আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন গঙ্গা ভাঙন উদ্বাস্তুরা, ভোট বয়কটেরও ঘোষণা
মালদার রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের ঘটনা৷ বারবার বঞ্চনার শিকার হওয়া মানুষই এবার প্রতিবাদে সরব৷

Published : February 27, 2026 at 9:37 PM IST
পার্থ দাস
মালদা, 27 ফেব্রুয়ারি: শুধুই হয়ে যাবে আর করে দেব৷ প্রতিশ্রুতি এভাবেই আসে৷ খানিক পর ভেসেও যায়৷ ঠিক যেভাবে গঙ্গার ভেসে গিয়েছিল তাঁদের বাড়িঘর, ঘরে থাকা যাবতীয় সম্পদ, কৃষিজমি থেকে শুরু করে সবকিছু৷ গঙ্গা শুধু তাঁদের সবকিছু ছিনিয়েই নেয়নি, ছিনিয়ে নিয়েছে তাঁদের অস্তিত্বও৷ সব হারিয়ে তাঁরা ঠাঁই নিয়েছিলেন উঁচু বাঁধের নীচে৷ শুরু থেকে নেতা-মন্ত্রীরা বলে এসেছেন, তাঁদের জন্য পুনর্বাসনের জায়গা তাঁরা করে দিচ্ছেন৷ একই কথা বলে এসেছেন প্রশাসনিক কর্তারাও৷ কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁদের সেই জায়গা মেলেনি৷ বঞ্চনার ধাক্কা ধীরে ধীরে কঠোর করে তুলেছে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এই ভাঙন দুর্গতদের৷ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পুনর্বাসনের দাবিতে তাঁরা এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন৷ তাতেও কাজ না হলে এবার তাঁরা ভোটই দেবেন না৷ নিজেদের দাবিতে এদিন বিক্ষোভও দেখান ভাঙন দুর্গতরা৷
ঘটনাটি মালদার রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের৷ ফি বছর গঙ্গা ভাঙনে দফারফা এই ব্লকের৷ মহানন্দটোলা ও বিলাইমারির বেশিরভাগ গ্রামই এখন গঙ্গাগর্ভে৷ প্রতি বছর নতুন নতুন গ্রামে আগ্রাসন চালায় গঙ্গা৷ ঘর হারিয়ে মানুষজন ছিটকে যান দেশের নানা প্রান্তে৷ তবে শ’চারেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় বলরামপুর বাঁধের নীচে৷ সেখানে অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করেই চলছে তাঁদের দিন গুজরান৷
বলরামপুর বাঁধের ধারে আশ্রয় নেওয়া একসময় কান্তটোলা গ্রামের বাসিন্দা হেমন্ত মণ্ডল বলছেন, “15 বছর আগে গঙ্গা ঝাড়খণ্ড পাহাড়ের পাশে ছিল৷ সেখান থেকে নদী পাড় কাটা শুরু করে৷ প্রথমেই জঞ্জালিটোলা গ্রামকে গিলে নেয় গঙ্গা৷ আমাদের বিধায়ক (সমর মুখোপাধ্যায়) প্রতিশ্রুতি দিতেন, তাঁরা গঙ্গার ব্যবস্থা নিচ্ছেন৷ অনেক লোক পাঠিয়ে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিতেন৷ কিন্তু জঞ্জালিটোলায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি৷ তারপর গঙ্গা পাড় কাটতে কাটতে মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি অঞ্চলের অনেক গ্রাম গিলে নিয়েছে৷’’
তাঁর অভিযোগ, ‘‘দিদি কিছু আবাসের ব্যবস্থা করলেন৷ কিন্তু আমাদের মুলিরামটোলা বুথের তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য কিরণশংকর মণ্ডল তাঁর ঘনিষ্ঠ একেকজনের নামে 4-5টি করে আবাস যোজনার ঘর বরাদ্দ করে টাকা তুলে নিলেন৷ তিনি আমাদের দিকে ফিরেও চাননি৷ আমরা প্রায় চারশো লোক এখন বলরামপুর বাঁধে বসবাস করছি৷ বাকিরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছে৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘পুনর্বাসনের জন্য আমরা প্রথমে বিধায়ককে বলি৷ তিনি বিডিওকে বিষয়টি দেখতে বলেন৷ আমরা বিডিওর কাছে গেলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি দেখছেন৷ পরে আমরা মহকুমাশাসক থেকে শুরু করে জেলাশাসকের কাছে গিয়েছি৷ কিন্তু কেউ কিছু করেননি৷ এবার আমরা পুনর্বাসনের জন্য কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছি৷ তাতেও কাজ না হলে এবার আমরা কেউ ভোট দেব না৷ ভোট বয়কট করব৷”

