ETV Bharat / state

এসআইআর-এর সময়সীমা বৃদ্ধি আসলে তৃণমূলের 'নৈতিক জয়', দাবি শাসকদলের

এসআইআর-এর সময়সীমা বৃদ্ধি আসলে কমিশনের 'ভুল স্বীকার' ৷ একে তৃণমূলের 'নৈতিক জয়' বলে দাবি করে বিজেপি ও কমিশনকে একযোগে তোপ শাসকদলের ৷

TMC ON ECI DECISION
এসআইআর-এর সময়সীমা বৃদ্ধি আসলে কমিশনের 'ভুল স্বীকার' (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 30, 2025 at 8:56 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 30 নভেম্বর: রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধনী বা 'স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন' (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সময়সীমা বৃদ্ধিকে নিজেদের 'নৈতিক জয়' হিসেবেই দেখছে তৃণমূল কংগ্রেস। রবিবার তৃণমূল ভবনে এক সাংবাদিক বৈঠক করেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং সাংসদ পার্থ ভৌমিক ৷ তাঁরা কমিশনের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তীব্র আক্রমণ শানালেন জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে।

তাঁদের দাবি, কমিশন যে সময়সীমা আগে নির্ধারণ করেছিল, তা যে অবাস্তব এবং অপরিকল্পিত ছিল, সময়সীমা এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়ে কমিশন কার্যত সেটাই স্বীকার করে নিল। যদিও তৃণমূলের মতে, এই এক সপ্তাহ সময় বৃদ্ধিও যথেষ্ট নয়, একটি সুষ্ঠু ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল।

আজ সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্ট জানান, তাঁরা এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধী নন, কিন্তু যে হঠকারী পদ্ধতিতে এবং অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে, তাঁরা তার বিরোধী। মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, "আগে যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় দু'বছর সময় লাগত, তা মাত্র দু'মাসের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, গত 4 নভেম্বর থেকে 4 ডিসেম্বরের মধ্যে এনুমারেশনের কাজ শেষ করা বা 9 ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশ করার সময়সীমা বাস্তবসম্মত নয়।

অবশেষে, কমিশন সেই সময়সীমা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এনুমারেশনের শেষ তারিখ আগামী 11 ডিসেম্বর, খসড়া তালিকা প্রকাশ 16 ডিসেম্বর এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের তারিখ আগামী বছর 14 ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের মতে, এর মাধ্যমে কমিশন প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিল যে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি সঠিক ছিল এবং তাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।

তবে শুধুমাত্র সময়সীমা বৃদ্ধিই নয়, এদিনের সাংবাদিক বৈঠকে উঠে এসেছে আরও একাধিক গুরুতর অভিযোগ। এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজ্যে প্রায় 40 জন মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের তীব্র সমালোচনা করেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও পার্থ ভৌমিক। তাঁদের প্রশ্ন, "এই 40টি প্রাণ, যার মধ্যে বিএলও থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ রয়েছেন, তাঁদের মৃত্যুর দায় কে নেবে? কমিশনের হাতে কি রক্তের দাগ লেগে নেই ?" রাজ্যের শাসকদলের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। কখনও বাংলাদেশ, কখনও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের জুজু দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। এর ফলেই অনেকে আতঙ্কে প্রাণ হারাচ্ছেন বলে দাবি তৃণমূলের।

বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে আঁতাতের অভিযোগ তুলে সুর চড়ান পার্থ ভৌমিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "বিরোধী দলনেতা বা বিজেপি নেতারা কি আগে থেকেই জেনে গিয়েছেন যে, 1 কোটি বা 35 লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে? নির্বাচন কমিশন একটি স্বয়ংশাসিত সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও তাদের তথ্য কী করে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে ?" তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, বিজেপি নেতারা বিধানসভা ভিত্তিক তালিকা কমিশনের কাছে জমা দিচ্ছেন এবং সেই মতো কাজও হচ্ছে।

জ্ঞানেশ কুমারের মতো নির্বাচন কমিশনারদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পার্থ ভৌমিক। পার্থ ভৌমিকের কথায়, "প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতির বদলে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত ব্যক্তিকে কমিশনে জায়গা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা হয়েছে।

তৃণমূলের আরও প্রশ্ন, যদি সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ার কারণে বাংলায় এসআইআর হয়, তবে অসম, ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্বের অন্য রাজ্যগুলিতে কেন এই প্রক্রিয়া হচ্ছে না? শুধুমাত্র বাংলাকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে ? এর পিছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখছে ঘাসফুল শিবির। মতুয়া, রাজবংশী এবং নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা। তৃণমূল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা চায় না কোনও বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাক। যদি কোনও মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ যায়, তাতে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু বৈধ নাগরিকদের হয়রানি বরদাস্ত করা হবে না।

এদিনের বৈঠকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি পার্থ ভৌমিক। সুকান্ত মজুমদার, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন। তার পাল্টা হিসেবে পার্থ ভৌমিক বলেন, "দিল্লিতে উনি হাফ প্যান্ট মন্ত্রী হয়েই থাকবেন, বিজেপি বাঙালি কাউকে পূর্ণ মন্ত্রী করে না।" পাশাপাশি, রাজ্যের বকেয়া টাকা না দেওয়া এবং 100 দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা নিয়েও কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন তিনি। সব মিলিয়ে, এসআইআর-এর সময়সীমা বৃদ্ধিকে হাতিয়ার করে তৃণমূল কংগ্রেস যে 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ময়দান আরও উত্তপ্ত করতে চলেছে, তা এদিনের সাংবাদিক বৈঠক থেকেই স্পষ্ট।

তৃণমূলের বার্তা, যতই কেন্দ্রীয় এজেন্সি বা কমিশনকে ব্যবহার করা হোক, তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং কোনও বৈধ ভোটারের অধিকার হরণ হতে দেবে না।