ETV Bharat / state

বিদেশে বাজার আছে, তবু উন্নত প্রযুক্তির অভাবে ধুঁকছে শ্রীরামপুরের সিল্ক প্রিন্টিং

শ্রীরামপুর থেকে ইতালি-জাপান-সহ ইউরোপের বহু দেশে সিল্ক প্রিন্টিং যায় ৷ কিন্তু শ্রীরামপুরে অনেক পিছিয়ে নামকরা সুরাতের সিল্ক প্রিন্টিংয়ের থেকে ৷ বিশেষ প্রতিবেদন পলাশ মুখোপাধ্যায়ের ৷

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলা (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 31, 2026 at 8:45 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

শ্রীরামপুর, 31 অগস্ট: ভারতে সিল্ক প্রিন্টিং-এর কথা উঠলে মনে পড়ে গুজরাতের সুরাতের কথা ৷ কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই বাংলাতেও একসময় উচ্চমানের সিল্ক প্রিন্টিং হত ৷ এখনও হয় ৷ হুগলির শ্রীরামপুর থেকে ইতালি, জাপান-সহ ইউরোপের বহু দেশে সিল্ক প্রিন্টিং যায় ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখানে সুরাতের মতো আধুনিক পরিকাঠামো নেই ৷ এতেই এই শিল্পে ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলা ৷

অথচ ক'য়েক হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৷ রাজ্যের পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে সিল্ক প্রিন্টিং হাবের শিলান্যাস করেছিলেন। সরকারিভাবে তার সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরুও হয়েছিল। কিন্তু পালাবদলের রাজ্যে ফের থমকে গিয়েছে হাবের কাজ ৷ ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রিন্টিং হাব হলে এখানে উন্নত মানের মেশিন বসত ৷ উৎপাদন এবং গুনমান, দুই-ই বাড়ত ৷ তাঁরা রাজ্যের নতুন সরকারের কাছে এই হাব নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন ৷ শ্রীরামপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্যের আশ্বাস, শ্রীরামপুরে সিল্ক প্রিন্টিং হাব তৈরির চিন্তা ভাবনা রয়েছে সরকারের ৷

শ্রীরামপুর থেকে ইতালি-জাপান-সহ ইউরোপের বহু দেশে সিল্ক প্রিন্টিং যায় (ইটিভি ভারত)

শ্রীরামপুরের সিল্ক প্রিন্টিং শিল্প প্রায় একশো বছরের পুরনো ৷ বিভিন্ন রাজ্যের সিল্ক ও তসরের উপর এই প্রিন্ট করা হয় ৷ আগে মূলত কাঠের ব্লকের ডিজাইনের সাহায্যে কাপড় প্রিন্ট করা হত ৷ বর্তমানে স্ক্রিন ও হ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের কাজ হচ্ছে। গাছের পাতা দিয়ে করা হচ্ছে ইকো প্রিন্ট ৷ সিল্ক ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সুতো ব্যবহার করা হচ্ছে । এখানে প্রিন্ট হওয়া শাড়ি দেশ ও বিদেশের বাজারে 2 থেকে 10 হাজার টাকায় বিকোচ্ছে ৷ ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সরকারিভাবে এখানে ক্লাস্টার ও হাব তৈরি করা হোক ৷ রাজ্যের পূর্বতন সরকার 2014 সালে শ্রীরামপুরে সিল্ক প্রিন্টিং হাব নির্মাণের চিন্তা করে ৷ সেই হাবের শিলান্যাসও হয় ৷

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
শ্রীরামপুর সিল্ক প্রিন্টিং (ইটিভি ভারত)

শ্রীরামপুরের তারাপুকুর, রাজ্যধরপুর, পিয়ারাপুর, নওগাঁ, মরাদান, বউবাজার-সহ একাধিক এলাকায় সিল্ক প্রিন্টিংয়ের ছোট, বড় বহু কারখানা রয়েছে। বর্তমানে সিল্ক প্রিন্টার ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য রয়েছেন 250 জন ৷ তাঁদের কথা ভেবেই সিল্ক হাব নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল সরকার ৷ 19 একর জমিতে সীমানা প্রাচীর দেওয়ার কাজও শুরু হয় ৷ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের জন্য খড়গপুর আইআইটির আধিকারিকরা জমি পরিদর্শন করে গিয়েছিলেন। কমন ফেসিলিটি সেন্টার হওয়ারও কথা ছিল ৷ কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর সব কাজ থমকে গিয়েছে ৷ হাবের জায়গা জঙ্গলে ভরে গিয়েছে ৷ কবে এই হাবের কাজ আবার গতি পায় এখন তার অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন শিল্পী থেকে ব্যবসায়ীরা ৷

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
সুরাতের মতো আধুনিক পরিকাঠামো নেই শ্রীরামপুরে (ইটিভি ভারত)

সিল্ক প্রিন্টিং শিল্পীরা কী বলছেন ?

