ETV Bharat / state

ছেলের ভোটার কার্ড থাকলেও বাবার নেই, SIR নিয়ে চরম সমস্যায় 71-এ বঙ্গে আসা বাংলাদেশিরা

মালদা বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বুথের নম্বর 204 ৷ তিন গ্রামের সিংহভাগ বাসিন্দাই কোনও না-কোনও সময় বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে ঘরবাড়ি বানিয়েছেন ৷

Bangladeshi refugees
ভোটার কার্ড না থাকায় সমস্যায় বাংলাদেশি উদ্বাস্তুরা (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 11, 2025 at 9:36 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 11 নভেম্বর: ছেলের ভোটার কার্ড থাকলেও একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা বাবার তা নেই ৷ এসআইআর নিয়ে এমনই চরম সমস্যায় পড়েছেন বেশ কিছু মালদা জেলার মানুষ ৷ মেনে নিলেন দায়িত্বে থাকা বিএলও ৷

1971 সাল ৷ মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ভারতে চলে আসেন ৷ নির্মল বিশ্বাসও তাঁদের মধ্যে একজন ৷ ওপারে থাকা সবকিছু ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে এপারে চলে এসেছিলেন তিনি ৷ এপারেই সংসার পেতেছিলেন ৷ ছেলেমেয়ের জন্মও এপারে ৷ আশি বছর পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ নির্মলের দাবি, ভারতীয় আধার কার্ড, রেশন কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাংকের পাশবই থাকলেও ভোটার কার্ড নেই তাঁর ৷ অনেক চেষ্টা করেও তিনি ভোটার তালিকায় নিজের নাম তুলতে পারেননি ৷ অথচ তাঁর ছেলের নাম সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছে ৷

ছেলের ভোটার কার্ড থাকলেও বাবার নেই, SIR নিয়ে চরম সমস্যায় 71-এ বঙ্গে আসা বাংলাদেশিরা (ইটিভি ভারত)

এখন এসআইআর নিয়ে চরম সমস্যায় পড়েছেন এই বৃদ্ধ ৷ সঙ্গে রয়েছে দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্ক ৷ তবে শুধু তিনিই নন, তাঁর গ্রামের আরও অনেকের নামই ভোটার তালিকায় নেই ৷ এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়, ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা ৷ বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত বিএলও নিজেও ৷ তবে এক্ষেত্রে তাঁর কিছু করার নেই বলে জানিয়েছেন তিনি ৷ পুরাতন মালদা ব্লকের মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের এই ঘটনায় শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক তরজা ৷ যদিও যুযুধান দুই পক্ষ, তৃণমূল আর বিজেপি দাবি করেছে, কারও কোনও চিন্তা নেই ৷ এঁদের কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না ৷

ঘটনাটি মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাঙা খানপুর গ্রামের ৷ এই গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়েছে ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ৷ ডাঙা খানপুর, ডোবা খানপুর আর মোহনবাগান গ্রাম মিলিয়ে একটি বুথ ৷ মালদা বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বুথের নম্বর 204 ৷ তিন গ্রামের সিংহভাগ বাসিন্দাই কোনও না-কোনও সময় বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে ঘরবাড়ি বানিয়েছেন ৷

নির্মলের ছেলে প্রদীপ বিশ্বাসের জন্ম ভারতে ৷ তাঁর ভোটার কার্ড রয়েছে ৷ ছেলের কার্ড হলে তাঁর কেন হবে না? প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি ৷ তিনি বলছেন, "ভোটার কার্ড পাওয়ার জন্য অন্তত 20 বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত করেছি ৷ কিন্তু কাজ হয়নি ৷ এক পার্টি নাম তুললেও আরেক পার্টি কেটে দেয় ৷ ওপারে পাবনা জেলার সূর্যনগর থানা এলাকার বাধাই গ্রামে থাকতাম ৷ একাত্তরে ওদেশে গন্ডগোল হওয়ার পর এখানে চলে আসি ৷ পরে অবশ্য ফিরে গিয়ে তিন বছর বাংলাদেশের বাড়িতে থাকতে হয়েছিল ৷ তারপর থেকে পাকাপাকিভাবে এসে এখানে থাকি ৷"

Bangladeshi refugees
মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের বাসিন্দা (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও বলেন, "এখানে জমিজায়গা কিনে চাষ শুরু করি ৷ বাড়িও করেছি ৷ এখনও ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি আমার ৷ ভোটার কার্ড না থাকায় এমনি কোনও সমস্যা নেই ৷ শুধু এদেশের বাসিন্দা হিসাবে এই প্রমাণপত্র আমার নেই ৷ আধার, প্যান কার্ড, ব্যাংকের পাশবই, বাড়ির দলিল, চৌকিদারি করের রিসিপ্ট-সহ আরও অনেক কাগজ আমার আছে ৷ শুধু ভোটার কার্ডটাই নেই ৷"

ওপার বাংলা থেকে আসা মানুষদের গ্রাম ৷ অনেকের নামই 2002 সালের ভোটার তালিকায় নেই ৷ এসআইআর নিয়ে আতঙ্কিত তাঁরাও ৷ তাঁদের একজন হারাধন বিশ্বাসের কথায়, "এসআইআর নিয়ে আমরা সত্যিই চিন্তায় ৷ আমি ছোট থেকে এখানেই মানুষ হয়েছি ৷ এদেশের প্রাথমিক ও হাইস্কুলে পড়েছি ৷ 2005 সালে আমার নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে ৷ 2025 সালের তালিকাতেও আমার নাম আছে ৷ কিন্তু এসআইআর করতে গিয়ে তালিকা থেকে আমার নাম কাটা পড়বে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় আছি ৷"

