চাষিদের মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার উপকারিতা শেখাচ্ছে কবিগুরুর শ্রীনিকেতন
মাটির সঠিক পুষ্টি উপাদান ছাড়া ফসল ভালোভাবে বাড়তে পারে না। কৃষির উৎকর্যতায় মাটি কতটা উর্বর, কোথায় অভাব রয়েছে তা জানাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রীনিকেতন ৷

Published : January 7, 2026 at 4:02 PM IST
অভিষেক দত্ত রায়
বোলপুর, 7 জানুয়ারি: মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চাষ করার জন্য চাষিদের উৎসাহিত করছে বিশ্বভারতী ৷ কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার অন্তর্গত বীরভূম জেলার 19টি ব্লকের লক্ষাধিক চাষি বিশ্বভারতীর মৃত্তিকা বিজ্ঞান ও কৃষি রসায়ন বিভাগের দ্বারা উপকৃত। 12টি পদ্ধতিতে মাটির 17টি উপাদান উন্নতমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে পরীক্ষা করছেন অধ্যাপক থেকে পড়ুয়ারা ৷ মিলছে 'সয়েল হেলথ সার্টিফিকেট'।
মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চাষ করলে সুষম ফসল উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি বছরের পর বছর ওই মাটিতে চাষ করা যায় ৷ মূলত এগুলোই চাষিদের বোঝাচ্ছে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রীনিকেতন ৷ গ্রামবাংলাকে কৃষিকাজে সমৃদ্ধ করতে বিশ্বভারতীর কাছেই শ্রীনিকেতন গড়ে তোলেন রবীন্দ্রনাথ ৷
মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষায় গবষকরা
বিশ্বভারতীর মৃত্তিকা বিজ্ঞান ও কৃষি রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গৌতম ঘোষ বলেন, "আমরা সুদীর্ঘ কাল ধরে চাষিদের মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চলেছি ৷ মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রত্যেক চাষির উচিত ৷ তাতে ফলন ভালো হয় এবং মাটির স্বাস্থ্যও ভালো থাকে ৷ একই জমিতে বছরের পর বছর চাষ করা যায় ৷ আমাদের ল্যাবে সবরকম ব্যবস্থা আছে ৷ 12 রকম পদ্ধতিতে খুব যত্ন নিয়ে পরীক্ষা করা হয় ৷ এতে উপকৃত হন বহু চাষি।"

'মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্ড'
মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বীরভূম জেলার চাষিদের ভরসা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতন। জেলার 19টি ব্লকের চাষিরা নিজ নিজ জমির মাটি সংগ্রহ করে পশ্চিমবঙ্গ কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বভারতীতে পাঠায় ৷ কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের প্রকল্প রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনার অন্তর্গত 'মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্ড'। জেলার লক্ষাধিক চাষিকে প্রতি বছর সেই কার্ড দেয় বিশ্বভারতীর শ্রীনিকেতন। 12টি পদ্ধতিতে উন্নত মানের যন্ত্রাংশ দিয়ে মাটির 17টি উপাদান পরীক্ষা করা হয় ৷

কীভাবে মাটি সংগ্রহ করতে হয় ?
কোদাল বা খুরপি দিয়ে জমি থেকে ত্রিকোণভাবে কেটে মাটি সংগ্রহ করতে হয় ৷ তবে ভিন্ন ভিন্ন চাষের ক্ষেত্রে মাটি সংগ্রহ করার পদ্ধতি ভিন্ন ৷ যেমন-ধান, সর্ষে, ডাল, আলু, পেয়াজ, মটরশুঁটি, লঙ্কা, বেগুন প্রভৃতি চাষের ক্ষেত্রে 6 ইঞ্জি গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করতে হয় ৷ আর পেয়ারা, আম, ন্যাসপাতি, চেরি, কলা প্রভৃতি ফল চাষের ক্ষেত্রে জমির কমপক্ষে 1 মিটার গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করতে হয়।

মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুবিধা কী ?
মাটিতে কী কী ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, জীবাণু রয়েছে সে সব জানা যায় ৷ এগুলি চাষের উপকারি, নাকি অপকারী, তাও পরীক্ষার মাধ্যমে উঠে আসে ৷ একই সঙ্গে জানা যায় মাটি কতটা উর্বর ৷ মাটিতে কী কী সার, কত পরিমাণ দিতে হবে তা নির্ধারণ করা যায় পরীক্ষার মাধ্যমে ৷ এতে চাষিদের সুবিধা হয় ৷ বছরের পর বছর মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং সুষম ফসল উৎপাদিত হয় ৷ ফসল উৎপাদনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায় ৷

কীভাবে ও কী কী মাটির উপাদান পরীক্ষা করা হয় ?
মাটির 17টি উপাদান পরীক্ষা করা হয়। বিশ্বভারতীর মৃত্তিকা বিজ্ঞান ও কৃষি রসায়ন বিভাগের মাটি পরীক্ষাগারে 12টি পদ্ধতি মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় ৷ গাছের প্রধান 6টি উপাদান হল- কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম। দ্বিতীয় 3টি খাদ্য উপাদান হল-ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার। আর গাছের অনু খাদ্য উপাদানগুলি হল- জিঙ্ক, কপার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, বোরন, মলিবডেনাম, নিকেল, ক্লোরিন। এই সবগুলি ধাপে ধাপে পরীক্ষা করে চাষিদের 'সয়েল হেলথ কার্ড' দেয় বিশ্বভারতী।

পরীক্ষা করেন বিশ্বভারতী অধ্যাপক, গবেষণারত পড়ুয়ারা
গবেষণারত ছাত্রী বহ্নিশিখা রায় বলেন, "আমরা এখানে মাটিকে 12টি প্যারামিটারে দেখে থাকি। প্রথমে সয়েল স্যাম্পেল ওজন করি ৷ তারপর মার্ক করে নিয়ে পরীক্ষা শুরু হয় ৷ প্রত্যেকটি ধাপে পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদা ইনস্ট্রুমেন্ট আছে ৷ সেগুলো দিয়েই পরীক্ষা করি। স্যররা সবরকমভাবে সহযোগিতা করেন।"

শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা
প্রসঙ্গত, শ্রীনিকেতন হল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পল্লী পুনর্গঠন ভাবনার বাস্তব রূপ। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন যে, কেবল নগরকেন্দ্রিক বা পুঁথিগত শিক্ষা দিয়ে ভারতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভারতের প্রাণ গ্রামে, আর সেই গ্রামকে স্বনির্ভর ও সচেতন না-করতে পারলে দেশের সার্বিক অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ৷ এই থেকেই শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার ভাবনা জন্ম নেয়। 1913 সালে রবীন্দ্রনাথ বীরভূম জেলার সুরুল গ্রাম সংলগ্ন একটি জমিদারি এলাকা কুঠিবাড়ি ক্রয় করেন। প্রাথমিকভাবে সেখানে গ্রামীণ উন্নয়ন সংক্রান্ত কিছু পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়।

রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত পঠনপাঠনে উজ্জীবিত করেন বাবাকে ৷ এই উদ্যোগকে সুসংগঠিত রূপ দিতে 1922 সালের 6 ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে 'শ্রীনিকেতন' বা ইনস্টিটিউট অফ রুরাল রিসার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ইংরেজ কৃষিবিদ ও সমাজকর্মী লিওনার্ড এলমহার্স্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, শ্রীনিকেতন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি গ্রাম বাংলার বেঁচে থাকার রসদ। আজও শ্রীনিকেতন ভারতের গ্রামীণ উন্নয়ন ও বিকল্প শিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

