পরিবহণে সবুজ বিপ্লব: নিউটাউনে অ্যাপ-ভিত্তিক সাইকেল শেয়ারিং ব্যবস্থা আনছে এনকেডিএ
বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ও রক্ষণাবেক্ষণে তৈরি হবে স্মার্ট সাইকেল ডকিং স্টেশন ৷ অ্যাপের মাধ্যমে সাইকেল বুকিং ও উপলব্ধতা সম্পর্কে মিলবে তথ্য ৷

Published : November 3, 2025 at 7:11 PM IST
কলকাতা, 3 নভেম্বর: কলকাতা সংলগ্ন আধুনিক এবং পরিকল্পিত উপনগরী নিউটাউনকে যানজটমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করল নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা এনকেডিএ ৷ শহরের বুকে অ্যাপ-ভিত্তিক পাবলিক বাইসাইকেল শেয়ারিং (PBS) ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা ৷ যার মূল লক্ষ্য হল সাইকেলকে দৈনন্দিন যাতায়াতের একটি সাশ্রয়ী, পরিবেশ-সহায়ক এবং কার্যকর মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলা ৷
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগটি শহরের রাস্তায় গাড়ির ভিড় কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমাতে সাহায্য করবে ৷ যা নিউটাউনের 'গ্রিন সিটি' তকমা আরও দৃঢ় করবে ৷ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এনকেডিএ ইতিমধ্যেই একটি এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট (EOI) জারি করেছে। এই ইওআই-এর মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে গোটা নেটওয়ার্কটি তৈরি, পরিচালনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে ৷ এই অ্যাপ ভিত্তিক আধুনিক ব্যবস্থাটি নিউটাউনের তিনটি অ্যাকশন এরিয়াকে কভার করবে ৷
প্রাথমিকভাবে, এই সাইকেল শেয়ারিং ব্যবস্থার আওতায় প্রায় 350টি সাইকেল নামানো হবে ৷ যেখানে সাধারণ প্যাডেল-চালিত সাইকেলের সঙ্গে বিদ্যুৎ-সহায়ক মডেলও থাকবে ৷ এগুলি মূলত দীর্ঘ পথ বা সামান্য উঁচু রাস্তায় যাত্রীদের কম পরিশ্রমে গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে ৷ দু’টি ধাপে নিউটাউন জুড়ে মোট 500টি স্মার্ট ডকিং স্টেশন তৈরি করা হবে ৷
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক অঞ্চল, মেট্রো করিডর সংলগ্ন স্থান, বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র (বিজনেস হাব) এবং শহরের বিভিন্ন পার্কগুলিতে এই ডকিং স্টেশনগুলি বসানো হবে ৷ প্রতিটি সাইকেলে থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ৷ যেমন, নিরাপত্তার স্বার্থে জিপিএস ট্র্যাকিং (GPS tracking) ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা সাইকেলের অবস্থান সর্বক্ষণ মনিটর করতে সাহায্য করবে ৷ ব্যবহারকারীরা কিউআর কোড (QR-code) স্ক্যান করে সাইকেল আনলক করতে পারবেন ৷ এর সঙ্গে যাত্রাকালীন সুরক্ষার জন্য সাইকেলগুলিতে থাকবে আলোর ব্যবস্থা ৷
স্মার্ট ডকিং স্টেশনগুলিতেও থাকবে রিয়েল-টাইমে সাইকেলের উপলব্ধতা দেখানোর ব্যবস্থা ৷ পাশাপাশি, অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা স্টেশনে পৌঁছানোর আগেও জানতে পারবেন সাইকেল উপলব্ধ আছে কি না ৷ ব্যবহারকারীদের সবরকম সুবিধা নিশ্চিত করতে, একটি ডেডিকেটেড মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে ৷ যার মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজেই নিকটবর্তী সাইকেল খুঁজে নিতে পারবেন, রাইড বুক করতে পারবেন এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে পারবেন ৷
নির্বাচিত বেসরকারি সংস্থাকেই প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত দায়িত্ব নিতে হবে ৷ এর মধ্যে রয়েছে সাইকেল কেনা, ডকিং স্টেশনগুলি তৈরি, দৈনিক কার্যক্রম পরিচালনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহক সহায়তা প্রদান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিভিন্ন স্টেশনের মধ্যে সাইকেলগুলির সুষ্ঠু পুনর্বণ্টন ৷ সাইকেলগুলি যাতে এক জায়গায় জড়ো হয়ে না-থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে অপারেটরকে ৷
অন্যদিকে, এনকেডিএ কর্তৃপক্ষ ডকিং স্টেশন তৈরির জন্য মনোনীত জমি দেবে ৷ তবে, বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং অপারেশনাল ডেটার মালিকানা নিজেদের হাতে রাখবে এনকেডিএ ৷ সেই সঙ্গে প্রকল্পকে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত সহায়তা দেবে সরকারি এই সংস্থা ৷
অন্যান্য পাবলিক মোবিলিটি প্রকল্পের তুলনায় নিউ টাউনের এই উদ্যোগটি একটি ভিন্ন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে ৷ এই সাইকেল শেয়ারিং ব্যবস্থাটি পুরোপুরি 'রেভেনিউ শেয়ারিং মডেলে'র ভিত্তিতে পরিচালিত হবে ৷ অর্থাৎ, এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনও প্রকার আর্থিক ভর্তুকি বা ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং দেওয়া হবে না ৷ এই বিশেষ শর্ত প্রকল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং স্বনির্ভরতা সুনিশ্চিত করবে বলে জানাচ্ছে কর্তৃপক্ষ ৷
আর্থিক দরপত্রগুলি মূল্যায়ন করার সময় দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থা মোট রাজস্বের কত শতাংশ এনকেডিএ-র সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে ৷ অর্থাৎ, যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন হবে, তার কত শতাংশ সরকারকে দেবে, তার উপর নির্ভর করে বরাত দেওয়া হবে ৷ এই মডেলের কারণে প্রকল্পটি শুরু থেকেই আর্থিকভাবে টেকসই হবে বলে মনে করছেন এনকেডিএ কর্তৃপক্ষ ৷
এই নিয়ে আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিউ টাউনের মতো জায়গা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার হিসেবে মানানসই ৷ যার লক্ষ্য হল একটি টেকসই, স্বাস্থ্যকর শহুরে পরিবহণ নেটওয়ার্ক তৈরি করা ৷ এনকেডিএ আশা করছে যে, স্বল্প দূরত্বের জন্য সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার মাধ্যমে লোকজনের গাড়ি-নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে ৷ এর ফলে নিউটাউন আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে ৷
বর্তমানে দরপত্র প্রক্রিয়া পুরোদমে চলছে ৷ জানা গিয়েছে, আগামী 7 নভেম্বর এই প্রকল্পের প্রাক-দরপত্র বৈঠক (Pre-bid meeting) হওয়ার কথা রয়েছে ৷ যদি সমস্ত প্রক্রিয়া সময়মতো শেষ হয়, তবে নিউ টাউনের বাসিন্দারা অচিরেই এই সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন ৷ সেই সঙ্গে নিউটাউন শহর এক সত্যিকারের সবুজ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে ৷

