সংসারে অভাব সত্ত্বেও 'স্বপ্নের ফেরিওয়ালা', কবিতা লেখাই নেশা হুগলির সিভিক ভলান্টিয়ারের
কীভাবে সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজের পাশাপাশি লেখক হিসাবে নিজেকে তুলে ধরলেন সজল সাঁতরা, সেই গল্পই শুনলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পলাশ মুখোপাধ্যায় ৷

Published : September 1, 2026 at 7:08 PM IST
ধনিয়াখালি, 1 সেপ্টেম্বর: আর্থিক সমস্যা বাঁধা হয়েছে, তবুও স্বপ্নপূরণে হাল ছাড়েননি ৷ তাই তো সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজ করার পাশাপাশি লিখে চলেছেন একের পর এক কবিতা ৷ প্রকাশিত হয়েছে কবিতা সম্মলিত বইও ৷ মঙ্গলবার রাজ্যে পুলিশ দিবসে ইটিভি ভারত তুলে ধরল সজল সাঁতরার সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে 'কবিওয়ালা' হওয়ার গল্প ৷
রোদ-জল-বৃষ্টিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইন শৃঙ্খলা সামলান । রাজ্য পুলিশের বিভিন্ন থানায় সিভিক ভলান্টিয়াররাই এখন কার্যত মেরুদণ্ড । পথচলতি শহর ও গ্রামে মানুষকে পরিষেবা দিতে তাঁরাই তৎপর থাকেন । রাত দিন এক যোগে পুলিশকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলে কাজ করতে দেখা যায় তাঁদের । সেই তালিকার অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক এক নাম 39 বছরের সজল সাঁতরা ।
সিভিক ভলান্টিয়ার লেখক
হুগলি জেলার ধনিয়াখালির শিবাইচণ্ডি এলাকার বাসিন্দা সজল । সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজের সঙ্গে তাঁর নেশা কবিতা লেখা । একাধিক কবিতা লিখে ইতিমধ্যেই সাহিত্য জগতে নিজের জায়গা করেছেন সজল । সিভিকের কাজের মধ্যেও সময় পেলেই লেখালেখি করেন তিনি । তাঁর লেখা কবিতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে । বিভিন্ন বইয়েতেও ছাপানো হয়েছে তাঁর কবিতা ।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহর নয়, ভিন্ন রাজ্যে অসমে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই সিভিক ভলান্টিয়ার । আরও একাধিক পুরস্কার রয়েছে তাঁর ঝুলিতে । সংসারে একা রোজগেরে হয়েও সাহিত্য সৃষ্টির অদ্যম ইচ্ছে তাঁর । ইতিমধ্যেই 'স্বপ্নের ফেরিওয়ালা' বলে তাঁর লেখা একটি কবিতার বইও প্রকাশ করেছেন তিনি ।

ব্যতিক্রমী সিভিক ভলান্টিয়ার
হাতে লাঠি ও মুখে বাঁশি নিয়ে রাজনৈতিক জনসভা থেকে ট্রাফিক সামলাতে রাস্তায় দেখা যায় সিভিক ভলান্টিয়ারদের । রাজ্যে পুলিশি ব্যবস্থার অন্যতম যোদ্ধা এঁরা । তাঁদের মধ্যে যেন ব্যতিক্রমী সিভিক ভলান্টিয়ার সজল সাঁতরা । মাত্র আড়াই বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান । পরিবারে অভাব অনটনের মধ্যে আর উচ্চমাধ্যমিক দেওয়া হয়নি তাঁর । খুব অল্প বয়স থেকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকে ৷ পড়াশোনার পাশাপাশি সবজি বাজার, টেলারিং দোকানে কাজ করতে শুরু করেন তিনি ।
এরপর 2013 সালে ধনিয়াখালি থানা এলাকায় সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজের সুযোগ পান সজল । এখন বিবাহিত জীবনে স্ত্রী, দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে তাঁর সংসার । সমস্ত দায় দায়িত্ব কাজ সামলেও কবিতা লেখায় বিরাম নেই সজলের । এখনও পর্যন্ত 400টি কবিতা লিখেছেন তিনি । সেই লেখা নিয়ে বই প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর । কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য না-থাকায় সেই স্বপ্ন আপাতত স্বপ্নই থেকে গিয়েছে । লেখা ছাড়াও বাড়িতে শিশুদের কবিতার পাঠ দেন সজল ।

লেখক হিসাবে যাত্রা শুরু সজলের
সজল সাঁতরা বলেন, "ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ই স্কুল ম্যাগাজিনে লেখা ছাপা হয় আমার । সেখান থেকেই শিক্ষকদের কাছে উৎসাহ পাই । বাবা মারা যাওয়ার পর বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় বড় হয়ে উঠেছি । একটু বড় হতেই সবজি বাজার থেকে কম্পিউটার সেন্টারের হ্যান্ডবিল লাগানো, সব কিছুই করেছি পড়াশোনা চলাকালীন । লেখা লিখি থেকেই সাহিত্য জগতে পা দিই । পড়াশোনা চলাকালীনই লেখা ছাপানোর জন্য বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা পাঠাতে থাকি । আসতে আসতে সাহিত্য জগতের মানুষের সঙ্গে পরিচিতি বাড়ে । লেখার মান অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় আমার লেখা প্রকাশিত হয় ।"
তিনি আরও বলেন, "কলকাতার বিদ্যাসাগর মেট্রোপলিটন কলেজ ও শিয়ালদার কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হল ও নন্দনের মতো বিভিন্ন জায়গায় সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়ে অনুষ্ঠান করেছি । সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য শিলিগুড়ি ও কোচবিহারে গিয়েছি । সংসারে অভাব অনটনের জন্যই বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি 2013 সালে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে ধনিয়াখালি থানায় যুক্ত হই । আইনশৃঙ্খলা সামলানোর পাশাপাশি যখনই সময় পাই কাজের ফাঁকে লেখালেখি করি।"

সজলের পুরস্কার প্রাপ্তি
তাঁর কথায়, "2026 সালে শিলিগুড়ি বিশ্ব সাহিত্য মহাসম্মেলনে 27টা দেশের 3 হাজার কবি সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করেন । সেখানে আমাকে স্বর্ণপদকে সম্মানিত করা হয় কবিতার জন্য । সরকারি তরফে 2025 সালে দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হয় । 2024 সালে অসমের করিমগঞ্জে বিশ্বমানব ধর্ম বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সার্ক সাহিত্য পত্রিকার উদ্যোগে সাহিত্য অনুষ্ঠান হয়েছিল । সেখানে আমার লেখা 'মূল্যহীন' ও 'বাস্তব' দুটি কবিতা নির্বাচিত হয় । সেখানে আমি স্বর্ণপদকের জন্য নির্বাচিত হই । কিন্তু কাজের জন্য সেখানে আমি যেতে পারিনি ।"

সজলের সংযোজন, "এ বছর 30 অগস্ট বিদ্যাসাগর মেট্রোপলিটন কলেজ ও বঙ্গভূমি সাহিত্য পত্রিকার উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ লোকসংস্কৃতি গবেষণা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় ৷ সেখানে আমাকে সেই পদক তুলে দেওয়া হয় । সেই সঙ্গে কলেজ ও বঙ্গভূমি সাহিত্য পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে আমাকে কাব্য তীর্থ উপাধিতে সম্মানিত করা হয় । চলতি বছরের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য নেপালে যাব ।"

কী বই প্রকাশ পেয়েছে সজলের ?
সিভিক ভলান্টিয়ার বলেন, "2025 সালে আমার নিজেস্ব লেখা 'স্বপ্নের ফেরিওয়ালা' নামে একটি বই প্রকাশিত হয় । এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা 'বাংলা আমার' । এই কবিতা নিয়ে বাংলাদেশে একটি গানও প্রকাশ পেয়েছে । এই সম্মানে আমার লেখার উৎসাহ বাড়ে । আমার 400টি লেখা কবিতা তৈরি রয়েছে । সেই কবিতা নিয়ে বই প্রকাশের ইচ্ছে আছে । এখনও তিনটি বইয়ের কাজ চলছে ।"

সজলের আশা, "সংসার সামলে বই প্রকাশের টাকা জোগাড় করা খুবই চাপ হয়ে যায় । একটি বই ছাপাতে 5 হাজার টাকা খরচ । আমি চাই আমার লেখা প্রকাশিত হোক । মোবাইলের দৌরত্বে বই পড়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে মানুষের মধ্যে । লাইবেরিগুলো সচল হলে মানুষের পড়ার মানসিকতা বাড়ুক । সামাজিক মাধ্যমে একটি চ্যানেল করেছি । সেখানেও আমার কবিতা পাঠ করে জনপ্রিয়তা পেয়েছি । কিন্তু সময়ের অভাবে একটু পিছিয়ে গিয়েছি । কিন্তু চাই, ভালো কবিতা লিখে যেতে ।"

পুলিশের বাহবা সজলকে
হুগলি জেলার গ্ৰামীণ পুলিশ সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিং বলেন, "ধনিয়াখালির থানার একজন সিভিক ভলান্টিয়ার সজল সাঁতরা । দক্ষতার সঙ্গেই নিজের দায়িত্ব পালন করেন তিনি । সাহিত্য রচনা তার ব্যক্তিগত বিষয়, আমরা তার প্রশংসা করি ।"
হুগলি গ্রামীণ পুলিশের এক আধিকারিকের কথায়, "সিভিক সজল সাঁতরা কাজ করার সঙ্গে কবিতা লিখে একাধিক জায়গায় পুরস্কৃত হয়েছে । একটি বই প্রকাশিত হয়েছে । হুগলি গ্রামীণ পুলিশের তরফে কয়েকদিন পরে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে ।"

