ETV Bharat / state

আদালতে যাওয়ার পথে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়ি, খুনের ষড়যন্ত্র ?

ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে শাহজাহান-মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথের ছোট ছেলে ও গাড়িচালকের প্রাণ যায় । আহত অবস্থায় কলকাতার হাসপাতালে ভর্তি ভোলানাথ ৷

ETV BHARAT
ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়ি (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 10, 2025 at 5:22 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

বসিরহাট, 10 ডিসেম্বর: আদালতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে শেখ শাহজাহান-মামলার অন‍্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষের গাড়ি । ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ এবং গাড়ির চালক শাহানুর আলম । তবে, দুর্ঘটনায় আহত হলেও বরাত জোরে প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন সিবিআইয়ের মামলায় অন‍্যতম এই সাক্ষী । তবে, এটা নিছকই দুর্ঘটনা ? নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । আহত ভোলানাথের পরিবারের অভিযোগ, এর নেপথ্যে জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের হাত রয়েছে । তিনি জেলে বসেই সমস্ত কলকাঠি নাড়ছেন । তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী হওয়ার কারণেই ভোলানাথকে খুনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে মনে করছে ভোলানাথের পরিবার ।

বুধবার ঘটনাটি ঘটেছে ন‍্যাজাটের বাসন্তী হাইওয়ের বয়ারমারি পেট্রোল পাম্পের সামনে । জানা গিয়েছে, চারচাকা ওই গাড়িটির পিছনের সিটে বসে ছিলেন ভোলানাথ । সামনের সিটে গাড়িচালকের পাশে বসে ছিলেন ভোলানাথের ছোট ছেলে । গাড়ির পিছনের সিটে থাকাতেই দুর্ঘটনায় প্রাণে রক্ষা পান শাহজাহানের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের দায়ের করা মামলার অন‍্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষ । তবে, দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ছিল যে চারচাকা গাড়িটির সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায় । এমনকি, দুর্ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুটি গাড়িই পাশের নয়ানজুলিতে গিয়ে পড়ে ।

দুর্ঘটনার কবলে শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়ি (নিজস্ব ভিডিয়ো)

বিজেপি নেত্রী রেখা পাত্র-ও এই ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন । ঘটনার পর সিবিআইয়ের খাতায় পলাতক অভিযুক্ত ট্রাকচালক আবদুল হালিম মোল্লা পালিয়ে যায় ঘটনাস্থল থেকে । অভিযোগ উঠেছে, সেই সময় তাঁকে বাইকে করে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে সাহায্য করেন কয়েকজন ।যেহেতু আশপাশে কোনও সিসিটিভি ক‍্যামেরা নেই, তাই দুর্ঘটনাস্থলের ফুটেজ পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পুলিশকে । তা সত্ত্বেও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এ নিয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন বসিরহাট জেলা পুলিশের কর্তারা ।

ETV BHARAT
দুটি গাড়িই পাশের নয়ানজুলিতে গিয়ে পড়ে (নিজস্ব চিত্র)

এই বিষয়ে বসিরহাট জেলা পুলিশের পদস্থ এক কর্তা বলেন, "পারিপার্শ্বিক সমস্ত তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে । এর পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র আছে কি না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে । দুর্ঘটনাগ্রস্ত দুটি গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা হবে । দুটি গাড়িকেই নয়ানজুলি থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে ।"

জানা গিয়েছে, বুধবার বসিরহাট আদালতে শেখ শাহজাহানের একটি মামলা ছিল । সেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন এই ভোলানাথ ঘোষ । এদিন সকালে সরবেড়িয়া থেকে চারচাকা গাড়িতে করে আদালতে যাচ্ছিলেন সেই মামলারই সাক্ষী দিতে । গাড়িতে ভোলানাথ ছাড়াও তাঁর ছোট ছেলে এবং ওই গাড়ির চালক ছিলেন ।

প্রত‍্যক্ষদর্শীদের কথায়, "বয়ারমারি থেকে চারচাকা গাড়িটি মালঞ্চের দিকে যাচ্ছিল । উলটো দিক থেকে একটি খালি ট্রাক মালঞ্চ হয়ে বয়ারমারির দিকে আসছিল । সেই সময় বাসন্তী হাইওয়েতে একটি পেট্রল পাম্পের সামনে ভোলানাথের গাড়িতে ধাক্কা মারে ওই খালি ট্রাকটি । ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ও গাড়ির চালক শাহানুরের ।"

ETV BHARAT
শাহজাহান-মামলার সাক্ষী ভোলানাথ (নিজস্ব চিত্র)

