শাহজাহান-মামলার সাক্ষীকে ধাওয়া করা গাড়ির ফুটেজ সিসিটিভিতে, বাড়ছে রহস্য !
ভোলানাথের গাড়িকে অনুসরণ করা 'সন্দেহজনক' ইকো গাড়ির ছুটে পালানোর দৃশ্য ধরা পড়ল সিসিটিভি-তে।দু'দিন ধরেও খোঁজ নেই আলিম ও নজরুলের ।

Published : December 12, 2025 at 7:39 PM IST
বসিরহাট, 12 ডিসেম্বর: শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়ি দুর্ঘটনায় পরতে পরতে রহস্য ! তদন্ত যতই এগোচ্ছে ততই একের পর এক 'রহস্য' সামনে আসতে শুরু করেছে । দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ভোলানাথ ঘোষ ঘটনার পরেই দাবি করেছিলেন, সরবেড়িয়া থেকে একটি গাড়ি দূর থেকে ফলো করছিল তাঁকে । তাঁর গাড়ির পিছু নেওয়া সেই 'সন্দেহজনক' গাড়িটির সেদিনের গতিবিধি এবার চলে এল পুলিশের নজরদারিতে ৷
দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই একটি পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি ক্যামেরায় বন্দি হয়েছে গাড়িটির ফুটেজ । সিসিটিভিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, একটি নীল রঙের ইকো গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলে যাচ্ছে বয়ারমারি বাজারের দিকে । এই গাড়িটি ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে রহস্য ।

পুলিশের সন্দেহ, ওই ইকো গাড়িটিই সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষের গাড়ির থেকে 200 মিটার দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করছিল । বয়ারমারি বাজারের কাছে গাড়িটি দিক পরিবর্তন করে অন্য দিকে চলে যায় । আর তাতেই সন্দেহ আরও দানা বেঁধেছে তদন্তকারীদের । ইতিমধ্যে ওই ইকো গাড়িটির সম্পর্কে বিশদে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে পুলিশ সূত্রে ।

প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, ভোলানাথের গাড়িটির পিছু নেওয়া ওই ইকো গাড়িটির চালক সম্ভবত তথ্য আদান-প্রদান করছিল ঘাতক ট্রাকের চালক আবদুল আলিম মোল্লার কাছে । শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়ি কোন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, কতদূর এগিয়েছে সেই বিষয়টিও নজরে রাখছিল সে । বয়ারমারি-কলুপাড়ার মাঝে বাসন্তী হাইওয়েতে সাক্ষীর গাড়ির সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার ঠিক আগেই ইকো গাড়িটি দিক পরিবর্তন করে অন্যদিকে চলে যায় । সিসিটিভি-তে সেই গাড়িটির দ্রুত বেগে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যই ধরা পড়েছে 400 মিটার দূরের একটি পেট্রল পাম্পে ।

এদিকে, ন্যাজাট-কাণ্ডে পারমিট 'ফেল' করা ঘাতক ট্রাকের সম্পর্কে আরও চঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে । জানা যাচ্ছে, ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আগে পর্যন্ত সরবেড়িয়ার মল্লিকপাড়া মোড়ে স্থানীয় একটি গ্যারেজ ও লাগোয়া পার্কিংয়ে ট্রাকটি রাখা ছিল গত 23 দিন ধরে । টানা 15 দিন রাখার পর পার্কিংয়ের টাকা বাঁচাতে পাশের একটি গ্যারেজে ট্রাকের যন্ত্রাংশ মেরামতের নামে রাখা হয়েছিল বাকি আটদিন । যদিও গ্যারেজ কর্মীদের দাবি, এই আটদিনে কোনও মেরামতের কাজ করা হয়নি ট্রাকটির ।

রহস্যজনক দুর্ঘটনায় নাম জড়িয়ে যাওয়া আরেক অভিযুক্ত নজরুল মোল্লাই ট্রাকটি গ্যারেজে রেখেছিলেন বলেও দাবি করেছেন গ্যারেজ কর্মীরা ।ঘটনার দিন সকালে হঠাৎই গ্যারেজ থেকে ট্রাকটি উধাও হয়ে যায় বলে অভিযোগ । তাহলে কী ছক কষে আগে থেকেই গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে রাখা ছিল ট্রাকটি ? পরিকল্পনা করেই কী ঘটনার দিন সকালে কাউকে কিছু না-বলে গ্যারেজ থেকে উধাও হয়ে গেল সেই ট্রাক ? এমনই সব প্রশ্নের মধ্যেই 'ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব' আরও জোরালো হতে শুরু করেছে ।

তবে, ন্যাজাট-কাণ্ডে যার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, সেই ঘাতক ট্রাকের চালক আবদুল আলিম মোল্লা দু'দিন পরেও অধরা । এখনও খোঁজ মেলেনি আরেক অভিযুক্ত নজরুল মোল্লারও । দুর্ঘটনার পরে যাঁর বাইকে চেপে আলিম মোল্লা পালিয়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ । কেন এখনও তাঁদের ধরা গেল না ? কোথায় গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন আলিম এবং নজরুল ? তার কোনও স্পষ্ট জবাব নেই পুলিশ প্রশাসনের কাছে ।
নাম-প্রকাশে অনিচ্ছুক বসিরহাট জেলার এক পুলিশ কর্তা বলেন, "বাসন্তী হাইওয়ের আট কিলোমিটারের মধ্যে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে । পলাতক দুই অভিযুক্তের হদিশ পেতে শুরু হয়েছে সার্চ অপারেশন । তদন্তের স্বার্থে এখনই সবকিছু প্রকাশ্যে আনা সম্ভব নয় ।"

অন্যদিকে, ন্যাজাট থানার অন্তর্গত রাজবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষ যে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন, তাতে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন পূর্ব পরিকল্পিত খুনের চক্রান্তের কথা । ভোলানাথ অভিযোগপত্রে এ-ও দাবি করেছেন যে, শেখ শাহজাহান জেলে বসে পরিকল্পনা করে তাঁর স্ত্রী তসলিমা বিবিকে ফোন করে নির্দেশ দেন । সেই নির্দেশ মতো মোসলেম শেখ, আবদুল আলিম মোল্লা ও নজরুল মোল্লাদে'র দিয়ে শাহজাহান 'সংগঠিত এই খুন' করেছে (গাড়ি দুর্ঘটনা) ! ভোলানাথের দেওয়া অভিযোগপত্রেও নাম রয়েছে এঁদের প্রত্যেকের । এছাড়াও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে শেখ শাহজাহান, তাঁর স্ত্রী তসলিমা বিবি,গফফর শেখ,সাবির আলি মোল্লা, ছয়রাফ মীর ও আবদুল কাহার মোল্লার নাম ।
অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেছেন, "এরা সকলেই এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ।" ঘরছাড়া হয়ে বাড়ি ফেরার পর 2024 সালের 1 এপ্রিল থেকে শাহজাহানের নির্দেশে তাঁকে বিভিন্নভাবে খুন করার জন্য চক্রান্ত চলছিল বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন সাক্ষী ভোলানাথ । গাড়ি দুর্ঘটনার পর সেই খুনের চক্রান্তের তত্ত্ব-ই ফের খাড়া করেছেন তিনি । যদিও, সাক্ষী ভোলানাথের গাড়ি-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তাঁর ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ ও চালক শাহনুর আলমের মৃত্যু হলেও সেদিন বরাত জোরে প্রাণে বেঁচে যান তিনি ।

