ETV Bharat / state

প্রজনন সমস্যা রুখতে নয়া উদ্যোগ, দার্জিলিংয়ের স্নো-লেপার্ডদের জন্য আসছে 'জাপানি পাত্রী'

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের পর এবার জিনগত সঙ্কট এড়াতে দার্জিলিংয়ের স্নো-লেপার্ডদের জন্য 'জাপানি পাত্রী' ! ইনব্রিডিং ঠেকাতে প্রাণী বিনিময়ের উদ্যোগ ৷ শুভদীপ রায় নন্দীর প্রতিবেদন ৷

SNOW LEOPARD GENETIC CRISIS
দার্জিলিংয়ের স্নো-লেপার্ডদের জন্য আসছে 'জাপানি পাত্রী' (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : September 1, 2026 at 12:53 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

দার্জিলিং, 1 সেপ্টেম্বর: হিমালয়ের বরফাবৃত দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের অতি পরিচিত এক দুর্লভ শিকারি স্নো-লেপার্ড। তার গাঢ় ধূসর-সাদা চামড়ার উপর কালো ছোপ আর দীর্ঘ ঘন লেজের সাহায্যে বরফের প্রাকৃতিক আবহে অনায়াসে আত্মগোপন করার অসাধারণ দক্ষতার কারণে একে বলা হয় 'পর্বতের ভূত'।

ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, চিন-সহ মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ শৈলশিখরে এদের আবাস্থল। এরাজ্যে একমাত্র দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্কেই দেখা মেলে এই দুর্লভ প্রাণীর। তবে পাহাড়ি স্বাস্থ্যের খবর এবার কিছুটা চিন্তার। দীর্ঘদিন ধরে একই বংশের মধ্যে প্রজনন চলায় মারাত্মক 'ইনব্রিডিং' বা জিনগত সমস্যায় পড়তে চলেছে দার্জিলিংয়ের এই স্নো-লেপার্ড পরিবার। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও জিনগত বৈচিত্র্য ফেরাতে দূর দেশ জাপান থেকে 'বিদেশি পাত্রী' নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ও জু অথরিটি।

'ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন'-এর চরম ঝুঁকি

দার্জিলিংয়ের তোপকেদারায় পদ্মজা নাইডু চিড়িয়াখানার একটি সুনির্দিষ্ট প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে সেখানে মোট 13টি স্নো-লেপার্ড রয়েছে, যার মধ্যে 5টি পুরুষ এবং 8টি স্ত্রী। চিড়িয়াখানা সূত্রের খবর, তোপকেদারায় থাকা এই স্নো-লেপার্ডগুলি মূলত সিকিমের বংশোদ্ভূত। বন্দিদশায় দশকের পর দশক ধরে একই রক্তসম্পর্কের প্রাণীদের মধ্যে প্রজনন চলায় 'ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন'-এর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

SNOW LEOPARD GENETIC CRISIS
স্নো-লেপার্ড (ইটিভি ভারত)

বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর একই পরিবারের মধ্যে প্রজনন হতে থাকলে প্রাণীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মে শরীরের স্বাভাবিক গঠন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের খর্বতা, এমনকী গায়ের রঙেও নানাবিধ বিকৃতি দেখা দিতে পারে। এই বিপদের হাত থেকে দার্জিলিংয়ের স্নো-লেপার্ডদের রক্ষায় নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য বন দফতর, পার্ক কর্তৃপক্ষ ও জু অথরিটি। নতুন জিনগত সংমিশ্রণ বা বৈচিত্র্য আনতে জাপানের বিখ্যাত 'তামা জু'র সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

SNOW LEOPARD GENETIC CRISIS
স্নো-লেপার্ড (ইটিভি ভারত)

মহিলা স্নো-লেপার্ডকে নিয়ে আসা হবে দার্জিলিংয়ে

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাপান থেকে একটি মহিলা স্নো-লেপার্ডকে নিয়ে আসা হবে দার্জিলিংয়ে। তার বিনিময়ে উত্তরবঙ্গের এই চিড়িয়াখানা থেকেও একটি মহিলা স্নো-লেপার্ড পাঠানো হবে জাপানে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।

বনমন্ত্রীর বক্তব্য

এই প্রসঙ্গে রাজ্য বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও জানান, "চিড়িয়াখানা বা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রগুলিতে বিপন্ন প্রাণীদের স্বাস্থ্যকর বংশবৃদ্ধি ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। বন্দিদশায় দীর্ঘদিন একই বংশে প্রজনন চললে প্রাণীদের শারীরিক সক্ষমতা ও জিনগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দার্জিলিং চিড়িয়াখানার স্নো-লেপার্ডদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি রুখতে এবং প্রজনন চক্রে নতুন জিন নিয়ে আসতে আমরা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রাণী বিনিময়ের উদ্যোগ নিয়েছি। জাপানের তামা জু-র সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা ইতিবাচক দিকেই এগোচ্ছে। সমস্ত নিয়মকানুন ও ছাড়পত্র মেলার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।"

সিমলিপাল থেকে বেঙ্গল সাফারি: জিনগত সঙ্কটের পুনরাবৃত্তি রুখতে প্রাণী বিনিময়

বন্দিদশা বা সীমিত পরিমণ্ডলে রক্তসম্পর্কের মধ্যে প্রজননের ফলে কী ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে, তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানীরা। ওড়িশার সিমলিপাল ব্যাঘ্রপ্রকল্প তার জলজ্যান্ত উদাহরণ, যেখানে দীর্ঘ ইনব্রিডিংয়ের কারণে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সেই চিরাচরিত রাজকীয় চেহারা ও বৈশিষ্ট্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে, এমনকী জিনগত বিকৃতির দরুণ সেখানে তৈরি হয়েছে বিরল কালো ছোপযুক্ত মেলানিস্টিক বাঘ।

SNOW LEOPARD GENETIC CRISIS
স্নো-লেপার্ড (ইটিভি ভারত)

একই সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্কের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগাররাও। 2016 সালে সাফারি পার্ক চালু হওয়ার পর যে বাঘগুলির মাধ্যমে প্রজনন শুরু হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই ছিল একই বংশ বা পরিবারের সদস্য। দীর্ঘদিন একই ধারায় প্রজনন চলায় বাঘেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছিল এবং ইনব্রিডিং ডিপ্রেশনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এই সমস্যা দূর করতে কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র নিয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে একটি নতুন রয়্যাল বেঙ্গল বাঘিনীকে বেঙ্গল সাফারি পার্কে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

SNOW LEOPARD GENETIC CRISIS
পদ্মজা নাইডু চিড়িয়াখানা (ইটিভি ভারত)

পাশাপাশি, দার্জিলিং চিড়িয়াখানা থেকেও আনা হবে একটি সাইবেরিয়ান রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এতে বাঘেদের জিনগত বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে এবং নতুন রক্তের সংমিশ্রণে বাঘের পরবর্তী প্রজন্ম জিনগত জটিলতা থেকে রক্ষা পেয়েছে। বেঙ্গল সাফারি পার্কের এই সফল মডেলকেই এবার স্নো-লেপার্ডদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চলেছে দার্জিলিং চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, বন্দিদশায় থাকা বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের সুস্থ, সবল ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নতুন জিনের সংযোজন ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্যেই এবার জাপানি অতিথির অপেক্ষায় তোপকেদারার স্নো-লেপার্ড পরিবার।