রক্তকরবীর গ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষে আসানসোলের মঞ্চে ফিরলেন রাজা-নন্দিনীরা
শিল্পাঞ্চলবাসীদের নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনতে, সেই পুরনো অভিনেত্রী, যাঁরা নন্দিনীর ভূমিকায় একদা অভিনয় করেছিলেন, তাঁদের মঞ্চে ফিরিয়ে এনে সংবর্ধিত করা হয় । তারক চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন ৷

Published : July 6, 2026 at 1:10 PM IST
আসানসোল, 6 জুলাই: এই বছরটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবীর গ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষ । আর সেই সময়কালকে মনে রেখেই আসানসোল শিল্পাঞ্চলে আবারও মঞ্চে অভিনীত হল রক্তকরবী । আসানসোলে রক্তকরবীর মঞ্চায়ন হয়েছে প্রায় পাঁচ দশকের কাছাকাছি । যদিও গত কয়েক বছর সেখানে পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্যের কোনও নাটক মঞ্চস্থ হয়নি । কার্যত একাঙ্ক নাটক বা ছোট নাটকের ট্রেন্ড এসেছিল ।
সেই প্রথা ভেঙে বার্নপুরের নাট্যদল দিশারী পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘের রক্তকরবী মঞ্চস্থ করল । শুধু তাই নয়, শিল্পাঞ্চলবাসীদের নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনতে, সেই পুরনো অভিনেত্রী, যাঁরা নন্দিনীর ভূমিকায় একদা অভিনয় করেছিলেন, তাঁদের মঞ্চে ফিরিয়ে এনে সংবর্ধিত করা হয় ।
চল উঠে গিয়েছে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের থিয়েটারের
আসানসোল শিল্পাঞ্চল জুড়ে পূর্ণদৈর্ঘ্যের থিয়েটারের চল প্রায় উঠে গিয়েছে । বর্তমানে এখন আর কেউ পূর্ণাঙ্গ নাটক মঞ্চস্থ করে না । নাট্যদলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, একদিকে লাইট, সাউন্ড, মঞ্চ, কস্টিউম সবকিছু নিয়ে বিরাট খরচ, অন্যদিকে অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভাব । বর্তমান যুগে সবাই এতটাই ব্যস্ত যে, পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নাটক করার মতো সময় কারওরই আর নেই । মফস্বলে যেহেতু থিয়েটার পেশা হয়ে উঠতে পারেনি, সেই কারণে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও খুব বেশি উৎসাহী নয় থিয়েটারের প্রতি । আর সেইজন্যই ছোট নাটক বা একাঙ্ক নাটক নিয়েই থিয়েটার বাঁচিয়ে রেখেছে আসানসোলের নাট্যদলগুলি ।

সেখান থেকেই কার্যত অসাধ্য সাধন করেছে বার্নপুরের নাট্যদল দিশারী । রক্তকরবীর গ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষে তারা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের রক্তকরবীকে মঞ্চে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে । এই নাটকে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী । পাশাপাশি মঞ্চের আলো চোখ ধাধানো, তার সঙ্গে রয়েছে উন্নত শব্দ ও মিউজিক । কার্যত বর্তমান সময়কালের ট্রেন্ড ভেঙে আসানসোল শিল্পাঞ্চলে যা ভাবা যায় না, তাই করে দেখিয়েছে বার্নপুর দিশারী ।

দিশারীর রক্তকরবী
আসানসোলের রবীন্দ্র ভবনে দিশারী বার্নপুর প্রযোজিত 'রক্তকরবী' মঞ্চস্থ হল । প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ রবীন্দ্রভবন দর্শকদের বিপুল উপস্থিতিতে প্রমাণ করল, কালজয়ী থিয়েটারের জন্য এখনও মানুষের উৎসাহ প্রবল । সমগ্র নাটকের প্রয়োগ ও পরিকল্পনায় ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সম্পদ বসু । তিনি বর্তমানে তিনি মুম্বই নিবাসী । এই নাটকে পরিচালনা ও অভিনয়ের জন্য সম্পদ বসু মুম্বই থেকে আসানসোলে এসে থেকেছেন দিনের পর দিন । শুধু তাই নয়, আসানসোলের রক্তকরবীর অভিনয়ের ইতিহাসে তিনি বিরল ব্যক্তিত্ব ।

