পুলিশ তুমি উর্দি ছাড়ো ! স্লোগান একই, পালা বদলের বাংলায় 'বদল' শুধু দলের নামে
তৃণমূল থেকে বিজেপি জমানা...ক্ষমতা বদলেছে । সরকার বদলেছে । কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের চরিত্র কি আদৌ বদলেছে ? সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রতিবেদন ৷

Published : May 30, 2026 at 9:28 PM IST
দুর্গাপুর, 30 মে: মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বদলে গিয়েছে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ । কিন্তু বদলায়নি একটি বহুচর্চিত স্লোগান । শুধু বদলেছে বক্তার মুখ আর দলের পরিচয় ।
4 মে'র আগে রাজ্যের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মিছিল-অবরোধে প্রায়শই শোনা যেত, "পুলিশ তুমি উর্দি ছাড়ো, তৃণমূলের ঝান্ডা ধরো ।" আর ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের পর এখন সেই একই স্লোগান ঘুরে ফিরে আসছে অন্য শিবিরের মুখে, "পুলিশ তুমি উর্দি ছাড়ো, বিজেপির ঝান্ডা ধরো ।"
একই পুলিশ, একই উর্দি । অথচ অভিযোগের রং বদলে গিয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে । ফলে প্রশ্ন উঠছে, পুলিশের অবস্থান ঠিক কোথায় ? তারা কি সত্যিই রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থেই বারবার কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে আইনরক্ষকদের ?
ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই দুর্নীতি, আর্থিক তছরুপ ও রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগে একের পর এক তৃণমূল নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে । গ্রেফতারও হয়েছেন অনেকে । আর সেই প্রেক্ষাপটেই পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছে শাসন হারানো ঘাসফুল শিবিরের একাংশ । এই পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছেন প্রাক্তন পুলিশকর্তারাও ।
প্রাক্তন আইপিএস অফিসার নজরুল ইসলামের বক্তব্য, "পুলিশের কাজ আইন মেনে কাজ করা । রাজনৈতিক দল কে কী বলল, তা নিয়ে পুলিশের মাথা ঘামালে চলবে না । মাথা উঁচু করে দায়িত্ব পালন করতে হবে । স্লোগান দিয়ে কাউকে ছোট করা যায়, কিন্তু আইনের পথ থেকে সরানো যায় না ।"

আরও কড়া সুরে মন্তব্য করেছেন প্রাক্তন পুলিশকর্তা তথাগত পাণ্ডে । তাঁর দাবি, বাংলার পুলিশ প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব নতুন নয় । বাম আমলের শেষ পর্ব থেকেই সেই সংস্কৃতি শিকড় গেড়েছিল । পরে তৃণমূল আমলেও তার পরিবর্তন হয়নি । তাঁর কথায়, "যোগ্যতা নয়, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাই অনেক ক্ষেত্রে পোস্টিংয়ের মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল । থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ সর্বত্রই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল । ফলে পুলিশের মধ্যেও এক ধরনের সিন্ডিকেট সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল ।"
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের সক্রিয়তাকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন তিনি । তাঁর মতে, "রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে । রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, পেশাগত দক্ষতাই হওয়া উচিত একমাত্র মাপকাঠি ।"
বাংলার রাজনীতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয় । কখনও 'পুলিশ তোমার মাইনে কত', আবার আরজি কর-কাণ্ডের পর বিতর্কিত ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক স্লোগান, বারবার জনরোষের মুখে পড়েছে বাহিনী ।

কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের এই মুহূর্তে প্রশ্ন আরও জোরালো । এতদিন যাঁরা পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, আজ তাঁরাই পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনছেন । আবার যাঁরা একসময় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করতেন, তাঁরাই এখন আইনশৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগকে স্বাগত জানাচ্ছেন ।
তাহলে কি সত্যিই বাংলায় 'দলের শাসন' থেকে 'আইনের শাসন' এর পথে যাত্রা শুরু হয়েছে ? নাকি অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পুলিশ কেবলই রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার মাপকাঠিতে বিচারিত হচ্ছে ?
উত্তর এখনই মেলেনি । তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ক্ষমতা বদলালেও পুলিশের প্রতি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি । আর তাই বাংলার রাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা বোধহয় এখনও পুলিশের সামনেই, তারা কি কেবল আইনের রক্ষক, নাকি রাজনৈতিক লড়াইয়ের চিরন্তন লক্ষ্যবস্তু ? সময়ই তার উত্তর দেবে ।

