চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় 5 তৃণমূল বিধায়ক 'বিচারাধীন', প্রার্থী পদ নিয়ে প্রশ্ন
এই নিয়ে সরব হয়েছেন নাম না-থাকা তৃণমূল বিধায়করা ৷ বিধানসভা নির্বাচনে ওই পাঁচজনের প্রার্থী হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ৷

Published : March 2, 2026 at 3:03 PM IST
মুর্শিদাবাদ/দক্ষিণ দিনাজপুর, 2 মার্চ: নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত এসআইআর-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম নেই মুর্শিদাবাদের চার ও দক্ষিণ দিনাজপুরের এক তৃণমূল বিধায়কের । পাঁচ বিধায়কেরই এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ।
জানা গিয়েছে, তালিকায় নাম না-থাকা মুর্শিদাবাদের চার বিধায়ক হলেন জঙ্গিপুরের জাকির হোসেন, সাগরদিঘির বাইরন বিশ্বাস, জলঙ্গির রাজ্জাক শেখ ও নওদার তৃণমূল বিধায়ক সাহিনা মমতাজ খান । চারজনের নামই এসআইআর-এর শুনানিতে 'বিচারাধীন' রয়েছে । সকলেই সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকার দিকে চেয়ে রয়েছেন ।
এদিকে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জের বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডলের নাম এসআইআর-এর প্রথম বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে । তাঁর নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে । এমনকি হতবাক বিধায়ক নিজেই ৷ তাঁর দাবি, সমস্ত ধরনের কাগজ জমা দেওয়ার পরেও নাম বিচারাধীন তালিকায় কীভাবে এল তা তিনি বুঝতে পারছেন না ।
চক্রান্তের অভিযোগ জাকিরের
অন্যদিকে, নাম বাদ পড়ায় জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী তথা জঙ্গিপুরের তৃণমূল বিধায়ক জাকির হোসেন ৷ সকল বৈধ ভোটারের নাম নথিভুক্ত না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি ৷ জাকির হোসেন বলেন, "বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমাদের আস্থা আছে । নির্বাচন কমিশন বিজেপির দালালি করছে । এলাকার বহু মানুষ আতঙ্কে ভুগছেন । আমরা তাঁদের বলেছি, আতঙ্কিত হবেন না । আমাদের মুখ্যমন্ত্রী আছেন । দরকার হলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলন সংগঠিত করব ।"

ক্ষোভ প্রকাশ বাইরনের
ভোটার তালিকায় নাম বিভ্রাট নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাইরন বিশ্বাস । তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশনের বিজেপিকে খুশি করার চক্রান্ত আমরা মানছি না, মানব না । তৃণমূল সরকার মুখ বুজে মেনে নেবে না । এর শেষ দেখবে ।"
'বিচারাধীন' ভোটার তালিকার শীর্ষে মুর্শিদাবাদ
শনিবারই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কমিশন । সেই তালিকায় রাজ্যে বিচারাধীন রয়েছে 60 লক্ষ ভোটার । তালিকার শীর্ষে নাম রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার । এই জেলায় 11 লক্ষ 1 হাজার 145 জনের নাম বিচারাধীন রয়েছে । জেলায় এত সংখ্যক শুনানির জন্য 22 জন বিচারকের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।
মুর্শিদাবাদে খসড়া তালিকায় 2 লক্ষ 78 হাজার 837 জনের নাম বাদ গিয়েছে । 5 হাজার 200 জনের নাম নতুন ভোটার হিসেবে সংযোজন হয়েছে । চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় মোট ভোটার 54 লক্ষ 75 হাজার 470 জন । 11 লক্ষ 1 হাজার 145 জনের ভাগ্য ঝুলছে । তাদেরই মধ্যে রয়েছেন জেলার চার নির্বাচিত তৃণমূল বিধায়ক । ভোটার তালিকায় নাম বা উঠলে এই চারজন বিধায়ক এবার বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে পারবেন না । যদিও তার আগে দল তাঁদের টিকিট দেবে কি না তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে । বিধানসভা ভিত্তিক সব থেকে বেশি নাম বাদের তালিকায় রয়েছে জঙ্গিপুর । এই বিধানসভায় দু'বারের জয়ী প্রার্থী জাকির হোসেন । বিড়ি শিল্পপতি জাকির হোসেন রাজ্যের মন্ত্রীও ছিলেন । তাঁর নামও নেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ৷
শুনানিতে অংশ নিয়েও 'বিচারাধীন' তালিকায় বিধায়ক
