্যাগ পেয়েছে এই ধনিয়াখালির তাঁত ৷ এতদিনে কী উদ্যোগ নিয়েছে তৃণমূল সরকার ? এসব নির্বাচনের আগে মিথ্যা আশ্বাস বলে দাবি বিজেপির ৷ পালটা তৃণমূলের দাবি, তাঁতিদের উন্নতির জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন ৷ যদিও তাঁতিদের কথায়, জিআই এবং হাব হয়েও কোনও সুবিধাই পাবেন না তাঁরা ৷ বাস্তবে কী অবস্থায় দাঁড়িয়ে ধনিয়াখালির তাঁতশিল্প ? খোঁজ নিল ইটিভি ভারত ৷

চলতি বছরের 18 জানুয়ারি সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসভা করেন ৷ সেখানে তাঁর মুখে শোনা গিয়েছিল ধনিয়াখালির তাঁতশিল্পের কথা । এর ফলে ফের চর্চায় আসে এই তাঁতশিল্প ৷ ধনিয়াখালির তাঁতশিল্প 2011 সালে জিআই ট্যাগ পেয়েছে । এখনও পর্যন্ত 17 জন তাঁতি এই জিআই ট্যাগ পেয়েছেন ।

এখন কী অবস্থায় ধনিয়াখালির তাঁতশিল্প? (ইটিভি ভারত)

ধনিয়াখালির তাঁতশিল্পীদের খুঁটিনাটি

হুগলি জেলায় 25 হাজার তাঁতশিল্পী রয়েছেন । ধনিয়াখালি তাঁতের অন্তর্গত প্রায় এক হাজার তাঁতি রয়েছেন । গত 19 ফেব্রুয়ারি ধনিয়াখালির সোমসপুর ইউনিয়ন কোপারেটিভ উইভারস সোসাইটিতে রাজ্য ও কেন্দ্রের সরকারের তরফে একটি সেমিনার করা হয় । সেখানে জেলার একাধিক শিল্পী অংশগ্রহণ করেন । মূলত সেমিনারে তাঁতের সুতোর ভেষজ রং থেকে তাঁতের উন্নতির জন্য আলোচনা করা হয় । তাঁতের ডিজাইন, বাজারজাত করণ ও সরকারি সুবিধার কথা বলা হয়েছে । তাঁতের শাড়ির উন্নতির ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে ।

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁতের শাড়ি (নিজস্ব ছবি)

ধনিয়াখালির তিনটি সমবায়ের মধ্যে সোমসপুর সমবায়ে 130 জন তাঁতি রয়েছেন । এখানে হ্যান্ডলুম শাড়ি তৈরি হয় । সাধারণ তাঁতের শাড়ি থেকে বালুচরী শাড়ি ও ধুতি তৈরি করেন তাঁতিরা । এখানে 420 টাকার তাঁতের শাড়ি থেকে 1700 টাকা দামে বালুচরী শাড়ি বিক্রি হয় । সেই শাড়ির জন্য 146 টাকা থেকে 622 টাকা মজুরি পান তাঁতিরা । বাজার দর অনুযায়ী তা অত্যন্ত কম । সেই কারণে নতুন প্রজন্ম এই শিল্পে আসছে না বলে দাবি তাঁতিদের ।

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁতের শাড়ি (নিজস্ব ছবি)

শুধু এই সমবায় নয়, জেলার বাকি সমবায় ও তাঁতিদের একই হাল । দিনের পর দিন এই অবস্থার জন্য অনীহা দেখা দিয়েছে তাঁতিদের মধ্যে । অনেকেই তাঁত শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন । সেই দূরবস্থার কথা শোনা গিয়েছে তাঁদের মুখেই । জিআই ও সেমিনার বা হাব হলেও আদৌ কি তাঁরা উপকৃত হবেন ? প্রশ্ন তুলছেন তাঁতিরা ।

তাঁতিদের দুর্দশার কথা

খনিয়াখালির তাঁতি জগদীশ ভর বলেন, "জিআই পাওয়ার পরও আমরা কোনও সুযোগ সুবিধা পাইনি । উন্নতমানের কাপড় বুনে সমিতিতে দেওয়া হয় । খুব বেশি যে লাভবান হয়েছি সেটা নয় । বর্তমানে শাড়ি পরার চল কমে গিয়েছে । মহিলাদের মধ্যে কাপড়ের পরিবর্তে চুরিদার পরার চল বেড়েছে । তাই শাড়ি বিক্রিও কমেছে । বাজার অনুপাতে মজুরি না-বাড়ায়, তাঁতিদের অবস্থা খুবই খারাপ । হাব হলেও শিল্পীদের যে উন্নতি হবে বলে কিছু মনে হচ্ছে না । তাঁত ঘর থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা কিছুই পায়নি । হ্যান্ডলুম তাঁতে পরিশ্রম বেশি মজুরিও কম । কেউই আর তাঁতের কাজে আসতে চাইছে না । এই কাজের পরিবর্তে রাজমিস্ত্রি ও দোকানের কাজ করতে চলে যাচ্ছে । সমবায়ের পরিবর্তে শিল্পীদের অ্যাকাউন্টে টাকা দিলে কিছু সুরাহা পাব ।"

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁতের শাড়ি (নিজস্ব ছবি)

পাওয়ারলুম ও পলিয়েস্টার সুতোর কারণে বাজারে হ্যান্ডলুম তাঁতের শাড়ির চাহিদা কমেছে বলে দাবি তাঁতি শ্রীকান্ত ভরের । তিনি বলেন, "একটা শাড়ি তৈরি করতে 2 থেকে 3 জন কাজ করে । বর্তমানে আমি একটা শাড়ি তৈরি করে মজুরি পাই 210 টাকা । বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ছেলে মেয়ের পড়াশোনা ও সংসার খরচ কীভাবে চালাব বুঝতে পারছি না । জিআই ও হাব হয়ে কোনও সুবিধা পাব না আমরা । সুতির সুতোর দামও বেশি । হ্যান্ডলুম শাড়িতে 250 টাকার কাপড় দেওয়া সম্ভব নয় । পাওয়ারলুম অনায়াসেই তা দিতে পারবে । সেখানেই অনেকটা পার্থক্য থেকে যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে । সেই জন্য এই শিল্পে আমাদের নতুন প্রজন্ম কেউ আসতে চাইছে না ।"

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁত শিল্প (নিজস্ব ছবি)

তাঁতের জন্য চরকা দিয়ে সুতোর যোগান দেন গৃহবধূ চণ্ডী ভর । তিনি বলেন, "একটা শাড়ি তৈরি করতে দু'জন খেটেও মজুরি নেই । সেই জন্যই এই শিল্পটা উঠে যাচ্ছে । এখন বাড়ির মেয়েরা কেউই তাঁতের সুতোতে হাত দেয় না । তাঁত চালানোর জন্য আমাদের স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই খাটতে হয় । আলাদা কোনও আয়ও নেই । একজনেরই আয়ের উপর ভরসা । উন্নতমানের সুতো ও মজুরি বৃদ্ধি হলে এই কাজ করা সম্ভব । নইলে আমাদের বসে যেতে হবে ।"

বিরোধীদের তোপ

ধনিয়াখালির তাঁত শিল্পের রুগ্ন অবস্থার জন্য তৃণমূলকে দায়ী করেছেন বিজেপি নেতা অজয় কৈরি । তিনি বলেন, "রাজ্যের শাসকদল কেন্দ্র সরকারের দিকে আঙুল তুলছে । শুধু দোষ দিলেই হবে না, রাজ্য সরকারের প্রধান ভূমিকা থাকে । এখানকার তাঁত শিল্প মৃতপ্রায়, বিধায়ক অসীমা পাত্র কী করছেন ? এর জন্য প্রথম দায়ী বামফ্রন্ট আর এখন তৃণমূল সরকার । 15 বছর বিধায়ক থাকার পর তিনি তাঁতিদের জন্য কিছু করেননি । তাঁতিরা ন্যূনতম মজুরি পায় না । তাঁতের আধুনিকীকরণ কিছু হয়নি । মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে । কেন্দ্র সরকার অর্থ বরাদ্দ করলেও তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে না । রাজ্যের সরকার পরিবর্তন না হলে তাঁতিদের উন্নতি হবে না ।"

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁত (নিজস্ব ছবি)

সরকারের উদ্যোগের খতিয়ান

যদিও রাজ্য সরকারের দাবি, তাদের তরফে তাঁতিদের জন্য নানারকম পদক্ষেপ করা হয়েছে । তাঁতিদের স্বাবলম্বী করার জন্য বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে জেলা প্রশাসন । কীভাবে কাপড়ের ডিজাইন থেকে রংয়ের ব্যবহার করা হবে, হাতে-কলমে তা শেখানো হচ্ছে । তাঁতিদের জন্য রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের তরফে সেমিনার করা হয় । ধনিয়াখালি সমবায়, সোমসপুর সমবায়ের তাঁতিদের আর্থিক উন্নতির চেষ্টা চলছে । বাজারে হ্যান্ডলুম শাড়ির চাহিদা বাড়ে, তার জন্য একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার ।

