ন্যাজাট পথ দুর্ঘটনা: শেখ শাহজাহান-সহ 8 জনের বিরুদ্ধে দায়ের হল খুনের মামলা
ন্যাজাট-কাণ্ডে এবার শেখ শাহজাহান-সহ আট জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের সাক্ষী ভোলানাথের। দুর্ঘটনার একদিন পরেও অধরা অভিযুক্ত ট্রাকচালক।

Published : December 11, 2025 at 7:54 PM IST
বসিরহাট, 11 ডিসেম্বর: ন্যাজাট-কাণ্ডে 'ষড়যন্ত্রকারী' হিসেবে জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের নাম বারবার সামনে এসেছে। রহস্যজনক গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত সিবিআইয়ের করা মামলায় অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষের পরিবারও শাহজাহানের বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের চক্রান্তের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিলেন। এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে ন্যাজাট-কাণ্ডে শাহজাহান-সহ তাঁর সহযোগী 8 জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করলেন গাড়ি দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ভোলানাথ ঘোষ।
বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তিনি তাঁর আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে খুনের অভিযোগ দায়ের করেন স্থানীয় রাজবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে । এদিকে গাড়ি দুর্ঘটনার 24 ঘণ্টা পরেও অধরা অভিযুক্ত ঘাতক ট্রাকচালক আব্দুল আলিম মোল্লা। ঘটনার পর তিনি কোথায় উধাও হয়ে গেলেন ? তাঁর মাথায় কী প্রভাবশালী কারও হাত রয়েছে ? পুলিশই বা কেন এখনও পলাতক অভিযুক্তের খোঁজ পেল না ? এমনই সব প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে ।
অভিযোগ দায়েরের পর খুন, খুনের চেষ্টা-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বসিরহাট জেলা পুলিশের এক পদস্থ কর্তা। তবে, অভিযোগপত্রে শেখ শাহজাহানের নাম রয়েছে কি না, তা নিয়ে অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটেছেন ওই পুলিশ কর্তা। এ নিয়ে বিকেলের দিকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে পারেন বসিরহাট জেলার পুলিশ সুপার। যদিও অভিযোগ পত্রে শাহজাহান ও তাঁর সহযোগীদের নাম থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন সাক্ষী ভোলানাথের আইনজীবী কালীচরণ মণ্ডল।
তিনি বলেন,"আলিম মোল্লা, নজরুল মোল্লা-সহ মোট 8 জনের নামে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে শাহজাহানের নামও রয়েছে। এটা পরিকল্পিত খুন। এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।" শাহজাহান-মামলার সাক্ষীর গাড়িতে ট্রাকের ধাক্কা দেওয়ার ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, এ নিয়ে রহস্যের জটের মধ্যেই বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল বয়ারমারি পেট্রল পাম্পে গিয়ে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দেখেন পাঁচ জনের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল। বুধবার ট্রাক ও সাক্ষী ভোলানাথের গাড়ির সংঘর্ষের পর দু'টি গাড়িকেই উদ্ধার করে নিকটবর্তী ওই পেট্রল পাম্পে রেখে দেওয়া হয়েছিল।

