লক আপে মাদকাসক্ত যুবককে পিটিয়ে খুন পুলিশের ! দোষীর শাস্তি চান মৌসম
স্থানীয়দের দাবি, নিহত যুবকের সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে ৷ এমনকি গোপনাঙ্গেও আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন তাঁরা ৷

Published : February 24, 2026 at 7:29 PM IST
মালদা, 24 ফেব্রুয়ারি: পুলিশি হেফাজতে থাকা এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পারদ চড়ছে পুরাতন মালদায় ৷ মৃতের পরিবার ও এলাকার লোকজনের অভিযোগ, মাদকাসক্ত ওই যুবককে পিটিয়ে খুন করেছে পুলিশ ৷ এনিয়ে মালদা থানার এক এএসআই-সহ সিভিক ভলান্টিয়ারদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মৃতের মা ৷
পুলিশ সুপারের দাবি, ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মৃতের ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে ৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সঠিকভাবে জানা যাবে ৷ এদিকে এই ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনীতির খেলা ৷ ইতিমধ্যে মৃতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে এসেছেন কংগ্রেসের জেলা সভাপতি ৷ তিনি পুলিশের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ তুলেছেন ৷ এদিকে তৃণমূলের বক্তব্য, তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চায় ৷ এই ঘটনায় কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার কঠোর শাস্তির দাবিও তুলেছে তারা ৷

ঘটনাটি ঘটেছিল রবিবার দুপুরে ৷ মালদা থানার পুলিশ খবর পায়, পুরাতন মালদা রেল ট্রেনিং স্কুলের পাশে কিছু মাদকাসক্ত যুবক জড়ো হয়েছেন ৷ খবর পেয়েই সেখানে হানা দেন পুলিশকর্মীরা ৷ দেখেন, সেখানে কিছু যুবক মাদক সেবন করছেন ৷ তা দেখে পুলিশকর্মীরা তাঁদের ধরতে ছোটেন ৷ পুলিশ দেখে পালাতে শুরু করেন যুবকরাও ৷ হাতেনাতে ধরা পড়ে যান স্থানীয় চালিশাপাড়ার বাসিন্দা সেকেন্দার আলি ৷ 37 বছর বয়সি সেকেন্দার এলাকায় মাদকাসক্ত হিসাবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত ৷

পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয় ৷ রাতে পুলিশের তরফে সেকেন্দারের বাড়িতে খবর দেওয়া হয়, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি ৷ তাঁকে প্রথমে মৌলপুর গ্রামীণ হাসপাতাল, পরবর্তীতে মালদা মেডিক্যালে রেফার করা হয়েছে ৷ খবর পেয়েই মেডিক্যালে ছোটেন সেকেন্দারের পরিবারের লোকজন ৷ কিন্তু ততক্ষণে সেকেন্দারকে মৃত ঘোষণা করেছেন মেডিক্যালের চিকিৎসকরা ৷ এরপরেই পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় মানুষজন ৷ তাঁদের দাবি, সেকেন্দারকে লক আপে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে পুলিশ ৷ তাঁর সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে ৷ এমনকি গোপনাঙ্গেও আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন তাঁরা ৷ তাঁরা এই ঘটনার প্রকৃত তদন্ত ও বিচার চান ৷
এই ঘটনায় সোমবার রাতে মালদা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সেকেন্দারের মা সিতারা ৷ তাঁর দাবি, ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী মালদা থানার এএসআই শ্যামল সরকার এবং সিভিক ভলান্টিয়ারদের প্লেন ক্লথ পার্টি ৷ অভিযোগপত্রে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তিনি মালদা থানায় এসেছিলেন ৷ জানতে চেয়েছিলেন, কেন তাঁর ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৷ কিন্তু পুলিশ সেখান থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেয় ৷ ছেলের সঙ্গে পরিবারের কাউকে, এমনকি তাঁর আইনজীবীকেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি ৷ স্থানীয় মানুষজন এবং লক আপে থাকা অন্য ব্যক্তিরা তাঁকে জানিয়েছেন, পুলিশ তাঁর ছেলের উপর বেধড়ক অত্যাচার চালায় ৷ তার জন্যই তাঁর মৃত্যু হয়েছে ৷ তিনি এই ঘটনার প্রকৃত বিচার চান ৷
মালদার পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ওই যুবকের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে ৷ ময়নাতদন্তে মেডিক্যাল বোর্ড নিযুক্ত করা হয়েছে ৷ গোটা ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফিও করা হয়েছে ৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে ৷ মালদা জেলার বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগ পেডলাররা সমাজকে অসুস্থ করতে মাদক বিক্রি করছে ৷ এর বিরুদ্ধে আমাদের লাগাতার অভিযান চলছে ৷ এমনই একটি খবর পেয়ে মালদা রেল লাইনের পাশে পুলিশ অভিযান চালায় ৷ পুলিশ দেখে কিছু লোক দৌড়ে পালাতে যায় ৷ আমার কাছে যা খবর, সেই সময় একজন দৌড়োতে গিয়ে রেল লাইনের উপর পড়ে যায় ৷ পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায় ৷ সেখান থেকে তাকে রেফার করে দেওয়া হয় ৷ সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় ৷ এই ঘটনায় কোনও অভিযোগ থাকলে আমরা নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখব ৷"
পুলিশ সুপারের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মৃত সেকেন্দরের ভাগনে সামিউল শেখ ৷ তাঁর বক্তব্য, "আমার মামা মাদকাসক্ত ছিল ৷ রবিবার মামা যখন মাদক নিচ্ছিল তখন মালদা থানার এএসআই শ্যামলবাবু সেখানে অভিযান চালান ৷ সেখান থেকে আমার মামাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ পরে আমাদের বাড়িতে এসে মালদা থানার অফিসার দিলীপবাবু জানান, মামা গুরুতর অসুস্থ ৷ আমরা যখন মালদা মেডিক্যালে মামাকে দেখি, তার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত ৷ আমাদের ধারণা, মৌলপুর গ্রামীণ হাসপাতালেই মামা মারা গিয়েছে ৷ পুলিশ সুপার দাবি করেছেন, মামা নাকি রেল লাইনে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল ৷ আমরা ঘটনাস্থলের ভিডিয়ো ফুটেজ দেখতে চাই ৷ পুলিশ সুপার আরও দাবি করেছেন, মামাকে নাকি রেল লাইন থেকে তুলে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৷ আমরা সেই সময়ের মালদা থানার সিসিটিভির ফুটেজও দেখতে চাই ৷ আমরা এই ঘটনা নিয়ে কিন্তু যতদূর যেতে হয় যাব ৷ আমরা নিশ্চিত, পুলিশের অত্যাচারেই মামার মৃত্যু হয়েছে ৷"
সোমবার সন্ধেয় মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন কংগ্রেসের জেলা সভাপতি ইশা খান চৌধুরী ও মৌসম নুর ৷ ইশা বলেন, "সেকেন্দারের মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক নয় ৷ এই মৃত্যু নিয়ে সেকেন্দারের মা, তাঁর পরিবার এবং এলাকার মানুষজন একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন ৷ তাঁদের দাবি, সেকেন্দারকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৷ সেখানে তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হয় ৷ এই ঘটনায় পরিবারের লোকজন বিচারবিভাগীয় তদন্ত দাবি করছেন ৷ ইতিমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে ৷ পরিবারের লোকজন পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ৷ আমাদের দাবি, পুলিশ পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবিকে মান্যতা দিয়ে ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত করুক ৷"
মৌসম বলেন, "এলাকার মানুষজন দাবি করছেন, পুলিশি হেফাজতে সেকেন্দার আলিকে খুন করা হয়েছে ৷ এই মৃত্যু কীভাবে হল, কারা এর জন্য দায়ী তা জানতে আমরাও বিচারবিভাগীয় অথবা কোনও এজেন্সির তদন্ত দাবি করছি ৷ কারণ, পুলিশের উপর আমাদের ভরসা নেই ৷ এক্ষেত্রে যা বোঝা যাচ্ছে তাতে পুলিশের লোকজনই এই ঘটনা ঘটিয়েছে ৷ আমরা দোষীদের শাস্তি দাবি করছি ৷ পরিবারও একই দাবি তুলেছে ৷"
পুরাতন মালদা শহর তৃণমূলের সভাপতি বিভূতিভূষণ ঘোষ বলেন, "এলাকার লোকজন দাবি করছেন, পুলিশই সেকেন্দারকে পিটিয়ে মেরেছে ৷ পুলিশের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে ৷ ম্যাজিস্ট্রেট, মেডিক্যাল বোর্ডের উপস্থিতিতে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে ৷ পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি করা হয়েছে ৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যদি মৃত্যুর কারণ পিটিয়ে মারা হয়, তবে যে পুলিশকর্মী বা সিভিক ভলান্টিয়াররা এর জন্য দায়ী, আমরা তাঁদের কঠোর শাস্তি চাই ৷ আমরা চাই, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক ৷ মৃতের পরিবারের তরফে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ৷ আমরা সেকেন্দারের পরিবারের পাশে রয়েছি ৷ আমাদের তরফে পরিবারকে সবরকম সহায়তা করা হবে ৷"