ওদিকে কুমারগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে দু'বারের (2016, 2021) বিধায়ক তোরাফ হোসেন মণ্ডল ৷ 2002 সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল এবং 1980 সাল থেকে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন । দীর্ঘ 39 বছর চাকরি করার পর 2019 সালে, বিধায়ক থাকাকালীন অবস্থাতেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন । ভারতের নাগরিকত্বের সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাঁর নাম বিচারাধীন তালিকায় । কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁর নাম বিচারাধীন হিসেবে দেখানো হওয়ায় তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন । শুধুমাত্র বিধায়ক নন, কুমারগঞ্জ বিধানসভা এলাকা জুড়ে প্রায় 30 হাজার মানুষের নাম রাখা হয়েছে বিচারাধীন তালিকায় ।
তোরাফ হোসেন মণ্ডল বলেন, "এসআইআর শুনানিতে আমাকে ডাকা হয়েছিল । আমি সেখানে আমার পেনশনের কাগজ থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রমাণপত্র দেখিয়ে এসেছি । আমার পরিবারের স্ত্রী, সন্তান সকলের নাম রয়েছে অথচ আমার পরিবারের হেড হয়ে আমার নাম বিচারাধীন অবস্থায় ।" তাঁর দাবি, এটি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে ।
তিনি বলেন, "আমার অনুমান যেভাবে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাতে আগামী ভোটের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে । কারণ 20 হাজার নাম তালিকা থেকে বাদ যদি যায়, তাহলে ভোটের ফলাফলে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য । উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু মানুষের নাম 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' তালিকায় রাখা হয়েছে । তবে বিচার বিভাগের উপর আস্থা রয়েছে । পাশাপাশি এই বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বেদের জানিয়েছি ।"
বিজেপির পালটা যুক্তি
যদিও ইচ্ছাকৃতভাবে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ গেরুয়া শিবির ৷ পালটা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের তত্ত্ব খাড়া করেছে তারা ৷ বিজেপির দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সম্পাদক বাপি সরকার বলেন, "শনিবার নির্বাচন কমিশন যে তালিকা প্রকাশ করেছেন তাতে কুমারগঞ্জের বিধায়কের নাম বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে । তৃণমূল অভিযোগ করছে এটা বিজেপির চক্রান্ত, কিন্তু যত বিএলও এখানে নিযুক্ত হয়েছে সব তৃণমূলের দ্বারা । এমনকি ইআরও-এইআরও সকলেই শাসকদলের মনোনীত হয়ে নিযুক্ত হয়েছেন । ভারতীয় জনতা পার্টিকে তারা মিথ্যাচার করে দোষারোপ করছে । তৃণমূলের নিজেদের মধ্যেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে । আমাদের মনে হয় তাদের কিছু নেতা তোরাফ হোসেনকে এবারে ভোটে না দাঁড়াতে দেওয়ার জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে এসআইআর-এর মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে । এটা তাদের নিজেদেরই চক্রান্ত ।"
এ বিষয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দফতরের তরফে এখনও কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া মেলেনি । তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে । অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ সামনে আনা প্রয়োজন, যাতে ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে ৷
উদ্বিগ্ন ভোটাররা
উল্লেখ্য, বর্তমানে যে সমস্ত মানুষের নাম বিচারাধীন তালিকায় রয়েছে, তাঁদের এখন কী করণীয় তা নিয়েই কুমারগঞ্জ ব্লকের মহল্লায়-মহল্লায় চলছে জোর আলোচনা । উদ্বিগ্ন মানুষ সকাল থেকেই চোখ রাখছেন মোবাইলের স্ক্রিনে অথবা ভোটার তালিকায় । দেখতে চাইছেন তাঁর নাম তালিকা ভুক্ত হয়েছে কি না । জাকিরপুর অঞ্চলের অধিকাংশ বুথেই কমপক্ষে 100 জনের নাম কাটা গিয়েছে বা এই সংখ্যা 300 থেকে 350-এর ওপরে । যেখানে তোরাফ হোসেন মণ্ডলের নিজস্ব বুথেই 1400 ভোটারের মধ্যে 319 জনের নাম এই তালিকাভুক্ত হয়েছে ।

