সৌরবিদ্যুতে সেচ, সবংয়ে চালু রাজ্যের প্রথম সোলার টিউবওয়েল প্রকল্প
তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত কৃষকরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন । বর্তমানে 130 বিঘা জমিতে এই সৌর সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে জল সরবরাহ করা হচ্ছে ।

Published : February 25, 2026 at 7:49 PM IST
কলকাতা, 25 ফেব্রুয়ারি: চিরাচরিত বিদ্যুতের উপর নির্ভরতা কমিয়ে এবার পরিবেশবান্ধব শক্তির সাহায্যে সেচ ব্যবস্থায় জোর দিল রাজ্য সরকার । কৃষকদের সুবিধার্থে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের দেবভোগ এলাকায় চালু হল রাজ্যের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ চালিত মিডিয়াম ডিপ টিউবওয়েল (MDTW) প্রকল্প ।
মঙ্গলবার রাজ্যের জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী মানসরঞ্জন ভুঁইয়ার উপস্থিতিতে এই পাইলট প্রজেক্টের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরা হয় । মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এই এলাকায় সেচের জলের সমস্যা মেটাতেই রাজ্য সরকারের এই অভিনব উদ্যোগ । জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন (WRI&D) দফতরের এই নতুন প্রকল্পের ফলে স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে ।

উপকৃত কৃষকরা
জানা গিয়েছে, এই সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে সবংয়ের ওই এলাকার প্রায় 150 বিঘা কৃষিজমিতে অনায়াসে সেচের জল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে । এর ফলে সরাসরি উপকৃত হবেন এলাকার 358 জন কৃষক । উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সুবিধাভোগী কৃষকদের মধ্যে সিংহভাগই তফসিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের । সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, 300 জন আদিবাসী কৃষক, 50 জন সাধারণ বর্গ এবং আটজন তফসিলি জাতি (SC) ভুক্ত কৃষক এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন ।
কত বিঘা জমি চাষ ?
এই বিপুল সংখ্যক কৃষকের সেচের জলের জন্য আর বৃষ্টির দিকে বা দামি জ্বালানির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না । ইতিমধ্যেই এই পাইলট প্রজেক্টের সুবিধা পেতে শুরু করেছেন এলাকার সাধারণ কৃষকরা । বর্তমানে 130 বিঘা জমিতে এই সৌর সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে জল সরবরাহ করা হচ্ছে । কৃষি দফতর সূত্রে খবর, এর মধ্যে 60 বিঘা জমিতে ধান, 40 বিঘায় রজনীগন্ধা ফুল এবং 30 বিঘা জমিতে বিভিন্ন শাকসবজির চাষ হচ্ছে ।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এই প্রকল্প যথেষ্ট উন্নত ও আধুনিক । মোট 43 লক্ষ 96 হাজার টাকা ব্যয়ে 15 অশ্বশক্তি (HP) বা হর্সপাওয়ারের এই সাবমার্সিবল পাম্পটি বসানো হয়েছে । এটি চালানোর জন্য ছ'টি মাউন্টিং স্ট্রাকচারের ওপর মোট 36টি সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা 19,800 ওয়াটপি ক (WP) । এই বিপুল পরিমাণ পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহার করে দিনের বেলা নির্ঝঞ্ঝাটে সেচের কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন চাষিরা ।
সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থার সুবিধা
দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ মূলত সবুজ, নির্গমনমুক্ত এবং সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে । দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিকাজে সেচের জন্য ডিজেল চালিত পাম্পের ব্যবহার হয়ে আসছে । কিন্তু একদিকে যেমন ডিজেলে চালানোর খরচ ক্রমশ বাড়ছে, যার ফলে কৃষকদের লাভের অঙ্ক কমছে ৷ অন্যদিকে পাম্প থেকে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে । এই জোড়া সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেই সৌরশক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে ।
জলসম্পদ উন্নয়ন দফতরের এক আধিকারিক বলেন, "এই ধরনের সোলার সিস্টেম কৃষকদের ডিজেল পাম্পের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে দেবে । এটি কৃষকদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, দীর্ঘমেয়াদি এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে । তবে শুধু পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং নয়, গোটা রাজ্য জুড়েই সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থার প্রসারে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার । ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সোলার পাম্প, স্প্রিংকলার এবং ছোট টিউবওয়েল বসানোর কাজ চলছে । উদাহরণস্বরূপ, নদিয়া জেলার খিসমা-7 এলাকায় ছ'টি লাইট ডিউটি টিউবওয়েল (LDTW) বসানো হয়েছে । এছাড়া সুন্দরবনের মতো লবণাক্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ করা হয়েছে ।"
কৃষিতে জলের অপচয় রোধ করতে এবং সঠিক সময়ে জমিতে জল পৌঁছে দিয়ে কৃষকদের আয় বাড়াতে এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলি আগামিদিনে গেমচেঞ্জার হতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল ।