শিল্পী দিলীপ ভট্টাচার্য বলেন, "এখানে স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক ও হ্যান্ড প্রিন্ট-সহ সব ধরনেরই প্রিন্টিং করা হয়। কেমিক্যাল ও ন্যাচারাল ইকো প্রিন্টিং হয়। এই শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষ জড়িত ৷ বাইরে থেকেও অনেক মানুষ এখানে কাজ করতে আসেন ৷ একসময় শ্রীরামপুর সিল্ক ইন্ডাস্ট্রির নাম ছিল ৷ এটা একটা ঐতিহ্য ৷ এখন মহিলাদের যে শাড়ি পরার প্রবণতা কমেছে সেটা ঠিক ৷ তাই আমরা বিভিন্ন ধরনের পোশাক ও স্কার্ফ তৈরি করছি ৷ রাজ্যের নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এখানকার সেই ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা হোক ৷"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
কাঠের ব্লকের ডিজাইনের সাহায্যে কাপড় প্রিন্ট করা হত (ইটিভি ভারত)

আরেক শিল্পী গুলাম মুস্তাফা খান বলেন, "বাবাকে দেখেই ব্লক প্রিন্টিং শেখা। অল্প বয়স থেকে কাজ করছি। এই কারখানায় 35 বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। একটা শাড়ির মজুরি 120 টাকা। সারাদিনে তিনটি শাড়ি করতে পারি। কিন্ত সেই টাকায় কিছু হয় না। সংসার কোনওমতে চলে। কংগ্রেস আমল থেকে আমাদের পরিবার কাজ করে যাচ্ছে ৷ এখনও কোনও সরকার আমাদের দেখেনি। একাধিক সরকারি আধিকারিক এসেছেন, দেখেছেন, চলে গিয়েছেন ৷ আমাদের কিছু হয়নি। সিল্ক হাব হলে এই শিল্পের উন্নতি হত। আমার বয়স এখন 67 বছর ৷ এখন আর নতুন করে কী চাইব ? মজুরি কম হওয়ায় নতুন প্রজন্মের কেউ এই কাজ করতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না ৷ উল্টে এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে ৷"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
শ্রীরামপুরের সিল্ক প্রিন্টিং (ইটিভি ভারত)

কী বলছেন ব্যবসায়ী ও সংগঠনের সদস্যরা ?

শ্রীরামপুর সিল্ক প্রিন্টার ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক প্রদীপ বণিক বলেন, "সিল্ক প্রিন্টিংয়ের তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। প্রিন্টিং-এর পরিকাঠামো বৃদ্ধির জন্য সিল্ক হাবের কথা বলা হয়েছিল। 2017 সালে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিলান্যাস করেছিলেন। পূর্ববর্তী সরকারের আমলের শেষের দিকে হাবের পাঁচিল দেওয়ার কাজ শুরু হয়। কিন্তু সেই কাজ সেভাবে এগোচ্ছে না। এখন পুরোপুরি থমকে রয়েছে। সুরাতের তুলনায় শ্রীরামপুরের সিল্ক প্রিন্টিং অনেক পিছিয়ে রয়েছে ৷"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
সুরাতের মতো আধুনিক পরিকাঠামো নেই (ইটিভি ভারত)

তিনি আরও বলেন, "সেখানে মেশিনের মাধ্যমে প্রিন্টিং হচ্ছে । এখানে সবকিছু এখনও হাতে হয়। শ্রীরামপুরে বিচ্ছিন্নভাবে কারখানাগুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ক্লাস্টারের মাধ্যমে সেগুলি এক ছাতার তলায় আনতে পারলে অনেক উন্নতি হত। সুরাটের মতো যদি এখানে মেশিন দিয়ে ডাইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং-এর কাজ হত তবে ভালো হত ৷ সুরাত পুরো দেশজুড়ে ব্যবসা করছে। সেখান থেকে দেশে-বিদেশে প্রচুর এক্সপোর্ট হচ্ছে। সরকারিভাবে অনেক সুবিধে রয়েছে। কিন্তু শ্রীরামপুরে এই ব্যবসায় ভর্তুকি পর্যন্ত তুলে দিয়েছে সরকার।"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
থমকে গিয়েছে হাবের কাজ (ইটিভি ভারত)

