ETV Bharat / state

চূড়ান্ত তালিকায় নেই 4 হাজারেরও বেশি, বিজেপিকে দুষে ফের নাম তোলার লাইনে ভোটাররা

2002 সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও 2026 সালের এসআইআর প্রক্রিয়ার পর প্রকাশিত তালিকায় বহু ভোটারের নাম নেই ৷ এছাড়া 'বিচারাধীন' রয়েছেন অনেক ভোটার ৷

Sir in West Bengal
মালদায় হাজার হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : March 3, 2026 at 8:54 PM IST

|

Updated : March 4, 2026 at 9:45 AM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

পার্থ দাসের প্রতিবেদন

মালদা, 3 মার্চ: এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন ৷ যেসব ভোটারের নাম বিচারাধীন, তাঁদের নথিপত্র পরীক্ষা করছে বিচার বিভাগ ৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, চূড়ান্ত তালিকায় 63 লাখ 66 হাজার 952 ভোটারের নাম নেই ৷ 60 লক্ষ 6 হাজার 675 জন ভোটারের নাম এখনও বিচারাধীন ৷

এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কা, তথ্যগত অসঙ্গতির আওতায় থাকা বিচারাধীন ভোটারদের অনেকের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে ৷ এদিকে এই বাদ পড়া ভোটারদের অনেকের নামই 2002 সালের এসআইআরের তালিকায় ছিল ৷ তাঁরা এর আগে ভোটও দিয়েছেন ৷ তাহলে এবার তাঁদের নাম বাদ পড়ল কেন ? এখন তাঁদের কী হবে ? প্রশ্ন সকলের ৷

ভোটার কার্ড হাতে নয়া ভোটার তালিকায় নাম তোলার লাইনে এক ভোটার (ইটিভি ভারত)

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল স্বীকার করে নিয়েছেন, কিছু ভুলভ্রান্তি হয়েছে ৷ যেখানে যেখানে ভুল হয়েছে, কমিশন দ্রুত পদক্ষেপ করেছে ৷ কিন্তু তাঁর সেই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন নাম বাদ যাওয়া ভোটাররা ৷ তাঁদের আশঙ্কা, এবার হয়তো আর তাঁদের ভারতীয় হিসেবেই গণ্য করা হবে না ৷ হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্প কিংবা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ৷

মালদা জেলায় পুরনো মালদা পুর এলাকায় আতঙ্কের এই ছবি ধরা পড়েছে ৷ চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে এই পুরসভা এলাকার প্রায় 60 হাজার ভোটার ভোট দিয়েছিলেন ৷ ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, মোট 20টি ওয়ার্ডের দু'টিতে কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে, বাকি 18টি ওয়ার্ডে এগিয়ে ছিল বিজেপি ৷ একুশের বিধানসভা নির্বাচনে এই পুরসভার সিংহভাগ ওয়ার্ডে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৷ কিন্তু এখন এই পুরসভা তৃণমূলের দখলে ৷ পুরবোর্ডে বিরোধী বলে কিছু নেই ৷

পুরসভার ভোটার তালিকা থেকেই ডিলিট হয়েছে চার হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম ৷ তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে, কয়েকজন আবার অন্যত্র চলে গিয়েছেন ৷ এলাকায় বাস করছেন অথচ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, এমন ভোটারের সংখ্যা নেহাত কম নয় ৷

এই বাদ পড়া ভোটাররা এখন সকাল-সন্ধ্যা ছুটছেন তাঁদের কাউন্সিলরদের কাছে ৷ এক্ষেত্রে কাউন্সিলরদেরও হাত-পা বাঁধা ৷ তাঁরা আপাতত সবাইকে 6 নম্বর ফর্ম পূরণের পরামর্শ দিচ্ছেন ৷ পুরনো মালদা পুরসভার 2, 7 ও 19 নম্বর ওয়ার্ডেই সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৷ বিচার বিভাগের বিবেচনায় রয়েছেন আরও অনেকে ৷

2 নম্বর ওয়ার্ডে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন 550 জন, বিচারাধীন 100 ৷ 7 নম্বর ওয়ার্ডে ভোটাধিকার হারিয়েছেন 504 জন ৷ তথ্যগত অসঙ্গতির আওতায় 36 জন ৷ চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ঠাঁই পাননি 19 নম্বর ওয়ার্ডের 718 জন ৷ 408 জনের নাম বিচারাধীন ৷ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুধু এই তিনটি নয়, বাকি ওয়ার্ডগুলিতেও বহু নাম 28 ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ৷

West Bengal SIR Trouble
নাম নেই নয়া তালিকায়, ভোটার কার্ড হাতে ফের লাইনে ভোটার (ইটিভি ভারত)

এমনই একজন ভোটার লিটনকুমার দাস ৷ তিনি 19 নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৷ তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারে সাতজন ভোটার ৷ এসআইআর প্রক্রিয়ায় আমরা শুনানির নোটিশ পেয়েছিলাম ৷ শুনানিতে প্রত্যেকে কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী নথিপত্র জমা দিয়েছি ৷ ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখছি, তিনজনের নাম তালিকায় থাকলেও চারজনের নেই ৷ এক যাত্রায় পৃথক ফল কী করে হল, বুঝতে পারছি না ৷ কেন আমাদের চারজনের নাম কাটা গেল ? এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছি ৷ আমার ধারণা, এর পিছনে বিজেপির চক্রান্ত রয়েছে ৷ আমরা চাই, আমাদের নাম আবার ভোটার তালিকায় তোলা হোক ৷”

