ETV Bharat / state

রেস্তোরাঁয় হানা দিতেই মিলল 20 দিনের পুরনো মাছ, 3 বছরের পুরনো খেজুর !

মিষ্টির দোকানে পরিচ্ছন্নতা না-মানার অভিযোগ ৷ আসানসোলে নষ্ট করা হল বিরিয়ানি ও মাংস ৷

Raid on Restaurants
মালদার রেস্তোরাঁ জেলা প্রশাসনের অভিযান ৷ (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 29, 2026 at 4:36 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা ও আসানসোল, 29 অগস্ট: পুজোর আগে রাজ্যের একাধিক জেলায় নামি-বেনামি রেস্তোরাঁগুলিতে হানা দিল জেলা প্রশাসন ৷ তেমনই মালদা ও আসানসোলের বড় রেস্তোরাঁ ও রাস্তার ধারের ছোট হোটেলগুলিতে হানা দিলেন খাদ্য দফতরের আধিকারিকরা ৷ যে অভিযানে নামী রেস্তরাঁয় 20 দিনের পুরনো মাছ থেকে তিন বছরের পুরনো খেজুরের হদিশ মিলেছে ৷ এমনকি মিষ্টিতে কেশরের নামে ক্ষতিকর রং মেশানোর অভিযোগ উঠেছে ৷ একাধিক বিরিয়ানির দোকানে বাসী মাংস দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে ৷

মালদা

বাঙালি ভোজনরসিক ৷ এর সুযোগ নিয়ে পকেটে লক্ষ্মী ভরতে মালদা জেলাজুড়ে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট হোটেল ও রেস্তোরাঁ ৷ শুধু মালদা কেন, গোটা রাজ্যে একই ছবি ৷ সেই অনেক নামি সংস্থাও রয়েছে ৷ যার বাইরে থেকে ঝাঁ-চকচকে আবরণ ৷ জেন জি-সহ সব বয়সের মানুষকে কাছে টানতে রেস্তোরাঁগুলিতে তৈরি করা হচ্ছে মায়াবী পরিবেশ ৷ মানুষ আসছে, খাবার খাচ্ছে, বাড়ি ফিরে যাচ্ছে ৷ কিন্তু, সেই খাবার কি আদৌ স্বাস্থ্যসম্মত ? নাকি খাবারের মধ্যে মিশে রয়েছে ঘাতক বিষ ! শুধু রেস্তোরাঁ কিংবা ধাবা নয়, মিষ্টির দোকানগুলি নিয়েও রয়েছে একই প্রশ্ন ৷

রেস্তোরাঁয় হানা দিতেই মিলল 20 দিনের পুরনো মাছ, 3 বছরের পুরনো খেজুর ৷ (ইটিভি ভারত)

এগিয়ে আসছে উৎসবের মরশুম ৷ ভোজন রসিক বাঙালির ভিড় উপচে পড়বে এসব জায়গায় ৷ তার আগে প্রতিষ্ঠানগুলিতে হানাদারি চালাতে শুরু করেছে প্রশাসন ৷ উদ্দেশ্য একটাই, মানুষ যাতে পয়সা খরচ করে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পায় ৷ শুধু খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকরাই নন, মালদায় পথে নেমেছেন খোদ জেলাশাসক ৷

গত 3-4 দিন ধরে মালদা জেলার বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ধাবা-সহ নামি মিষ্টির দোকানে হানাদারি চালাচ্ছে প্রশাসন ৷ শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও চলছে অভিযান ৷ বিস্ময়কর তথ্য হল, এখনও পর্যন্ত যত প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়েছে, হাতে গোনা দু’চারটি জায়গা ছাড়া কোথাও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ ৷ কোথাও ফ্রিজে রাখা আছে তিন সপ্তাহের বাসি মাংস ও মাছ, কোথাও বিরিয়ানিতে ব্যবহার করা হচ্ছে তারিখ পেরিয়ে যাওয়া মশলা ৷ আবার কোথাও খাবারে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকারক রং ৷ আর যেখানে রান্না করা হচ্ছে, দেখলে কেউ সেখানে খাবার খেতেও ভয় পাবেন ৷

খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিকদের কাছ থেকে এহেন তথ্য পেয়ে গতকাল ময়দানে নেমে পড়েন জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর নিজেই ৷ মালদা শহরে হানা দেন দিল্লির এক নামি সংস্থার শাখায় ৷ রেস্তোরাঁর সামনের অংশ খতিয়ে দেখে ঢুকে পড়েন রান্নাঘরে ৷ ফ্রিজ খুলে দেখেন, সেখানে মজুত রয়েছে তিন বছর আগে প্যাক করা খেজুর ৷ রান্নায় ব্যবহৃত রং দেখেও অবাক হয়ে যান তিনি ৷

Raid on Restaurants
মালদায় মিষ্টিতে ক্ষতিকারক রং ব্যবহারের অভিযোগ ৷ (ইটিভি ভারত)