এদিন গত প্রায় 50 বছর ধরে যাঁরা আসানসোলে রক্তকরবীর নন্দিনী হয়েছিলেন, সবাইকে সংবর্ধিত করা হয় । আশ্বর্যের বিষয় সম্পদ বসু সবার সঙ্গেই বিশু পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, গত কয়েকদশক ধরে ।

এই নাটকে আলোর পরিকল্পনায় শুভদীপ চৌধুরী, আবহ সংগীতে সায়ন দত্ত এবং রূপসজ্জায় শ্যামল দালাল নাটকটিকে এক অনন্য মাত্রা এনে দেন । সুবিশাল মঞ্চ সজ্জার দায়িত্বে ছিলেন সৌমিত্র মুখোপাধ্যায় ও অসিত আইচ । তাঁদের নিখুঁত ভাবনায় দর্শকরা মুগ্ধ । এদিনের অভিনয়ে অবশ্যই রাজা চরিত্রে বর্ষীয়ান অভিনেতা তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী চরিত্রে সুজাতা ভট্টাচার্য, বিশু পাগল চরিত্রে সম্পদ বসু, সর্দার চরিত্রে সোমনাথ মুখোপাধ্যায়, ফাগুলাল চরিত্রে সুবীর রায় ও চন্দ্রা চরিত্রে অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে । বাকি অভিনেতা অভিনেত্রীরাও সাবলীল ।

ফিরে এলেন নন্দিনীরা
এদিনের সন্ধ্যায় অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল শিল্পাঞ্চলের নাট্যজগতে বিভিন্ন সময়ে 'নন্দিনী' চরিত্রে অভিনয় করা চার বিশিষ্ট অভিনেত্রীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান । তাঁরা হলেন তাপসী বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুমিতা জমিদার, শর্বরী মুখোপাধ্যায় এবং সুজাতা ভট্টাচার্য । সম্পদ বসুকেও নাট্যচর্চায় আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মান জানানো হয় । পাশাপাশি সম্মানিত করা হয় শিল্পাঞ্চলের প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব অমিত চট্টোপাধ্যায়কেও ।

কী বলছেন পরিচালক ও অভিনেতারা
এই নাটকের পরিচালক বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব সম্পদ বসু একসময় এই শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে কয়েক দশক ধরে তিনি মুম্বই নিবাসী । মুম্বইতেও গড়ে তুলেছেন বিশেষ নাটকের দল । রক্তকরবীর মঞ্চায়নের শেষে সম্পদ বসু জানালেন, "আসানসোলে কয়েক দশক ধরে এই নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এবং আমার সৌভাগ্য আজকে যে কয়েকজন নন্দিনীরা সংবর্ধিত হলেন তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে আমি বিশু পাগলের চরিত্রে অভিনয় করেছি । বর্তমান সময়ের রক্তকরবীকে আমি ডিজাইন করেছিলাম একটু অন্য ধাঁচে । রবীন্দ্রনাথ তাঁর রক্তকরবীর শেষে প্রেম, ফসলের গান এসব নিয়ে এসেছিলেন । আমি আমার প্রযোজনায় রক্তকরবীর শেষে দুর্বলের প্রতি যে শোষকের অত্যাচার এবং শেষ পর্যন্ত শোষিতরা যখন বিপ্লব ঘটায় সেটাই দেখাতে চেয়েছি । রাজাও শেষ পর্যন্ত শোষিতদের দলে এসে বন্দিশালা ভাঙতে নেমেছেন ।"

নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী সুজাতা ভট্টাচার্য জানালেন "এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না । দর্শকদের এত ভালোবাসা পেলাম । এর পাশাপাশি পুরনো সব নন্দিনীর চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীরা এসে আমার সুনাম করে গিয়েছেন । তাঁদের আশীর্বাদ পেয়ে আরও ধন্য মনে হয়েছে নিজেকে ।"

শিল্পাঞ্চলে বড় বা পূর্ণাঙ্গ থিয়েটারের চল প্রায় চলে গিয়েছিল । কিন্তু দিশারী আবারও প্রত্যেকটি নাটক দলকে কার্যত উৎসাহিত করেছে, মঞ্চে আবারও পূর্ণাঙ্গ থিয়েটার ফিরে আসুক এই ভাবনায় ।

