উরুতে বসানো রড ভেঙে চার টুকরো, বৃদ্ধ মেক্যানিকের 'কারিগরি'তে সফল অস্ত্রোপচার
টুকিটাকি যন্ত্রাংশ তৈরিতে সিদ্ধহস্ত বৃদ্ধ হ্যান্ডমেড যন্ত্র তৈরি করে চিকিৎসকদের সাহায্য করলেন ৷ তাঁর জন্য পা ফিরে পেলেন সুকুর আলি ৷

Published : February 27, 2026 at 7:05 PM IST
কলকাতা, 27 ফেব্রুয়ারি: ভাঙা উরু জুড়তে বসানো ধাতব রড ভেঙে চার টুকরো ৷ ভাঙা টুকরোটি আবার আটকে গিয়েছে হাড়ের সঙ্গে ৷ হাঁটতেই পারছিলেন না 41 বছরের সুকুর আলি ৷ হাড় থেকে সেই ভাঙা ধাতব টুকরোগুলো সরাতে যে যন্ত্রের প্রয়োজন, তা জোগাড় করাও বেশ কষ্টসাধ্য ৷ তবে মুশকিল আসান করলেন সাধারণ এক মেকানিক ৷ টুকিটাকি যন্ত্রাংশ তৈরিতে সিদ্ধহস্ত এক বৃদ্ধ হ্যান্ডমেড যন্ত্র তৈরি করে চিকিৎসকদের সাহায্য করলেন ৷ তার ফলে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে সফল অস্ত্রোপচারে সুস্থতার পথে সুকুর আলি ৷
প্রায় দশ বছর আগে দুর্ঘটনায় ডান উরুর হাড় ভেঙেছিল সুকুর আলির । তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে । অস্ত্রোপচার করে ফিমার হাড় জোড়া লাগাতে পেরেক জাতীয় বস্তু (নেইল) ও স্ক্রু দিয়ে ধাতব রড বসানো হয় । পরে সুস্থ হয়ে মুম্বইয়ে গিয়ে আবার জরির কাজ শুরু করেন তিনি । কিন্তু মাস কয়েক আগে আবারও ডান পায়ে ব্যথা শুরু হয় তাঁর । প্রথমে ওষুধে সামাল দিলেও হঠাৎ একদিন তিনি লক্ষ্য করেন, পা আর নাড়তেই পারছেন না । তখনই ফের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে এক্স-রে করায় ধরা পড়ে গুরুতর সমস্যা ৷ রিপোর্টে দেখা যায়, কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত বসানো দীর্ঘ ধাতব রডটি ভেঙে চার টুকরো হয়ে গিয়েছে । সেই কারণেই পায়ে আর জোর পাচ্ছিলেন না তিনি ।

সমস্যা আরও জটিল আকার নেয়, কারণ ভাঙা ধাতব রডটি হাড়ের ভিতরে শক্তভাবে আটকে ছিল । সেটি বের করতে প্রয়োজন 'ব্রোকেন নেইল টিপ রিমুভার' নামে বিশেষ এক যন্ত্র, যা সব হাসপাতালে মজুত থাকে না । সরকারি ভাবে সেই যন্ত্র হাসপাতালে আনাতে সময় লেগে যায় দীর্ঘদিন । আর নতুন করে সেটি কিনতে হলে খরচ পড়ে প্রায় 50 হাজার টাকা ৷ ভাড়া নিতে হলেও অন্তত 18 হাজার টাকা লাগে ৷ তার উপর সেটি আসতে আসতে অনেকটা দেরি হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল ৷
এই পরিস্থিতিতে অভিনব এক উদ্যোগ নেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সৈকত সাউ । তিনি হাওড়ার জগৎবল্লভপুর এলাকার বাদেবালিয়ার বাসিন্দা 75 বছরের অভিজ্ঞ এক মেকানিকের সাহায্য নেন ৷ যিনি স্থানীয়ভাবে 'অনিলদাদু' নামে পরিচিত ৷

মাত্র 30 মিনিটের মধ্যেই ওই প্রবীণ মেকানিক প্রয়োজনীয় যন্ত্রটির একটি হ্যান্ডমেড সংস্করণ তৈরি করে দেন । অনিল বেরার ছেলে প্রণব বেরা জানান, "বাবা আগে একটা সার্ভিস করতেন । কিন্তু এখন মেকানিক্যাল বিভিন্ন কাজ করছেন । কিছু যন্ত্রাংশ বানাচ্ছেন ৷ চিকিৎসকের সঙ্গে আমার বাবা পরিচিত । উনি যখন পুরো সমস্যার কথাটা বলেন, তখনই বাবা এটা বানিয়ে দেন ।"
অপারেশনের আগে যন্ত্রটি অটোক্লেভে জীবাণুমুক্ত করা হয় । তারপর সেই যন্ত্র ব্যবহার করেই সফলভাবে সুকুরের উরু থেকে ভাঙা রডের চারটি অংশ বের করে আনেন চিকিৎসকেরা । দীর্ঘদিন ধাতব রড ও হাড়ের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া ধাতব যৌগও অপসারণ করা হয় । পরে নতুন নেইল ও স্ক্রু বসিয়ে পুনরায় উরুর ভাঙা হাড়ে ধাতব রড বসানো হয় । প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার ।

চিকিৎসক সৈকত সাউ বলেন, "প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত যন্ত্রটি তৈরি করে দিয়েছেন ওই প্রবীণ মেক্যানিক । প্রথাগত শিক্ষা না-থাকলেও বাংলার বহু মানুষের হাতে অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে - এই ঘটনাই তার প্রমাণ । একজন গরিব মানুষের জীবন বাঁচল আরেকজন প্রতিভাবান গরিব মানুষের সহযোগিতায় ।"
আর সুকুর আলি জানালেন, এই জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁদের কোনও খরচই হয়নি । এখন তাঁর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার । চিকিৎসার কাজে আনকোরা 75 বছরের এক বৃদ্ধ মেক্যানিকের দক্ষ হাতেই নতুন পা ফিরে পেলেন সুকুর আলি ।

