পাহাড়ে অগ্নিনির্বাপণে কড়াকড়ি, বন্ধের পথে হোটেল-রেস্তরাঁ ! পর্যটন মরশুমে সংকটের মেঘ
সমতলের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পাহাড়ের হোটেল ও রেস্তরাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ৷ পুজোর পর হোটেল বন্ধের হুঁশিয়ারি ! শুভদীপ রায় নন্দীর প্রতিবেদন ৷

Published : September 2, 2026 at 8:03 PM IST
কালিম্পং, 2 সেপ্টেম্বর: কালিম্পং-সহ গোটা পাহাড়ে হোটেল ও রেস্তরাঁগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে রাজ্য সরকার ৷ তার জেরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা ৷ অগ্নি সুরক্ষা আইন অমান্য করার অভিযোগে ইতিমধ্যে কালিম্পং শহরের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় 60টি হোটেল ও রেস্তরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে ৷
এমনকি পরপর তিনটি নোটিশ দেওয়ার পর কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর এবং হোটেল ও রেস্তরাঁ সিল করে দেওয়ার মতো কড়া পদক্ষেপ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে প্রশাসন ৷ ফলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৷ এর প্রতিবাদে এবং পরিস্থিতির সুরাহা না-হলে আগামী পর্যটন মরশুমের আগে শহরের সমস্ত হোটেল ও রেস্তরাঁ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে 'হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব কালিম্পং' ৷
তবে, সমতলের জন্য তৈরি 'পশ্চিমবঙ্গ অগ্নিনির্বাপক আইন 1950' পাহাড়ি এলাকায় জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন হোটেল মালিকরা ৷ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিদ্ধান্ত সুদ এবং ব্যবসায়ী মথান রাই অভিযোগ করছেন, সমতলের নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের প্রতিটি হোটেলে 10 হাজার লিটারের ভূগর্ভস্থ জলাধার এবং 8 হাজার লিটারের ওভারহেড জলাধার তৈরি করা, বিকল্প সিঁড়ি বা আধুনিক স্প্রিঙ্কলার ব্যবস্থা ভৌগোলিক কারণে প্রায় অসম্ভব ৷
আর জলাধার তৈরি করা নিয়ে তাঁরা অভিযোগ করেছেন, পাহাড়ি এলাকা সিসমিক জোনের অন্তর্গত হওয়ায় টিনের চাল বা বহুতলের ছাদে হাজার হাজার লিটার জলের ভার বহন করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ ৷ এমনকি মাটির নীচে বিশাল জলাধার তৈরির জায়গাও এখানে নেই ৷ অধিকাংশ হোটেলগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, স্মোক ডিটেক্টর, ফায়ার অ্যালার্ম এবং জরুরি নির্গমনের ব্যবস্থা রাখা সত্ত্বেও লাইসেন্স না-থাকার অজুহাতে নোটিশ ধরানো হচ্ছে ৷
সমস্যার সমাধানে গত তিনদিনে একাধিক বৈঠক করেছে HORAK-এর প্রতিনিধি দল ৷ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা কালিম্পংয়ের বিধায়ক ভরত ছেত্রী, জেলাশাসক এবং গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (জিটিএ) মুখ্যসচিব ও এগজিকিউটিভ ডিরেক্টরের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ৷
বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য পৃথক ও বাস্তবসম্মত অগ্নিসুরক্ষা নীতি নির্ধারণের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে ৷ বিধায়ক রুদেন সাদা লেপচা বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের দমকল মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন, যাতে পুরনো আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে অঞ্চলভিত্তিক কার্যকর নিয়ম তৈরি করা যায় ৷

সামনেই দুর্গোৎসব এবং শীতকাল ৷ ভরা পর্যটন মরশুমের আগে শহরের অধিকাংশ হোটেলে অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং সম্পূর্ণ হয়ে গেছে ৷ এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিলে পর্যটকরা যেমন হয়রানির শিকার হবেন, তেমনই পাহাড়ি অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড পর্যটন শিল্প ধসে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা ৷ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত নোটিশ কার্যকর করা বন্ধ রাখা হয় এবং পর্যায়ক্রমে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান বের করা হয় ৷ অন্যথায় পর্যটন মরশুম শেষ হলে ব্যবসায়ীরা সব হোটেল ও রেস্তরাঁ স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন ৷
এই বিষয়ে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ কালিম্পংয়ের সভাপতি সিদ্ধান্ত সুদ বলেন, "আমরা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি ৷ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ফায়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাদের সদস্যদের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে ৷ কিছু সদস্য ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় নোটিশ পেয়েছেন, এমনকি একটি হোটেলকে তৃতীয় নোটিশও ধরানো হয়েছে ৷ ফলস্বরূপ, তাদের কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও হোটেল সিল করার আদেশ জারি হয়েছে ৷ তৃতীয় নোটিশের পর এফআইআর, গ্রেফতার এবং প্রপার্টি সিল করার মতো পদক্ষেপ করা হতে পারে ভেবে আমাদের সদস্যরা যথেষ্ট ভীত ৷"