সেখানেই বৃহস্পতিবার ফরেনসিক আধিকারিকরা গিয়ে দুর্ঘটনাগ্রস্ত দু'টি গাড়ি পরীক্ষা করেন। সূত্রের খবর, গাড়িগুলির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এদিন খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি, গাড়িতে লেগে থাকা মাটি, স্টিয়ারিংয়ে আঙুলের ছাপ এবং সংঘর্ষের ফলে যে দাগগুলি গাড়িতে তৈরি হয়েছে সেগুলিও এদিন ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। তার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। বায়োলজিক্যাল নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি গাড়ির বিবরণও এদিন লিপিবদ্ধ করেছেন ফরেনসিক আধিকারিকরা।
সিবিআইয়ের মামলার পাশাপাশি ইডি আধিকারিকদের ওপর শেখ শাহজাহানের অনুগামীদের হামলার ঘটনার অন্যতম সাক্ষী এই ভোলানাথ।তবে, বুধবার তাঁর বিরুদ্ধে শাহজাহানের দায়ের করা পুরনো একটি মামলায় তিনি সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছিলেন বসিরহাট আদালতে । তার আগেই বাসন্তী হাইওয়েতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ভোলানাথের চারচাকা গাড়ি । উল্টো দিক থেকে আসা ট্রাকের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় গাড়িতে থাকা ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ ও গাড়ির চালক শাহানুর আলমের।
তবে, সেই দুর্ঘটনায় অল্পবিস্তর জখম হলেও বরাত জোরে বেঁচে যান শাহজাহান মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ। এখনও তিনি যথেষ্ট আতঙ্কিত।ছেলে হারানোর যন্ত্রণায় কার্যত মুষড়ে পড়েছেন তিনি। তবে, চোয়াল শক্ত করে শাহজাহান ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ৷
রাজবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ জানানোর পর ভোলানাথ বলেন, "শাহজাহানের সঙ্গে এক সময়ে আমার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। সেই ব্যবসায়িক সম্পর্ক পরবর্তীতে বিবাদের রূপ নেয়। ওর জন্য আমার সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গিয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করে লুটপাট করা হয়েছিল। শাহজাহানের বিরুদ্ধে ইডি ও সিবিআইয়ের কাছে তথ্য তুলে দিয়েছিলাম । 2024 সাল থেকে অন্তত দশ বার আমাকে ডাকা হয়েছে । সহযোগিতা না-করলে গ্রেফতার হয়ে যেতাম। আলিম মোল্লা শাহজাহানের হয়েই যত বেআইনি কাজ করে থাকে। লুটপাট, মারধর, গায়ের জোরে ভেড়ি দখল এগুলো ছিল আলিমের কাছে জলভাত। ওর কোনও শিক্ষা দীক্ষা নেই। তোলাবাজি, মস্তানি করে বেড়ায়।"

এর পরেই শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ করেন ভোলানাথ। তাঁর কথায়, "জেলে বসেই শাহজাহান তার সাম্রাজ্য চালাচ্ছে। সেখান থেকেই বসে সে খুনের পরিকল্পনা করে । আমার আশঙ্কা আমার পুরো পরিবারকে শাহজাহান শেষ করে দেয় কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছি। তবে আমি মনে করি হিংস্র বাঘের দাঁত ভেঙে গেলে সে আর কামড়াতে পারে না। পুলিশ প্রশাসনের ওপর ভরসা রয়েছে । আশা করি, তারা নিশ্চয় যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের ধরবে।"
অন্যদিকে, দুর্ঘটনাস্থলের 400 মিটার দূরে একটি পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি-তে ভোলানাথ ঘোষের নীল রঙের গাড়িটি যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে । একটি বাইকে করে দু'জনকেও সেখান থেকে যেতে দেখা যাচ্ছে । মনে করা হচ্ছে, ওই বাইকে করেই ঘাতক ট্রাকের চালক আব্দুল আলিম মোল্লা পালিয়েছে । তাকে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে নজরুল মোল্লা নামে লাউখালির এক বাসিন্দার। এই নজরুল মোল্লাকেই এক সময়ে ট্রাকটি বিক্রি করে দেন স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য আব্দুল সামাদ মোল্লা। এমনটাই দাবি পরিবারের ৷
যদিও খাতায় কলমে এখনও ট্রাকের মালিক আব্দুল সামাদ। ট্রাক চালক আলিম মোল্লার মতো এই দু'জনেরও হদিশ মিলছে না ঘটনার পর থেকে। ফলে ন্যাজাট-কাণ্ডে পরতে পরতে বাড়ছে রহস্য! সেই রহস্য ভেদ করতে তদন্তের গতি-প্রকৃতি কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ সেদিকেই এখন তাকিয়ে সকলে।