শেষে তিনি বলেন, "58 একর জমির মধ্যে মাত্র 19 একর জমিতে কমন ফেসিলিটি সেন্টার হওয়ার কথা ছিল। 25 বছর ধরে আমরা চেষ্টা করছি। গত সরকারের আমলে সিদ্ধান্ত হলেও গত চার বছরে তেমন কিছু উন্নতি হয়নি। অথচ আমাদেরই ডিজাইন কপি করে সুরাত ব্যবসা করছে। আমাদের শাড়ি সুরাত কিনে নিচ্ছে। উন্নত মেশিন থাকলে কম পয়সায় বেশি উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করা যেত। অন্তত ডাইং ও ফিনিশিং মেশিন থাকলেও আমরা সুরাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারতাম। এখনও শ্রীরামপুর থেকে বিদেশে এক্সপোর্ট হয়। সরকারি সাহায্য পেলে এই ব্যবসায় একটু সুবিধে হয়।"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
শ্রীরামপুরের সিল্ক প্রিন্টিং (ইটিভি ভারত)

শ্রীরামপুর থেকে সিল্ক প্রিন্টেড কাপড় এক্সপোর্ট হয় ইতালিতে। স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের কাজ পাঠান ব্যবসায়ী অভয় ঘোষ। তিনি বলেন, "সিল্ক হাবের জন্য পাঁচিল দেওয়া পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল ৷ কিন্তু এখন কী পরিস্থিতি জানি না। আমরা আশাবাদী এখানে সিল্ক হাব হবে। এই হাব হলে এক ছাদের তলায় সব কিছু হবে। আমাদের কাজ ইlতালি, লন্ডন ও জার্মানিতেও যায়। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই ভালো কাজের চাহিদা রয়েছে। যদি আধুনিক পরিকাঠামোর ব্যবস্থা করা হয় তবে এখানকার কাপড়ের চাহিদা দেশে ও বিদেশে আরও বাড়বে ৷ আমাদের ছোট ব্যবসা। আর্থিক সামর্থ্যও নেই। সরকার এগিয়ে এলে এই শিল্পের আরও উন্নতি ঘটবে।"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
বর্তমানে স্ক্রিন ও হ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের কাজ হচ্ছে (ইটিভি ভারত)

ব্যবসায়ী কৌস্তভ মুখোপাধ্যায় বলছেন, "আমার কাজ মূলত জাপানে যায়। স্ক্রিন প্রিন্টের ওড়না, স্টোলের প্রিন্টিং কাপড় সেসব দেশে পাঠাই। বছরে এক কোটি টাকার উপর প্রিন্টিং কাপড়ের ব্যবসা করি। এই শিল্পে তিন কোটি টাকার উপর ব্যবসা হয়। আমাদের জমি ও আর্থিক বিনিয়োগে সমস্যা রয়েছে। এই শিল্পে দক্ষ শিল্পী নেই। তাঁদের ট্রেনিং দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই । যদি টান্সপোর্টের ব্যাপারে সরকার বিশেষ নজর দেয় তাহলে এই শিল্পের আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে ৷"

SHRIRAMPUR SILK PRINTING
শ্রীরামপুরে অনেক পিছিয়ে নামকরা সুরাতের সিল্ক প্রিন্টিংয়ের থেকে (ইটিভি ভারত)

মন্ত্রী কী বলছেন ?

এলাকার বিধায়ক তথা শ্রম দফতরের প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, "শ্রীরামপুরের বিধায়ক হিসেবে আমি সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী ও তাঁর দফতরে আবেদন করছি। এখানে সিল্ক হাবের চাহিদা রয়েছে ৷ আমি সরকারকে সেটা জানিয়েছি ৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জমির ব্যবস্থা ছাড়া কিছু করতে পারেননি ৷ এবার আমাদের সেই কাজ করতে হবে ৷"