জেলাশাসক বলেন, "রাজ্য সরকার খাদ্য সুরক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে ৷ আমরা গত তিনদিন ধরে জেলার বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকানে অভিযান চালাচ্ছি ৷ ইতিমধ্যে 70-80টি জায়গায় অভিযান চালানো হয়েছে ৷ অনেক অভিযোগ এসেছে ৷ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এসেছি ৷ তবে, প্রতিষ্ঠানগুলির নাম বলব না ৷ অনেক জায়গায় মিষ্টিতে কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়েছে ৷ গ্রাহককে বলা হচ্ছে মিষ্টিতে কেশর রয়েছে ৷ কিন্তু, কেশর সেখানে নেই ৷"

জেলাশাসক জানান, বিরিয়ানিতে পুরনো রং, পুরনো চাল ব্যবহার করা হয়েছে ৷ একটি নামি রেস্তোরাঁয় 20 দিনের পুরনো মাছ, তিন বছরের পুরনো খেজুর পাওয়া গিয়েছে ৷ এই খাবার খেয়ে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়তেই পারে ৷ নামিদামি রেস্তোরাঁতেও এসব ঘটনা ঘটছে ৷ অনেক জায়গায় মেয়াদ উত্তীর্ণ মশলা ব্যবহার করা হচ্ছে ৷ সবজি কেটে খোলা রাখা হয়েছে ৷ তাতে পোকা, মাছি ঘুরছে ৷ এসব দেখে কেউ খাবারই খেতে পারবে না ৷

রাজনবীর আরও বলেন, "আমি যেখানে এসেছি, পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো হলেও রান্নাঘরে খোলা ড্রেন রয়েছে ৷ মাংস খোলা রাখা আছে, ব্র্যান্ডেড ঘি নেই ৷ আমরা এখানকার কর্তৃপক্ষকে বলে দিয়েছি, কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করতে হবে ৷ প্রতিটি জায়গা থেকেই খাবার ও সামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করছি ৷ যথাযথ পরীক্ষার পর প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে ৷ 2006 সালের ফুড সেফটি অ্যাক্টের 31 থেকে 59 নম্বর ধারায় এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার অনেক ব্যবস্থা রয়েছে ৷"

প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি জয়ন্ত কুণ্ডু ৷ তিনি বলেন, "মানুষ পয়সা খরচ করে খাবার খাবে ৷ অথচ সেই খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে ৷ এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না ৷ প্রশাসন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ সংগঠনের তরফে রেঁস্তরা ও মিষ্টির দোকানদারদের কাছে আমার আবেদন, খদ্দেরের কাছ থেকে পয়সা নিন, কিন্তু তাঁদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দিন ৷ লাভ দেখতে গিয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে খেলা করবেন না ৷"

আসানসোল

নামিদামি হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা বিরিয়ানির দোকান—খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে আসানসোলে অভিযানে নামল খাদ্য দফতর ৷ আর সেই অভিযানেই সামনে এল চাঞ্চল্যকর ছবি ৷ কোথাও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে খাবার, কোথাও আবার মজুত রয়েছে বাসি খাবার ও মাংস ৷ এমনকী খাদ্যে অনুপযুক্ত রং ব্যবহারের অভিযোগও মিলেছে ৷

আসানসোলের ভগৎ সিং মোড় থেকে সেন্ট্রালের দিকে যাওয়ার রাস্তায় একাধিক বিরিয়ানির দোকানে অভিযান চালান খাদ্য দফতরের আধিকারিকরা ৷ দোকানগুলির রান্নাঘর পরিদর্শন করতে গিয়ে কার্যত চক্ষু চড়কগাছ আধিকারিকদের ৷ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের পাশাপাশি, বেশ কিছু জায়গায় বাসি খাবার ও মাংসের টুকরো পাওয়া যায় ৷

অভিযানের সময় দোকানগুলিতে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ বিরিয়ানি ও মাংস বাজেয়াপ্ত করে নষ্ট করে দেওয়া হয় ৷ বেশ কয়েক হাঁড়ি বিরিয়ানি এবং প্রচুর পরিমাণে মাংস ফেলে দেওয়া হয় নর্দমায় ৷ খাদ্যে অনুপযুক্ত রং ব্যবহারের বিষয়টিও আধিকারিকদের নজরে এসেছে ৷

শুধু বিরিয়ানি দোকান নয়, মিষ্টির দোকানগুলিতেও ধরা পড়ে একই ছবি ৷ কোথাও মিষ্টির উপর ভনভন করছে মাছি, আবার খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছে ধোকলা-সহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য ৷ খাবার ঢেকে রাখা বা যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয় দোকান মালিকদের ৷ অভিযানে আরও দেখা যায়, একাধিক হোটেলের রান্নাঘর অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ৷ কোথাও রান্নাঘরের দরজা খোলা, ফলে বাইরে থেকে ধুলো ঢুকছে ৷ পাশাপাশি, মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের অবাধ যাতায়াতও নজরে আসে ৷

খাদ্য দফতরের আধিকারিকরা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অবিলম্বে সমস্ত অনিয়ম বন্ধ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন ৷ ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে জরিমানা করার পাশাপাশি গুরুতর ক্ষেত্রে দোকান বন্ধ করে দেওয়া এবং ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ৷