ওই ওয়ার্ডেরই প্রৌঢ়া শান্তিরানি পালের বক্তব্য, “আমার নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দিয়েছে ৷ এর আগে 7-8 বারেরও বেশি ভোট দিয়েছি ৷ এবার এসআইআর-এর নতুন ভোটার তালিকায় আমার আর ছেলের নাম নেই ৷ তবে বউমার নাম রয়েছে ৷ খুব ভয়ে রয়েছি ৷ তাহলে কি আমি এই দেশের কেউ নই ? আগে আমাকে মেরে তারপর বাংলাদেশে পাঠিও ! ”

তালিকা থেকে বাদ পড়া অষ্টম হালদার বলেন, “আমার পরিবারের তিনজনের নাম ভোটার তালিকা থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছে ৷ আমরা এই এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ৷ আমার মা 1995 সাল থেকে ভোট দিচ্ছেন ৷ 2002 সালের ভোটার তালিকায় মায়ের নাম রয়েছে ৷ অথচ আমার দাদা, বউদিদের নাম ভোটার তালিকায় নেই ৷ এখানে প্রত্যেক বাড়িতে এমন ঘটনা ঘটেছে ৷ আমাদের এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে কেন ? আমরা সমস্ত নথিপত্র কমিশনের কাছে জমা করেছি ৷ আমরা সবাই আতঙ্কে রয়েছি ৷ আমরা সবাই ভোট দিতে চাই ৷ এই চক্রান্তের পিছনে নির্বাচন কমিশন, বিজেপি অথবা বড় বড় নেতা-মন্ত্রীরাই দায়ী ৷”

এই প্রসঙ্গে 19 নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ হালদার বলেন, “যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা গিয়েছে তাঁরা আমার কাছে আসছেন ৷ আমরাও তাঁদের নিয়ে চিন্তিত ৷ বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে লাইনের পর লাইন চলছে ৷ এঁরা আর ভোট দিতে পারবেন না ৷ তাঁদের আবার 6 নম্বর ফর্ম পূরণের লাইনে দাঁড়াতে হবে ৷ নির্বাচন কমিশন এখানে উপলক্ষ্য মাত্র ৷ বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন এই কাজ করছে ৷ বাংলার মানুষ যাতে ভোট দিতে না-পারেন, তার জন্য এই চক্রান্ত ৷”

পুরনো মালদা পুরসভার চেয়ারম্যান বিভূতিভূষণ ঘোষ বলেন, “ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বেরনোর পর আমরা দেখছি, এই পুর এলাকায় 4 হাজার 95 জনের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ৷ সবচেয়ে বেশি বাদ গিয়েছে 2, 7 ও 19 নম্বর ওয়ার্ডে ৷ তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের 6 নম্বর ফর্ম পূরণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছি ৷ আমরা চাই, যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁরা যেন দ্রুত ভোটাধিকার ফিরে পান ৷ বিজেপি নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে মানুষকে এভাবে হেনস্থা করছে !”

বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় বলেন, “শুনেছি, পুরনো মালদায় প্রায় 800 ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে ৷ তৃণমূল বলছে, এটা বিজেপির চক্রান্ত ৷ আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে ৷ তাদের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও সম্পর্ক নেই ৷ এসআইআর শুরুর সময় থেকেই তৃণমূল সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে ৷"

গেরুয়া শিবিরের এই নেতার দাবি, "কমিশনের তরফে যা যা নথি চাওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী নথি জমা পড়লে কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার কথা নয় ৷ আসলে তৃণমূল কোনওদিন সংবিধান মানে না ৷ এসআইআর শুরুর সময় থেকে মমতা-অভিষেক যেভাবে বিএলওদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছেন তারই ফলশ্রুতিতে এমন ঘটনা ঘটেছে ৷ সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের আবেদন, প্রকৃত ভোটারদের নাম কখনও বাদ যাবে না ৷ নির্বাচন কমিশন যে যে নথি জমা করতে বলেছে, সেগুলি জমা করুন ৷ সবার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে ৷”

এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ কী করবে, কোথায় গেলে সমাধান মিলবে, সেই উত্তর কে দেবে ? প্রশাসনই বা তাঁদের নিয়ে কী ভাবছে ? বিষয়টি জানতে ফোন করা হয়েছিল জেলা নির্বাচন আধিকারিক তথা জেলাশাসক প্রীতি গোয়েলকে ৷ কিন্তু একাধিকবার ফোন করার পরও তিনি সাড়া দেননি ৷ এমনকী তাঁকে পাঠানো হোয়াটস্‌অ্যাপ মেসেজেরও কোনও উত্তর দেননি তিনি ৷

Last Updated : March 4, 2026 at 9:45 AM IST