তাঁর কথায়, "আমি চাই যাতে আমার নাগরিকত্বটা থাকে ৷ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম যেন কাটা না পড়ে ৷ এখানে প্রায় 95 শতাংশ মানুষই বাংলাদেশ থেকে আসা ৷ অনেকেরই এমন সমস্যা রয়েছে ৷ খুব ছোটতে এদেশে এসেছি ৷ ওপারে কোথায় থাকতাম খুব একটা মনে নেই ৷ তবে বাবার মুখে শুনেছি, আমরা পাবনা জেলার সূর্যনগর থানার বাধাই গ্রামে থাকতাম ৷"

ওই বুথের বিএলও বিপ্লব বিশ্বাসের বক্তব্য, "এখানে তিনটি গ্রাম মিলিয়ে একটি বুথ ৷ এটি প্রত্যন্ত এলাকা ৷ বুথটি একেবারে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ৷ এখানে অনেক মানুষ ওপার থেকে এসেছেন ৷ কিছু মানুষ তো অনেক আগে এদেশে এসেছেন ৷ এঁদের মধ্যে কিছু মানুষের নাম ভোটার তালিকায় নেই ৷ এই বুথে কিছু ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে ৷ আবার কিছু কমেছেও ৷ আমি আগেই 71 শতাংশ ম্যাপিং করে দিয়েছি ৷ কিন্তু যাঁদের বয়স 41 বছরের নীচে, তখন তাঁদের ম্যাপিং করা হয়নি ৷ এবার তাঁদের ম্যাপিং হয়ে যাবে ৷ আমার প্রায় 85 শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে ৷"

তিনি আরও বলেন, "2002 সালে এই বুথের নম্বর ছিল 178 ৷ তখন এক হাজারের কাছাকাছি ভোটার ছিলেন ৷ তখন আরও একটি গ্রাম এই বুথের অধীনে ছিল ৷ এখন লক্ষ্মীপুর গ্রামটি আলাদা হয়ে গিয়েছে ৷ এখন এই বুথের ভোটার সংখ্যা 1180 ৷ আগের থেকে 4-5 শতাংশ ভোটার বেড়েছে ৷ এখানে 7-8 জনের নাম ভোটার তালিকায় নেই ৷ 2002 সালে তো বটেই, 2025 সালের তালিকাতেও এঁদের নাম নেই ৷ এমনও বাড়ি রয়েছে যেখানে ছেলের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে, বাবার নাম নেই ৷ তাঁরা এখন হীনমন্যতায় ভুগছেন ৷ কী হবে, তা নিয়ে চিন্তা করছেন ৷ আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি ৷ ফর্ম দিচ্ছি, সেই ফর্ম জমাও নেব ৷ ওঁদের কী হবে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই সেটা বলতে পারবে ৷"

এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক তরজা ৷ পুরাতন মালদার বাসিন্দা তথা তৃণমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, "মুচিয়া অঞ্চল মালদা বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৷ সেখানে অনেক মানুষ 1971 সালে বাংলাদেশ থেকে মালদায় এসেছিলেন ৷ পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক জায়গায় তাঁরা এসেছেন ৷ বিশেষ করে মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় সবাই বাংলাদেশি উদ্বাস্তু ৷ সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার এঁদের উদ্বাস্তু শংসাপত্রও দিয়েছিল ৷ হয়তো তাঁদের অনেকে ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তুলতে পারেননি অথবা শিক্ষার অভাবে নাম তোলেননি ৷"

তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে বিজেপি সিএএ'র নাম করে মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে ৷ এতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে ৷ মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন, যাঁরা এদেশীয়, যাঁরা চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনও কাজ করছেন, যাঁরা জায়গা কিনেছেন, বাড়ি তৈরি করেছেন, তাঁদের কোনও সমস্যা হলে সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে ৷ কোনও বৈধ ভোটারের নাম কাটা গেলে তা নিয়ে তীব্র আন্দোলন করা হবে ৷ এমনকি আমাদের দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেকথা জানিয়ে দিয়েছেন ৷ তাই কারও আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই ৷ সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে ৷"

এনিয়ে মালদার বিজেপি বিধায়ক গোপালচন্দ্র সাহা বলেন, "এসআইআর নিয়ে তৃণমূলের নেতারা আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন ৷ সারা বাংলার মতো পুরাতন মালদাতেও তাঁরা সেই কাজ করছেন ৷ তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন, মিটিং মিছিল করছেন ৷ বলা হচ্ছে, এসআইআরের মাধ্যমে ভোটারদের নাম বাদ যাবে ৷ এটা পুরো মিথ্যে কথা ৷ তাঁরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন ৷ মুচিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলি থেকে শুরু করে শহর এলাকাতেও সেই মিথ্যে প্রচার করা হচ্ছে ৷"

তাঁর দাবি, "বাংলাদেশ থেকে আসা বহু মানুষ ধর্মের কারণে বিতাড়িত হয়ে ভারতে এদেশে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন ৷ কোনও হিন্দুর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না ৷ তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট চালু করেছে ৷ এই আইনে পরিষ্কার বলা আছে, যাঁরা ওপার বাংলা থেকে ধর্মের কারণে বিতাড়িত হয়ে বাংলায় এসেছেন, তাঁরা এদেশের নাগরিকত্ব পাবেন ৷ এতে কোনও সন্দেহ নেই ৷ বিজেপি তাঁদের পাশে আছে ৷ সিএএতে রেজিস্ট্রেশন করে তাঁরা যাতে ভোটার কার্ড হাতে পান তার ব্যবস্থা বিজেপি করবে ৷ আমরা বিভিন্ন জায়গায় দ্রুত সিএএ সহায়তা কেন্দ্র চালু করছি ৷"