মাইনাস 50 ডিগ্রিতে মাকালুর বেসক্যাম্পে বঙ্গতনয়া, বিশ্ব নজিরের সন্ধিক্ষণে পিয়ালী
140 কিমি বেগে বইছে ঝড় ৷ তাপমাত্রা মাইনাস 50 ডিগ্রি ৷ মাকালুর বেসক্যাম্পে প্রবল ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত চিপে লড়াইয়ের কথা জানালেন 'পর্বতকন্যা' পিয়ালী বসাক ৷

Published : January 6, 2026 at 3:08 PM IST
পলাশ মুখোপাধ্যায়
চন্দননগর, 6 জানুয়ারি: শীতকালে মাকালু অভিযান মানে পদে পদে জীবনের ঝুঁকি ! তবে সেসব তোয়াক্কা না-করেই মাকালু বেসক্যাম্পে পর্বতারোহণের প্রতিক্ষায় চন্দননগরের 'পর্বতকন্যা' পিয়ালী বসাক। বঙ্গতনয়ার ঝুলিতে রয়েছে একাধিক সম্মান ৷ এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, মাকালু (সামার সামিট) ও ধৌলাগিরি-সহ একাধিক পর্বত আরোহণ করেছেন তিনি ৷ তবে এবার বেশি চর্চার কারণ, প্রবল শীতের মধ্যে গত 15 ডিসেম্বর মাকালু অভিযানে গিয়েছেন চন্দননগরের বছর ছত্রিশের এই স্কুল শিক্ষিকা ৷ এখন রয়েছেন মাকালু বেসক্যাম্পে ৷ সেখানে পরিস্থিতি কেমন জানালেন ইটিভি ভারত-কে ৷
মাকালু- পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালু ৷ উচ্চতা 8 হাজার 863 মিটার (27,766 ফুট)। নেপাল ও চিনের (তিব্বত) সীমান্তে মহালাঙ্গুর হিমালয় রেঞ্জের কাছে মাকালু ৷ বিশ্বে খুব কম পর্বতারোহী শীতকালীন সামিটে মাকালু অভিযানে যান ৷ শীতে মাকালু জয় করলেই বিশ্বের প্রথম মহিলা হিসেবে নজির গড়বেন পিয়ালী বসাক ৷ ইতিমধ্যেই মাকালুর বেসক্যাম্পে পৌঁছে গিয়েছেন বাঙালি এই পর্বতারোহী ৷
মাইনাস 50 ডিগ্রিতে মাকালু বেসক্যাম্পে পিয়ালী- ফোনে শোনা যাচ্ছে তাঁর গলা ৷ কাঁপা কাঁপা স্বরে 'পর্বতকন্যা' বলেন, "এখানে এখন মাইনাস 50 ডিগ্রি সেলিসিয়াস তাপমাত্রা ৷ 140 কিলোমিটার বেগে ঝড় বইছে ৷" তবে পিয়ালির চ্যালেঞ্জ এই আবহাওয়াকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে ৷ শক্ত কঠিন বরফের ঢাকা পর্বতে উঠতে মরিয়া পিয়ালী । এই তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও কাশি ও গলায় জ্বালা নিয়েও দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে চলেছেন ৷ তাঁর একমাত্র ইচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে প্রথম মহিলা হিসেবে শীতকালীন মাকালু জয় ।

ভূপৃষ্ঠ থেকে 17 হাজার ফুট উঁচুতে পিয়ালী ও তাঁর সঙ্গীরা- শীতকালীন মাকালু অভিযান করা অনেকটাই কঠিন। বেসক্যাম্প থেকে পর্বতারোহী জানান, মাকালু অভিযান সফল হলে পৃথিবীর মধ্যে মহিলা হিসেবে প্রথম শীতকালীন পর্বতারোহণে নতুন দৃষ্টান্ত হবে। পৃথিবীতে বহু বিখ্যাত পর্বতারোহী রয়েছেন, যাঁরা এই কঠিন পরিস্থিতিতে আরোহণ করতে পারেননি। এখন তিনি ভূপৃষ্ঠ থেকে 17 হাজার ফুট উপরে রয়েছেন ৷ এর থেকে যত উপরে উঠব তত তাপমাত্রা আরও কমবে। বায়ুণ্ডলের উপরে চলে আসায় অক্সিজেনের অভাব তো রয়েছে ৷ বঙ্গতনয়ার কথায়, "ঠান্ডায় আমাদের প্রত্যেকেরই নাক, মুখ, গলা জ্বলে যাচ্ছে । আজ অর্থাৎ মঙ্গলবার থেকে মাকালু পর্বত অভিযানের রুট খোঁজার কাজ চলবে ৷ সুইজারল্যান্ড থেকে আমরা আবহাওয়ার রিপোর্ট নিচ্ছি । 10 দিন মতো আবহাওয়া ভালো থাকলেই আমরা সামিট শেষ করব ।"

9 ঘণ্টা পর বেসক্যাম্পে পৌঁছেছেন 'পর্বতকন্যা'- বেসক্যাম্প পর্যন্ত যেতে অনেক দুর্গম পথ পেরোতে হয়েছে পিয়ালীদের ৷ সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "শীতকালে বেসক্যাম্পে পৌঁছতেই কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে । 9 ঘণ্টা ধরে পাথরের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে বেসক্যাম্প পৌঁছেছি । এত শক্ত বরফ সেখানে লোহার কাঁটা পর্যন্ত আটকায় না। একটু অসাবধানতা হলেই বরফে স্লিপ কেটে খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা । মাকালু বেস ক্যাম্প গরমকালেও অনেকটাই কঠিন। তাই পর্যটকরাও সেভাবে আসেন না এখানে। সেই জায়গায় আমরা শীতকালে মাকালু অভিযান করতে এসেছি ৷"

বাড়ির দলিল বন্ধক দিয়ে লোন নিয়েছেন পিয়ালী- কতজন মিলে শীতকালীন মাকালু অভিযান পর্বতারোহীর ? পিয়ালী বলন, "দু'জন কুক নিয়ে মোট সাতজন আমরা মাকালু অভিযানের টিমে রয়েছি। শানু শেরপার তত্ত্বাবধানে এই অভিযান করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মাকালু অভিযানে 4টি ক্যাম্প করে অভিযান শেষ হয়। আমরা চেষ্টা করব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সামিট করে নেমে আসার। বেসক্যাম্পে একমাস থাকা খাওয়ার প্রস্তুতি আমরা নিয়ে এসেছি । প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক লড়াইও লড়তে হচ্ছে আমাকে। এই সামিটে 25 লক্ষ টাকা খরচ রয়েছে। এজেন্সিকে মাকালু অভিযানের দরুন 9 লক্ষ টাকা দিয়েছি । পুরোটাই লোন নিয়ে এই অভিযান করছি । বাড়ির দলিল বন্ধক দিয়ে এই সামিটের জন্য লোন নিয়েছি ৷"

ঋণের ভারে জর্জরিত পিয়ালী- এর আগের ছ'টি অভিযানের খরচ তিনি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে করেছিলেন ৷ সেই ঋণের ভারে তিনি জর্জরিত ৷ বছর কয়েক আগে মা-বাবাকে হারিয়েছেন ৷ একমাত্র বোন রয়েছেন তমালি বসাক ৷ কর্মসূত্রে থাকেন হায়দরাবাদে ৷ আপাতত স্কুল আর পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতিতেই দিন কাটে তাঁর ৷ যদিও প্রস্তুতির একটা বড় অংশজুড়ে থাকে অভিযানের খরচের বিষয়টি ৷

