ETV Bharat / state

নাড়ির টানের চেয়েও কি ধর্ম বড় ? 25 বছর পর মাকে পেয়ে ঘরে ফেরাল না ছেলে

দীর্ঘ আড়াই দশক পর মায়ের খোঁজ পেল ছেলে ৷ কিন্তু মহামিলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল 'ধর্ম' ৷ কাছে পেয়েও মাকে ঘরে ফেরাল না ছেলে ৷

man refuses to take mother
প্রতীকী ছবি (RKC)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 24, 2026 at 1:07 PM IST

3 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 24 ফেব্রুয়ারি: সন্তানের মুখ দেখার জন্য 25 বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। বুকভরা আশা ছিল, জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় হয়তো নিজের ভিটেয়, নিজের আপনজনদের কাছে ফেরা হবে। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস ! দীর্ঘ আড়াই দশক পর নিখোঁজ মায়ের খোঁজ পেল ছেলে, কিন্তু সেই মহামিলনের পথে পাষাণ প্রাচীর হয়ে দাঁড়াল 'ধর্ম' ৷ কলকাতার এক হোমে আশ্রিত ঝাড়খণ্ডের এক বৃদ্ধা মায়ের এই করুণ পরিণতি আজ যেন মানবিকতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ৷

বৃদ্ধার বয়স প্রায় 62 ৷ ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা জেলার দাহুপাগর গ্রামে একসময় তাঁর ভরা সংসার ছিল। বিয়ের আগেই তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ৷ এই ধর্ম পরিবর্তন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাঁদের দাম্পত্য জীবনে ৷ পরে সন্তানের জন্ম দেন তিনি ৷ কিন্তু তাঁর হিন্দু স্বামীর মৃত্যুর পরই তাঁর জীবনে ঘনায় ঘোর অন্ধকার ৷ গ্রামের প্রতিবেশীরা একজন খ্রিস্টান মহিলাকে কিছুতেই মেনে নিতে চায়নি, চরম অমানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাঁকে ভিটেছাড়া করে তারা। এরপর ঠিক কীভাবে তিনি কলকাতায় এসে পৌঁছন, সেই স্মৃতি আজ তাঁর মন থেকে অনেকটাই মুছে গিয়েছে ৷

25 বছর পর মাকে পেয়ে ঘরে ফেরাল না ছেলে (ইটিভি ভারত)

2001 সালে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির এক সদস্য তাঁকে উদ্ধার করে একটি হোমে নিয়ে যান ৷ সেই থেকে ওই হোমই হয়ে ওঠে তাঁর আপন ঠিকানা, আর হোমের আবাসিকরাই তাঁর পরিবার। এই একাকিত্বের জীবনে হঠাৎই আশার আলো হয়ে আসে হ্যাম রেডিও ৷ হোমের এক কর্মীর কাছ থেকে খবর পেয়ে বৃদ্ধাকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন হ্যাম রেডিয়ো ওয়েস্টবেঙ্গল ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস এবং তাঁর দল। বহু চেষ্টার পর তাঁরা খোঁজ পান দাহুপাগর গ্রামে বৃদ্ধার সেই পুরনো বাড়ির, যেখানে আজও থাকেন তাঁর ছেলে।

দীর্ঘ 25 বছর পর ভিডিয়ো কলে মুখোমুখি হন মা ও ছেলে। হয়তো মনে হয়েছিল এই বুঝি অপেক্ষার অবসান হল ! কিন্তু চরম আঘাতটা আসে নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানের তরফ থেকেই। মাকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বাড়িতে ফিরতে হলে তাঁকে খ্রিস্টান ধর্ম ছেড়ে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে হবে ৷ এই শর্ত শুনে একবুক অভিমান আর বুকফাটা কষ্ট নিয়ে বৃদ্ধা মা নিজের আত্মসম্মানে অবিচল থাকেন ৷ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি জানিয়ে দেন, "ছেলে আমাকে বলেছে ধর্ম না-বদলালে সে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু আমি আমার ধর্ম ছাড়ব না। এটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা ৷"

বছরের পর বছর ধরে বহু মানুষকে চরম বিরূপ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন অম্বরীশ ৷ কিন্তু এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। রক্ত-মাংসের সম্পর্কের মাঝে, মা ও ছেলের অকৃত্রিম ভালোবাসার মাঝে ধর্ম যে এভাবে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে, তা ভেবে তিনি নিজেও আজ চরম মর্মাহত। তবে এত কিছুর পরেও তিনি হাল ছাড়তে রাজি নন। তাঁর বুকভরা বিশ্বাস, এই বিভেদের প্রাচীর একদিন ঠিক ভাঙবে এবং এই বৃদ্ধা মা সমস্ত সামাজিক বাধা জয় করে তাঁর নিজের পরিবারের কাছেই ফিরে যাবেন।

এই প্রসঙ্গে অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলেন, "আমরা হ্যাম রেডিয়ো কর্মীরা হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াকেই মানবিক দায়িত্ব বলে মনে করি। প্রযুক্তি আমাদের মাধ্যম, কিন্তু লক্ষ্য একটাই, মানুষকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া । এই বৃদ্ধার ক্ষেত্রেও আমরা সেই কাজটাই করেছি । কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না । এই ঘটনায় আমরা ব্যথিত । কারণ, একজন মা 22 বছর পর ছেলের মুখ দেখলেন, কিন্তু ঘরে ফিরতে পারলেন না ৷ এটা হৃদয়বিদারক। ধর্ম, জাতি বা পরিচয়, এগুলি ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু মানবিকতার ঊর্ধ্বে কিছুই হতে পারে না।"