গবেষণায় মিলল সাফল্য, শিশুদের লিম্ফের চিকিৎসায় নজির শিলিগুড়িতে
প্রথমে 50টি শিশুর উপর পরীক্ষামূলকভাবে চিকিৎসা শুরু হয় । টানা তিনমাস ধরে চলে সেই পরীক্ষা । ইটিভি ভারতের শুভদীপ রায় নন্দীর প্রতিবেদন ৷

Published : August 31, 2026 at 8:03 PM IST
দার্জিলিং, 31 অগস্ট: শিশুদের লিম্ফ চিকিৎসায় দিশা দেখাচ্ছে শিলিগুড়ির রিজিওনাল ইন্সটিটিউট ফর হোমিওপ্যাথি । টানা গবেষণায় মিলেছে সাফল্য । বর্তমানে আরআরএইচ শিশুদের লিম্ফের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় গোটা রাজ্যে নজির স্থাপন করেছে ।
এই চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে এসেছে শিলিগুড়ির রিজিওনাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট ফর হোমিওপ্যাথি । শিলিগুড়ি সংলগ্ন মাটিগাড়ার বড় পথুতে অবস্থিত কেন্দ্র সরকারের আয়ুষ মন্ত্রকের অধীনে থাকা ওই প্রতিষ্ঠানে এই লিম্ফ চিকিৎসার সূচনা হয় ।
চিকিৎসার আগে গবেষণা
প্রথমে 50টি শিশুর উপর পরীক্ষামূলকভাবে চিকিৎসা শুরু হয় । আর টানা তিনমাস ধরে চলে সেই পরীক্ষা । বিনামূল্যে চিকিৎসার পাশাপাশি ওই শিশুদের সমস্ত পরীক্ষাও বিনামূল্যে করা হয়েছিল । জানা গিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে দশটি শিশু চিকিৎসা করাতে এলে তাদের মধ্যে অন্তত দু'জনের সেই লিম্ফ মিলত । যে কারণে কেন্দ্র সরকারের অনুমোদনে লিম্ফের উপর গবেষণা শুরু করা হয় । সেই সূত্র ধরেই আরআরএইচের চিকিৎসকরা গবেষণা চালিয়ে তাতে সফল হন । বর্তমানে এই সাফল্য মেলায় এবার আনুষ্ঠানিকভাবে অল্প খরচে লিম্ফের হোমিওপ্যাথিতে চিকিৎসা শুরু করেছে আরআরএইচ ।

লিম্ফ আসলে কী ?
শিশুদের শরীরে অনেক সময় ঘাড়, কান বা চোয়ালের পেছনে ছোট মার্বেলের মতো বা গুটলির মতো ফোলা অংশ দেখা যায় । সাধারণ কথায় একে লিম্ফ হওয়া বলা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি মূলত লিম্ফ নোডের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা ফোলা ভাব, যাকে 'লিম্ফ্যাডেনোপ্যাথি' বলা হয় । মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত জরুরি অংশ হল এই লিম্ফ বা লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম । শিশুদের শরীরে যখন কোনও বহিরাগত জীবাণু প্রবেশ করে, তখন এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং এর ফলেই নোডগুলো ফুলে বা বড় হয়ে নজর কাড়ে । অনেক সময় অনেক বাবা-মায়েরা ভুলবশত টিউমার ভেবে ফেলেন । ফলে তাঁদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয় ।
এটা কখন হয় ?
শিশুদের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার প্রধান কারণ হল যে কোনও ধরনের সাধারণ সংক্রমণ । ছোটদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জীবাণুর সংস্পর্শে এসে বিকশিত হতে থাকে । যখন কোনও শিশু ঠান্ডা লাগা, সর্দি-কাশি, ফ্লু, গলার সংক্রমণ, কানের ইনফেকশন কিংবা টনসিলের সমস্যায় ভোগে, তখন নিকটস্থ লিম্ফ নোডগুলোতে দ্রুত শ্বেত রক্তকণিকা জমা হতে শুরু করে । ফলে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে সেই নির্দিষ্ট স্থানের লিম্ফ নোডটি সাময়িকভাবে আকারে বড় হয়ে যায় । এর পাশাপাশি ত্বকের যে কোনও ক্ষত, পোকার কামড়, দাঁতের ইনফেকশন কিংবা কদাচিৎ টিবি বা দীর্ঘমেয়াদি কোনও শারীরিক জটিলতার কারণেও এটি ঘটতে পারে ।