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁত জিআই ট্যাগ পেয়েছে (নিজস্ব ছবি)

তাঁতিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা

344টি তাঁত ঘর । তাঁতি সাথী প্রকল্পের মধ্যে একাধিক তাঁত পেয়েছেন শিল্পীরা । তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে । বৃদ্ধ তাঁতিদের জন্য এক হাজার টাকা করে বার্ধক্য ভাতা দেওয়া হয় । গুড়াপ সমবায়, ধনিয়াখালি সমবায় ও সোমসপুর সমবায় মিলিয়ে সরকারি তরফে সর্বাধিক এক কোটি 40 লক্ষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে । ঋণের উপর 6 শতাংশ সুদের ছাড় ব্যবস্থা আছে ।

Dhaniakhali Tant
সরকারের উদ্যোগের খতিয়ান (ইটিভি ভারত)

কিন্তু কেন্দ্রের তরফে রঙের কারখানার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল আগে । বছরে রাজ্য ও কেন্দ্র মার্কেটিং ইন্সেন্টিভ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, কিন্ত সেটা খুবই কম । রাজ্য সরকারের তরফে এর আগে ধনিয়াখালি তাঁতের জন্য 2020-21 সালে ক্লাস্টার তৈরির ঘোষণা করা হয়েছিল । কিন্ত বাস্তবে তা রূপ পায়নি । এবছর আবার হাব তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ।

Dhaniakhali Tant
তাঁতের কাজে ব্যস্ত শিল্পী (নিজস্ব ছবি)

ধনিয়াখালিতে তাঁতের হাবের বরাদ্দ

চুঁচুড়া হ্যান্ডলুমের ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট অফিসার বাসুদেব পাল বলেন, "জেলাশাসক, হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিধায়ক অসীমা পাত্রের উদ্যোগে ধনিয়াখালিতে তাঁতের হাব তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে । জাতীয় সড়কের উপর এক একর জমি নিয়ে তৈরি হবে এই হাব । প্রায় 4 কোটি টাকা ব্যয়ে ট্রেনিং সেন্টার থেকে ডিজাইনিং সেন্টার তৈরি হবে । এমনকি শাড়ি ও হস্তশিল্পের এক্সক্লুসিভ সেন্টার তৈরি হবে । নতুন প্রজন্মকে তাঁত শেখানোর ব্যবস্থা করা হবে । হ্যান্ডলুম শাড়ির বাজার শেষ করে দিয়েছে পাওয়ারলুম । দামের তারতম্যের জন্য পাওয়ারলুমের উপর সরকারি তরফে নির্দেশিকা জারি করার ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করা হয়েছে ।"

বিধায়কের দাবি

ধনিয়াখালির বিধায়ক অসীমা পাত্র বলেন, "ধনেখালির তাঁতের শাড়ি কিনে নিয়ে যায় তন্তুজ-সহ একাধিক সংস্থা । তাঁত শিল্পের উন্নতির জন্য আমরা একাধিকবার তাঁতিদের সঙ্গে বসেছি । পরবর্তী প্রজন্ম তাঁত শিল্পে উৎসাহ না-দেখালে আমরা কিছু করতে পারব না । রাজ্য সরকারের তরফে বহুবার ট্রেনিং করানো হয়েছে । তাঁত ঘর, তাঁতের ঋণ ও তাঁত দেওয়া-সহ তাঁতের উন্নতির জন্য বহু কাজ করেছি । তাঁত হাব করার জন্য অনুমোদন জানিয়েছি ।"

Dhaniakhali Tant
সেমিনারের সার্টিফিকেট পেয়েছেন তাঁতি (নিজস্ব ছবি)

তাঁতের উন্নতি হয়নি বলে বিজেপি যে অভিযোগ করেছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বিজেপিকে দেখানোর জন্য আমাদের উন্নয়ন করতে হয় না । বাংলার উন্নয়ন ঘরে ঘরে কীভাবে পৌঁছেছে সেটা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়ে দিয়েছেন । মিথ্যা অপপ্রচার করে বাংলায় কিছু লাভ পাবে না বিজেপি ।"

Dhaniakhali Tant
ধনিয়াখালির তাঁত (নিজস্ব ছবি)

রাজ্য সরকারের নয়া উদ্যোগে আদৌ কি স্বচ্ছলতা ফিরবে তাঁতিদের ? শাড়ির দাম ও মজুরি বৃদ্ধি হবে ? নাকি এই ভাবেই অবলুপ্তি ঘটবে প্রাচীন এই তাঁত শিল্পের । সময় দেবে তার উত্তর ৷

Last Updated : February 26, 2026 at 5:17 PM IST