একই বক্তব্য মুলিরামটোলার আরেক বাসিন্দা চিন্ময় মণ্ডলের৷ তিনি বলেন, “গঙ্গা ভাঙনে সব হারিয়ে আমরা এই বাঁধে এসেছি৷ অথচ আমাদের দিকে কেউ ফিরে তাকায় না৷ আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে৷ আগামীতে যদি আমরা নিজেদের নায্য পাওনা না-পাই, তবে আমরা ভোট বয়কট করব৷ শুধু তাই নয়, নিজেদের দাবি আদায়ে আমরা কলকাতা হাইকোর্ট এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷”

একসময় জঞ্জালিটোলায় বাড়ি-জমি সব ছিল নিতাই মণ্ডলের৷ তিনিও এখন বাঁধের আশ্রয়ে৷ তিনি বলেন, “নিজের 54 বছরের জীবনে গঙ্গাকে অন্তত সাত কিলোমিটার ভিতরে চলে আসতে দেখলাম৷ 2007-08 সালে আমার বাড়ি গঙ্গায় চলে গিয়েছে৷ তারপর এখানে আশ্রয় নিয়েছি৷ প্রতি বছর গঙ্গা পাড় কাটতে কাটতে ভিতরে চলে আসছে৷ অথচ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না৷ এখানে অনেক সর্বহারা মানুষ আশ্রয় নিয়েছে৷ ভোটের সময় নেতা-মন্ত্রীরা আসে৷ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে চলে যায়৷ কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না৷ এভাবেই চলছে আমাদের জীবন৷”

আগে বঙ্কুটোলায় বাড়ি ছিল মনা ঘোষের৷ এখন তাঁর ঠিকানা বলরামপুর বাঁধ৷ তাঁর কথায়, “আমাদের বাড়িঘর, জমি-জায়গা সব নদীতে কেটে গিয়েছে৷ এখন বাঁধের ধারে ঘর বেঁধে থাকছি৷ সরকারি কোনও সাহায্য আমরা পাই না৷ ভোট আসলে ওঁরা হাত জোড় করে ভোট নিয়ে চলে যান৷ আর কিছু হয় না৷ আমরা বহুবার বিধায়কের কাছে গিয়েছি৷ তিনি শুধু আশ্বাস দেন সব হয়ে যাবে৷ আমরা তাঁর সান্ত্বনা শুনে চলে আসি৷ আর কিছু হয় না৷ প্রশাসনের সব জায়গায় আমরা নিজেদের আর্জি জানিয়েছি৷ কিন্তু কিছু হয়নি৷ এবার ঠিক করেছি, প্রশাসনিক সহযোগিতা না পেলে এবার আমরা কেউ ভোট দিতে যাব না৷”

এই নিয়ে এলাকার বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়ের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি৷ বারবার ফোন করা হলেও ফোন ধরেননি তিনি৷ তবে রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের বিডিও সুব্রত বল বলেন, “ওই এলাকার গৃহহীনদের সরকারি ঘরের জন্য একটি নামের তালিকা মহকুমাশাসকের দফতর থেকে জেলায় পাঠানো হয়েছে৷ তার অনুমোদন পাওয়া গেলেই কাজ শুরু করা হবে৷ ভাঙন দুর্গত মানুষদের পুনর্বাসন দিকে আমরা ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিককে পাট্টা দেওয়ার জন্য জমি খুঁজতে বলেছি৷ জমি চিহ্নিতকরণ হয়ে গেলে কিছু পাট্টা দেওয়া হবে৷”