শরীরের বিশেষ কিছু স্থানে লিম্ফ নোডগুলো ত্বকের ঠিক নিচে অবস্থান করায় সেগুলো সহজে চোখে পড়ে বা হাত দিলে অনুভূত হয় । সবচেয়ে বেশি লিম্ফ নোড বা ফোলা ভাব দেখা যায় ঘাড়, গলা ও চোয়ালের নিচে, যা সাধারণত শ্লেষ্মা বা গলার সংক্রমণের কারণে ঘটে । এছাড়া মাথার পেছনে ও কানের পেছনে, বগলে এবং কুঁচকিতে লিম্ফ নোডের উপস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে । হাত কিংবা পায়ের কোনও অংশে আঘাত বা ইনফেকশন হলেও কানের পেছনে বা কুঁচকির নোডগুলো ফুলে উঠতে পারে ।
লিম্ফ নোড ফুললে কী করবেন ?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর লিম্ফ নোড ফোলা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই । মূল সংক্রমণ কেটে গেলে কয়েক সপ্তাহ থেকে এক-দেড় মাসের মধ্যে এটি নিজে থেকেই স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসে । এই সময়ে ফোলা জায়গায় বারবার চাপাচাপি না-করা ভালো । সংক্রমণের উপশমে চিকিৎসকের নির্দেশমতো ওষুধ খাওয়ানোই যথেষ্ট ।

কখন চিন্তার ?
তবে যদি লিম্ফ নোডটি খুব দ্রুত আকারে বড় হতে থাকে, স্পর্শ করলে পাথরের মতো শক্ত মনে হয়, স্থানটি লাল হয়ে পুঁজ জমে যায়, কিংবা দুই বা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একইভাবে থেকে যায়, তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক । পাশাপাশি যদি ফোলা ভাবটির সঙ্গে শিশুর উচ্চ তাপমাত্রা বা অনবরত জ্বর থাকে, ওজন কমে যেতে থাকে কিংবা শিশু অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করে, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো উচিত ।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
এই বিষয়ে আরআরএইচের অধিকর্তা রঞ্জিত সোনি বলেন, "লিম্ফ নিয়ে অনেক অভিভাবকের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে । মূলত শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এই লিম্ফ তৈরি হয় । তাতে শিশুদের সেই জায়গা ব্যাথাও হয়ে থাকে । বহির্বিভাগে যখন একের পর এক শিশু এই লিম্ফের সংক্রমণ নিয়ে আসতে শুরু করে, তখন আমরা লিম্ফের গবেষণার সিদ্ধান্ত নিই । কেন্দ্র সরকারের নির্দেশে বছরের শুরুতে পাকাপাকিভাবে গবেষণা শুরু হয় । প্রাথমিকভাবে প্রথমে 50 জন শিশুকে নিয়ে গবেষণা শুরু হয় । প্রত্যেকের ক্ষেত্রে গবেষণায় সাফল্য মেলে । তারপরই পাকাপাকিভাবে আমরা এর চিকিৎসা শুরু করেছি ।"

চিকিৎসক সুমি রানি লোধ বলেন, "মূলত এই লিম্ফ শিশুদের চোয়ালের গোড়ায়, টনসিলের জায়গায় হয়ে থাকে । প্রথমে আমরা বেস লাইন ইনভেস্টিগেশন করি । সেইমতো আমরা গবেষণার মাধ্যমে হোমিওপ্যাথির ওষুধ তৈরি করি, যা ভালো কাজ করেছে লিম্ফের চিকিৎসায় ।"

