নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা, পাহাড়ে ধস নামার আগেই সতর্ক করবে মোবাইলের অ্যালার্ম
প্রতিবেশী দেশের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়েছে রাজ্য ৷ দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্শিয়াংয়ের মতো পার্বত্য এলাকার সুরক্ষায় নবান্নের বিশেষ উদ্যোগ ৷ সুরজিৎ দত্তর প্রতিবেদন ৷

Published : September 2, 2026 at 9:26 PM IST
কলকাতা, 2 সেপ্টেম্বর: নেপালে হড়পা বান ও ধসে ইতিমধ্যেই 700-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে । প্রতিবেশী দেশের এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নড়েচড়ে বসল রাজ্য প্রশাসন । দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াংয়ের মতো পার্বত্য অঞ্চলগুলিকে সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে নবান্ন । পাহাড়ে এবার ধস নামার আগেই সাধারণ মানুষকে সতর্ক করবে আধুনিক প্রযুক্তি । বিপদের আঁচ পেলেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বাজতে শুরু করবে মোবাইলের অ্যালার্ম ।
রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, নতুন এই প্রযুক্তি চালু হলে ধসপ্রবণ এলাকার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সমস্ত মোবাইল ফোনে বিপদবার্তা পৌঁছে যাবে । শুধু তীব্র শব্দে অ্যালার্ম বাজাই নয়, মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠবে সতর্কবার্তাও । পরবর্তী 15 থেকে 30 মিনিটের মধ্যে ঠিক কোন জায়গায় ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে, তা পরিষ্কার লেখা থাকবে সেখানে । সেই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের কী করা উচিত এবং কীভাবে তাঁরা সুরক্ষিত থাকবেন, তার নির্দিষ্ট নির্দেশিকাও দেওয়া থাকবে ওই বার্তায় । এর ফলে বিপদ ঘটার আগেই মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন । পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত করতে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া বা জিএসআই-এর সঙ্গে একটি মউ স্বাক্ষর করেছে রাজ্য সরকার ।
কীভাবে কাজ করবে এই গোটা ব্যবস্থাটি ?
প্রশাসনিক আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, পাহাড়ের নির্দিষ্ট এলাকার বৃষ্টির পরিমাণ, মাটির আর্দ্রতা এবং আবহাওয়ার যাবতীয় তথ্য যাচাই করে তবেই রিয়েল টাইম পূর্বাভাস দেওয়া হবে । ধসপ্রবণ এলাকাগুলিকে নির্ভুলভাবে আগে থেকে চিহ্নিত করতে অতীতের পরিসংখ্যানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে । পাশাপাশি, আবহাওয়ার আরও নিখুঁত আপডেট পেতে পাহাড়ে ওয়েদার স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।
নবান্ন সূত্রে খবর, চলতি বছরেই রাজ্যে ক্যাপ শ্যাচেট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেল ব্রডকাস্টিং সিস্টেম চালু হয়েছে । কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস থাকলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই স্থানীয়দের ফোনে অ্যালার্ম বাজিয়ে সতর্ক করা হয় । এবার পাহাড়ে ধসের আগাম খবর দিতেও এই একই পদ্ধতি ব্যবহার হবে ।
পাহাড়ের বর্তমান জনবিন্যাস নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে । আগের তুলনায় পাহাড়ে বাড়ি, হোটেল এবং অন্য কংক্রিটের নির্মাণের সংখ্যা যেমন বহুগুণ বেড়েছে, তেমনই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পর্যটকদের আনাগোনা । ফলে এখন কোথাও আচমকা ধস নামলে প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেক বেশি । তাই বিপদ এড়াতে সাধারণ মানুষকে আগেভাগে সতর্ক করার উপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে । প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পাশাপাশি আপৎকালীন পরিস্থিতিতে আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করতে দুর্যোগ মোকাবিলা স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাও বাড়াচ্ছে রাজ্য ।
নতুন এই উদ্যোগে স্থানীয়দের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন পর্যটকরাও । পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে যাওয়ার আগে সেখানকার ভূমিধসের পুরনো ইতিহাস খুব সহজেই জেনে নিতে পারবেন তাঁরা । পাশাপাশি ধসের জেরে পাহাড়ি রাস্তা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা যাত্রা শুরুর আগেই জেনে নিয়ে নিজেদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সুরক্ষিত করতে পারবেন পর্যটকরা ।
রাজ্য সরকারের তরফ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে । এই তথ্য বলছে, দেশের ধসপ্রবণ এলাকার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে রয়েছে তিস্তা ভ্যালি । এই তিস্তা ভ্যালি ঠিক কি না এবং পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে । প্রত্যেক বছরই নিয়ম করে এই তিস্তা ভ্যালিতে ছোট বড় ধস নামে । এবং জীবনহানির ঘটনা ঘটে । বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ তিস্তাতে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং 10 নম্বর জাতীয় সড়কের অবস্থানের কারণে একটি হাইয়ার সেনসিটিভ জোন হিসাবে চিহ্নিত করেছে ।
বিগত পাঁচ বছরের তথ্য বলছে, দার্জিলিং-কালিম্পং-সহ রাজ্যের পাহাড়ি এলাকাগুলিতে ধসের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে । 2021 থেকে 2024, এই সময়কালে প্রায় পাঁচ থেকে দশটি ছোট বড় ধস বৃষ্টির সময় নেমেছিল । 2024-এ এই ধসের কারণে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সিকিম এবং কালিম্পং বিচ্ছিন্ন হয়েছিল । 2025-এ এই ধসের সংখ্যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে আরও বেড়েছে, এমনটাই রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে । ফলে এই অ্যালার্ম সিস্টেম, সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে একটা ব্রহ্মাস্ত্র হতে পারে ।