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত শনিবার HORAK-এর তরফে স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে বৈঠক করা হয় ৷ সংগঠনের সভাপতি বলেন, "এই পরিস্থিতিতে স্বস্তি পাওয়ার আশায় আমরা গত শনিবার স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে দেখা করে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছি ৷ আমাদের প্রায় 29 বছরের পুরনো সংগঠন ৷ আগেও সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে ৷ 2023 সালে যখন রাজ্যের দমকল মন্ত্রী এসেছিলেন, তখনও আমাদের প্রতিনিধিদল তাঁকে জানিয়েছিল যে সমতল ও পাহাড়ের ফায়ার লাইসেন্সের নিয়ম বা বাস্তবায়ন এক হতে পারে না ৷"
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে তিনি বলেন, "কলকাতা বা শিলিগুড়িতে যে নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব, পাহাড়ের ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব নয় ৷ সরকার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করতে যে পদক্ষেপ করেছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই ৷ আমরাও চাই আমাদের অতিথি, কর্মচারী ও হোটেল সুরক্ষিত থাকুক ৷ সেজন্য আমরা এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্ট পরিষ্কার রেখেছি এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরির অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র বসিয়েছি ৷"
কিন্তু, বর্তমানে দমকলের তরফে যে সব শর্ত দেওয়া হচ্ছে, তা মানা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সিদ্ধান্ত সুদ ৷ তিনি বলেন, "যেসব শর্ত দেওয়া হচ্ছে—যেমন আট হাজার থেকে 10 হাজার লিটারের ভূগর্ভস্থ জলের ট্যাঙ্ক তৈরি করা, তা 40-50 বছরের পুরনো বিল্ডিংয়ে কীভাবে সম্ভব ? পাহাড়ে মূলত টিনের চাল থাকে, তার ওপর এত হাজার লিটার জলের ভার বহন করা চরম বিপজ্জনক ৷ তার ওপর এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ (সিসমিক জোন) ৷ যদি জলের ট্যাংক ভেঙে পড়ে, তার প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতি হবে ৷ সেই দায় প্রশাসন নেবে ? স্প্রিঙ্কলার বসানোর খরচও অত্যন্ত বেশি এবং ভূমিকম্পে পাইপের অ্যালাইনমেন্ট সরে গেলে লিকেজ হতে পারে ৷"
HORAK-র সদস্য মথান রায় বলেন, "পাহাড়ের মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো জলের সংকট। এটি বহু দশক ধরে চলে আসছে, সরকার এসেছে-গিয়েছে কিন্তু পাহাড়ের জল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি ৷ আমরা প্রচুর বৃষ্টিপাত পেলেও সঠিক রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা নেই ৷ আগে এলাকাভিত্তিক যে হাইড্র্যান্ট ও রিজার্ভার থাকত, তাও এখন প্রায় বন্ধ ৷ এই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার লিটারের ওভারহেড ও ভূগর্ভস্থ ওয়াটার রিজার্ভার তৈরির নির্দেশ বাস্তবে অসম্ভব ৷ তাছাড়া সমতলের মতো এখানে বড় ফোর-স্টার বা ফাইভ-স্টার হোটেলের মতো বিশাল জায়গা নেই; অধিকাংশ ব্যবসাই 5, 10 বা সর্বোচ্চ 20-25 রুমের ৷ তাই সমতলের নিয়ম পাহাড়ে চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই অবাস্তব ৷"
মথান রায়ের কথায়, "আমরা ইতিমধ্যে মাননীয় পর্যটন মন্ত্রী, সাংসদ রাজু বিস্তা এবং জেলাশাসকের কাছে চিঠি পাঠিয়ে আবেদন জানিয়েছি ৷ আমাদের অনুরোধ, পাহাড়ের বাস্তব চিত্রটা বুঝে এখানকার জন্য একটি পৃথক ও কার্যকর ফ্রেমওয়ার্ক বা নিয়ম তৈরি করা হোক ৷ পর্যটন পাহাড়ের মানুষের রুজি-রুটি ৷ এখন সামনে দুর্গাপুজো, দশেরা ও দিওয়ালির মরশুম, এই সময়ে বুকিং বাতিল করতে হলে রাজ্য ও পাহাড়—উভয়েরই ভাবমূর্তি ও অর্থনীতির চরম ক্ষতি হবে ৷"
এই বিষয়ে দার্জিলিংয়ের ডিভিশনাল ফায়ার অফিসার দেওয়ান লেপচা বলেন, "কালিম্পংয়ের ওই হোটেলগুলি-সহ পাহাড়ের একাধিক হোটেল, হোম-স্টে ও রেস্তরাঁয় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না-থাকায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে ৷ হোটেল সংগঠনের তরফে যে দাবি ও অভিযোগ উঠেছে সেটাও বাস্তব ও যুক্তিযুক্ত ৷ সেজন্য তাদের দাবি ও প্রস্তাব লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হবে ৷ আপাতত কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না ৷ এরপর উপরমহল থেকে যেমন নির্দেশ আসবে, সেইমতো পদক্ষেপ করা হবে ৷"
পাশাপাশি, কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির পর্যটন বিভাগের চেয়ারম্যান সম্রাট সান্যাল বলেন, "সামনেই দুর্গোৎসব ও শীতের পর্যটন মরশুম এবং শহরের অধিকাংশ হোটেলে অক্টোবর পর্যন্ত সমস্ত বুকিং সম্পূর্ণ হয়ে গেছে ৷ এই মুহূর্তে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ করে ব্যবসা বন্ধ করে দিলে পর্যটকরা যেমন হয়রানির শিকার হবেন, তেমনই পাহাড়ের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড পর্যটন শিল্প ধসে নামবে ৷ আমাদেরও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে অন্তত অক্টোবর পর্যন্ত নোটিশের কড়াকড়ি বন্ধ রাখা হয় এবং পর্যায়ক্রমে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান বের করা হয় ৷ অন্যথায় পর্যটন মরশুম শেষে সব হোটেল ব্যবসায়ীরা প্রতিষ্ঠানগুলি স্বেচ্ছায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন ৷"