কিন্তু বরাত জোরে বেঁচে যান ভোলানাথ । আহত অবস্থায় গাড়ি থেকে উদ্ধার করে প্রথমে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মিনাখাঁ গ্রামীণ হাসপাতালে । বুকে চোট থাকায় পরে সেখান থেকে ভোলানাথকে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় বলে খবর । এদিকে, এখনও তিনি জানেন না দুর্ঘটনায় তাঁর ছোট ছেলের মৃত্যু হয়েছে ।

এই বিষয়ে শাহজাহান-মামলার অন‍্যতম সাক্ষী আহত ভোলানাথ বলেন, "আদালতে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই এদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলাম । সবে বয়ারমারি পার হয়েছি, এমন সময় মালঞ্চের দিক থেকে আসা একটি লরি সজোরে এসে ধাক্কা মারে গাড়িটিতে । গাড়িটি নয়ানজুলিতে পড়ে যায় ।অচৈতন্য অবস্থায় সেখান থেকে লোকজন উদ্ধার করে আমাকে । কী ঘটনা, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল তা প্রশাসন তদন্ত করে দেখুক । পরিকল্পিত ঘটনা হতে পারে । সেটা প্রশাসন ভালো বলতে পারবে । না-জেনে আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না ।"

এই ঘটনায় ভোলানাথের বড় ছেলে বিশ্বজিৎ ঘোষ শাহজাহান ঘনিষ্ঠ দুই তৃণমূল নেতা-নেত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন । তিনি বলেন, "ওই-খানে একটাই রাজ চলে, শাহজাহান শেখের । আগেও সে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দিয়েছিল মেরে ফেলার । শাহজাহান শেখের কথায় মোসলেম শেখ ও সবিতা রায় চক্রান্ত করে এই ঘটনা ঘটিয়েছে । শাহজাহান শেখ জেলে বসেই সমস্ত কলকাঠি নাড়ছে । তাঁর অবর্তমানে এখন ন্যাজাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সবিতা রায় ও পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি মোসলেম শেখ দাপট চালাচ্ছেন । এরা শাহজাহানের র‌্যাকেট চালাচ্ছে । এটা একশো শতাংশ খুন । শাহজাহান শেখের ইন্ধনে সবিতা আর মোসলেম করিয়েছে ।"

বিশ্বজিৎ আরও বলেন, "আমি যতদূর শুনেছি, ঘাতক লরির ড্রাইভারের নাম আলিম । গাড়িটা ছিল লাউখালির । ওই লরিটা আগে থেকেই চারচাকার গাড়িটাকে ফলো করছিল । তারপর পাশ থেকে দু'বার ধাক্কা মেরেছে । তিনবারের বার ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দেয় ।"

যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ন‍্যাজাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তথা তৃণমূল নেত্রী সবিতা রায় । তাঁর দাবি, "এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন । আমি একজন মহিলা হয়ে কীভাবে খুনের চক্রান্ত করব ? ঘটনাটি খুবই বেদনাদায়ক । আমি নিজেও মর্মাহত । পুলিশ তদন্ত করুক । আমি দায়ী কী দায়ী না, সবটা সামনে চলে আসবে ।"

অন‍্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে সন্দেশখালির বিজেপি নেত্রী রেখা পাত্র বলেন, "শাহজাহান-কাণ্ডের সাক্ষীকে পরিকল্পনা করেই খুনের চেষ্টা হয়েছিল । উনি যাতে আদালতে পৌঁছে শাহজাহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে না-পারেন । সেই কারণে চক্রান্ত করে তাঁর গাড়িতে ধাক্কা মারা হয় । শাহজাহান যে কত বড় দুর্নীতিবাজ এবং মাফিয়া তা এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট । শাহজাহান জেলে থেকেই তাঁর অনুগামীদের দিয়ে সন্দেশখালি পরিচালনা করেছেন । যাতে সন্দেশখালিতে ওঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে না-পারে ।"

প্রসঙ্গত, ভোলানাথ সিবিআইয়ের পাশাপাশি ইডি-র মামলাতেও সাক্ষী । ভোলানাথ এক সময় শাহজাহানের সঙ্গী থাকলেও পরে অনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে বিরোধ বাঁধে তাঁর সঙ্গে । তার জেরে এক সময়ে শাহজাহানের রোষের মুখে পড়তে হয় ভোলানাথকে । তাঁর বাড়ি ভাঙচুর করে তাঁকে এলাকাছাড়া করা হয় বলে অভিযোগ । শাহজাহান গ্রেফতার হওয়ার পর ফের এলাকায় ফেরেন তিনি । শাহজাহানের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন । সিবিআইয়ের দায়ের করা একটি মামলায় সাক্ষ‍্য দিতে যাওয়ার পথেই বুধবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ভোলানাথের গাড়ি । ইতিমধ্যে এই দুর্ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা।