সরকারের বিরুদ্ধে 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা'র অভিযোগ, সিনিয়র রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত অনিকেতের
কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ থেকে ডিভিশন বেঞ্চ, শেষে সুপ্রিম কোর্টও তাঁর পক্ষে রায় দিলেও, বাস্তবে তা রূপায়িত হয়নি ৷ তাই সরছেন চিকিৎসক অনিকেত ৷

Published : January 2, 2026 at 7:29 PM IST
কলকাতা, 2 জানুয়ারি: সরকারের অধীনে কাজ করবেন না ৷ তাই এবার সিনিয়র রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো ৷ এর জন্য সরকারকে যে বিপুল জরিমানা দিতে হবে, তার জন্য সাধারণ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে আবেদন করলেন তিনি ৷
শুক্রবার সাংবাদিকদের তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান অনিকেত ৷ গতকাল তিনি ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টে'র (WBJDF) ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ৷ এর 48 ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা চিঠি দিল জুনিয়র চিকিৎসকদের সংগঠন ৷ তারা অনিকেতের পদত্যাগের কড়া সমালোচনা করার পাশাপাশি আলোচনার পথ খোলা আছে বলে জানিয়েছে ৷
সিনিয়র রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে অনিকেতের বক্তব্য, "আমার পোস্টিং রায়গঞ্জে করা হয়েছিল ৷ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে রাজ্য সরকার এই ধরনের পদক্ষেপ করেছে ৷ হাইকোর্টের পর সুপ্রিম কোর্টের রায় এসেছে আমাকে আরজি কর হাসপাতালে পোস্টিং দিতে হবে ৷ এখনও আমি পোস্টিং পাইনি ৷ তাই আমার সিনিয়র রেসিডেনশিপ পদ থেকে পদত্যাগ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৷"
গত বছরের 24 সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর সিঙ্গল বেঞ্চ এই মামলায় অনিকেতকে অবিলম্বে আরজি কর হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়ার জন্য রাজ্যকে নির্দেশ দেয় ৷ এই নির্দেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার ৷ 6 নভেম্বর সেখানেও সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রাখে আদালত ৷ এরপর হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য ৷ দেশের শীর্ষ আদালত গত 11 ডিসেম্বর অনিকেত মাহাতোকে আরজি কর হাসপাতালে পোস্টিংয়ের নির্দেশ দেয় ৷ এরপর দু'সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো আরজি কর হাসপাতালে পোস্টিং পাননি ৷ গত 24 ডিসেম্বর স্বাস্থ্য ভবনে গিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও তাঁরা অনিকেতের সঙ্গে দেখা করেননি ৷
এই আবহে অনিকেত আশঙ্কা করছেন, এই পোস্টিং পেলেও সরকারের তরফে তাঁর উপর একটা চাপ সৃষ্টি করা হবে ৷ এমডি ডিগ্রি করার পর নিয়ম অনুযায়ী সব সরকারি চিকিৎসকদের সরকারি হাসপাতালে তিন বছরের জন্য সিনিয়র রেসিডেন্ট হিসাবে কাজ করতে হয় ৷ যদি কেউ নিজে থেকে এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান, তাহলে তাঁকে রাজ্য সরকারকে একটি আর্থিক জরিমানা দিতে হয় ৷ যার মূল্য প্রায় 30 লক্ষ টাকা ৷
এই বিপুল অর্থ জোগাড়ের জন্য এবার সাধারণ শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েছেন চিকিৎসক অনিকেত ৷ তিনি বলেন, "আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ৷ কেউ যদি মনে করেন দেবেন না, তাহলে আমি তাঁর থেকে জোর করে আদায় করব না ৷"
এদিকে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে পদত্যাগ করার 48 ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা চিঠি দিল জুনিয়র চিকিৎসকদের সংগঠন ৷ চিঠিতে বলা হয়েছে, "আমরা যারা অভয়ার ন্যায়বিচার চেয়ে আর তাঁর এই নির্মম পরিণতির জন্য দায়ী শাসকের মদতে কলেজে কলেজে তৈরি হওয়া 'থ্রেট কালচার'-এর বিষবাষ্পকে উপড়ে ফেলতে পথে নেমেছিলাম, তারা সবাই আপনার এই হঠকারী, ব্যক্তিস্বার্থসর্বস্ব ও অবিবেচক সিদ্ধান্তে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত ৷"
তবে এখনও আলোচনার পথ খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠন ৷ ফ্রন্ট চিঠিতে জানিয়েছে, "এই প্রত্যেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আমাদের সংগঠনের দীর্ঘকালীন পথচলার জন্য এই মূলগত বিষয়গুলিতে আমাদের সহমতে আসতেই হবে ৷ তারপরে তো সমস্তরকম আলোচনা ও তর্কবিতর্কের পরিসর খোলাই রয়েছে ৷"
গতকালের চিঠিতে অনিকেত অভিযোগ করেছিল, "রাজ্য সরকার যখন প্রতিহিংসামূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার (অনিকেত মাহাতো), দেবাশিস হালদার ও আসফাকুল্লা নাইয়া-এই তিন জনের পোস্টিং বেআইনিভাবে পরিবর্তন করে দিল, তখন দু'জন জয়েন করে গেলেও প্রতিবাদস্বরূপ আমি পরিবর্তিত জায়গায় জয়েন না-করে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ৷"
এই অভিযোগের ভিত্তিতে জুনিয়র চিকিৎসকরা জানান, "এই বাক্যটি সর্বৈব মিথ্যা ও অসৎ ৷ আপনার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাঙ্খিত ও মেধার ভিত্তিতে অর্জিত জায়গা থেকে বহু দূরে পোস্টিং পেয়েও "এই বিপ্লবী ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চায় না" এই মিথ্যা ন্যারেটিভকে ভাঙার জন্য নেওয়া সম্মিলিত সিদ্ধান্ত তো আপনার অজানা নয় ৷ তাঁদের আইনি লড়াইকে যেমন আপনি উহ্য রেখেছেন, তাঁদের প্রতিবাদকে আপনি সরকারের সঙ্গে আপস বলেছেন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে বিকৃতভাবে প্রকাশ করে ব্যক্তি গরিমার প্রচারের কাজে ব্যবহার করেছেন ৷ জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য ছাড়া আমরা এই কথাগুলির অন্য কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না ৷ আপনাকে এই কথাগুলির স্পষ্ট কারণ দর্শাতে হবে, অন্যথায় ক্ষমা চাইতে হবে ৷"
এই প্রসঙ্গে অনিকেত মাহাতো বলেন, "wbjdf-এর মধ্যে আমার মত আমি বহুবার জানিয়েছি ৷ নতুন করে আর কিছু জানাতে হবে বলে মার মনে হয় না ৷ এমনকী আমার পদত্যাগ পত্র পাঠানোর আগে পর্যন্ত আমি বহুবার বলেছি । কমিটি তৈরি নিয়ে আমারও সহমত ছিল প্রথমে ৷ অভয়ার ন্যায়বিচারে লড়াই যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের সত্যিকারের প্রতিনিধিরা আসুন ৷"

