এক সপ্তাহে 10 ভূমিকম্প, সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গ নিয়ে উদ্বেগে গবেষক-পরিবেশবিদরা
ভূমিকম্পর প্রবণতা বাড়বে বলেই মনে করছেন গবেষকরা৷ ভূমিকম্প হলে কী করা উচিত, সেই পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা

Published : February 28, 2026 at 5:59 PM IST
শুভদীপ রায় নন্দী
শিলিগুড়ি, 28 ফেব্রুয়ারি: পাহাড়ে পর পর ভূমিকম্প। একপ্রকার আতঙ্কে রয়েছে হিমালয়ের কোলে থাকা দার্জিলিং, কালিম্পং জেলার পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্য সিকিম। তার সঙ্গে কেঁপে উঠেছে উত্তরবঙ্গও। ঘন ঘন এই ভূমিকম্পের জেরে উদ্বেগে পরিবেশবিদ থেকে প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (NCS)-এর তথ্যানুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সিকিমও উত্তরবঙ্গে ভূমিকম্পের মাত্রা ও সংখ্যায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। গত সাতদিনে সিকিম-সহ উত্তরবঙ্গে দশটিরও বেশি ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে গত 20 দিনের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা 50 ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিগত 24-48 ঘণ্টায় অর্থাৎ 26-27 ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিকিমে একাধিক ভূমিকম্প হয়েছে।

এর মধ্যে 26 ফেব্রুয়ারি সকাল 11টা 34 মিনিটে সিকিমের গিয়ালশিং জেলায় 4.6 মাত্রার একটি শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। এরপর ওই দিনই দুপুর 12টা 17 মিনিটে মঙ্গন জেলায় 3.5 মাত্রার আরও একটি কম্পন অনুভূত হয়। 27 ফেব্রুয়ারি ভোরে গ্যাংটকের কাছে 4.3 ও 3.3 মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে দু’টি ভূমিকম্প অনূভুত হয়েছে। সিকিমে সৃষ্ট এই ভূমিকম্পগুলোর প্রভাব সরাসরি পড়েছে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়িতে।
গত 26 ফেব্রুয়ারি উত্তরবঙ্গে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দু’বার কম্পন অনুভূত হওয়ায় পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। সিকিম স্টেট রিলিফ কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, 9 ফেব্রুয়ারি থেকে 27 ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিকিম এবং তৎসংলগ্ন নেপাল-ভুটান সীমান্তে মোট 57টি ভূমিকম্প হয়েছে, যার মধ্যে 41টিরই উৎসস্থল ছিল সিকিম। আর এই তথ্যের পরই আরও বেশি উদ্বেগে সিকিমের প্রশাসনিকমহল। যদিও প্রাথমিকভাবে ভূতত্ত্ববিদদের মতে, হিমালয়ের ওই অঞ্চলটি ইন্ডিয়ান এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় অত্যন্ত সিসমিক অ্যাক্টিভ এবং এখানে তিস্তা ফল্ট লাইনের সক্রিয়তাই ঘন ঘন কম্পনের মূল কারণ।

এই বিষয়ে সিকিমের ত্রাণ এবং ভূমি রাজস্ব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের আধিকারিক রিনজিং চেওয়াং ভুটিয়া বলেন, "হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্প একটি সাধারণ ঘটনা। এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটি অনুভূত হয়েছে গত বৃহস্পতিবার গিয়ালশিং-এ, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে 4.6।"
তিনি জানান, ভূমিকম্পের সময় জনগণকে শান্ত থাকার এবং ভূমিকম্পের সময় 'ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড' (নিচু হয়ে বসা, মাথা ঢাকা ও শক্ত কিছু ধরে রাখা) প্রোটোকল মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি পরামর্শ দেন যে, ঘরের ভেতরে থাকলে মজবুত আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিতে হবে, মাথা রক্ষা করতে হবে এবং কম্পন না-থামা পর্যন্ত সেটি ধরে রাখতে হবে। এরপর দ্রুত ভবন, গাছ এবং বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে খোলা জায়গায় চলে যেতে হবে।
পাশাপাশি সম্ভব হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন তিনি এবং কোনও প্রকার যাচাই না-করা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়ে পরিবারের সদস্যদের আগেভাগেই নিরাপদ স্থান এবং বেরোনোর পথ চিহ্নিত করে রাখার কথা বলেন। ওপর থেকে পড় বস্তু বড় বিপদের কারণ হতে পারে, তাই আলগা আসবাবপত্র আটকে রাখা এবং মাথার ওপরে ভারী বস্তু না-রাখার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি জানান, 9 ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষা দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুলগুলিতে ভূমিকম্পের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। নিয়মিত মক ড্রিল চালানো হচ্ছে। শিক্ষকদের নোডাল অফিসার করে স্কুলগুলিতে 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ক্লাব' গঠন করা হচ্ছে এবং সুরক্ষা নির্দেশিকা বই বিলি করা হয়েছে। গ্রামস্তরে প্রস্তুতির জন্য এসএসডিএমএ (SSDMA) এবং জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (DDMA) নিরন্তর সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও এই ভূমিকম্পের মাত্রা বৃদ্ধি হওয়াকে ভালো চোখে দেখছেন না উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক রঞ্জন রায়৷ তিনি বলেন, "এর আগেই ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড একটি সার্ভেতে জানিয়েছে যে সিকিম-সহ দার্জিলিং, কালিম্পং জেলা সিসমিক জোন-4 থেকে সিসমিক জোন-6 এ গিয়েছে। অর্থাৎ অতি ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে গিয়েছে। একদিকে, ইউরেশিয়ান ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সক্রিয়তা বৃদ্ধি৷ অন্যদিকে, পাহাড়ে ক্রমাগত অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ, তিস্তার জল আটকে ড্যাম তৈরি করা, এসব আরও বেশি ভূমিকম্পের প্রবণতাকে বৃদ্ধি করছে। আর এই প্রবণতা আরও বাড়বে বলে মনে করছি।"

আরেক গবেষক তথা অধ্যাপক দেবাশিস চক্রবর্তী বলেন, "হিমালয় একটি নতুন শিলাস্তরের পর্বতমালা ও খুবই ভঙ্গুর প্রকৃতির। যে কারণে ভূমিকম্প হলে একটা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর যে পর্যায়ে এখন প্লেটগুলো রয়েছে তাতে ভূমিকম্পের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।"
শিলিগুড়ি কলেজের ভূগোলের অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায় বলেন, "যেভাবে উন্নয়নের নামে পাহাড়ে ক্রমাগত একের পর এক নির্মাণ হচ্ছে এতে ভূমিকম্পর প্রবণতা আরও বেশি বাড়ছে। পাহাড় কেটে রাস্তা, টানেল, তিস্তার নদীর জল আটকে ড্যাম আরও বেশি সক্রিয় করছে ভূমিকম্পর প্রবণতাকে।"

