সন্দেশখালিতে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় গ্রেফতার মুসার ভাই-সহ আরও তিন
পুলিশের উপর হামলার ঘটনার দু'দিনের মাথায় মুসার বড় ভাই-সহ দুই ভাইপো গ্রেফতার হওয়ার পর সবমিলিয়ে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল 12।

Published : January 5, 2026 at 2:41 PM IST
সন্দেশখালি, 5 জানুয়ারি: সন্দেশখালিতে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় এবার মূল অভিযুক্ত মুসা মোল্লার ভাই-সহ আরও তিন জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃতদের নাম মুরতাজা মোল্লা, তাঁর দুই ছেলে মন্তাজুল মোল্লা এবং মনোয়ার হোসেন মোল্লা। পুলিশ সূত্রে খবর, ফোনের টাওয়ার লোকেশনের সূত্র ধরে রবিবার ভোরে দক্ষিণ 24 পরগনার জীবনতলা থানা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই হদিশ মেলে পলাতক এই তিন অভিযুক্তের। এর আগে এই ঘটনায় এক মহিলা-সহ মোট 9 জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
ঘটনার দু'দিনের মাথায় মুসার বড় ভাই-সহ দুই ভাইপো গ্রেফতার হওয়ায় সবমিলিয়ে গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল 12। সোমবার ধৃত এই তিনজনকে বসিরহাট মহকুমা আদালতে পেশ করে পুলিশ। তবে, পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় দু'দিন পরেও খোঁজ নেই জমি 'হাঙর' বলে পরিচিত শেখ শাহজাহানের অনুগামী মুসা মোল্লা। তিনি কোথায় লুকিয়ে আছেন, কেন তাঁকে ধরা যাচ্ছে না, এর পিছনে কারও মদত রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা পুলিশের কাছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, মূল অভিযুক্ত মুসা মোল্লাকে ধরা গেলেই সেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। তাই, হন্যে হয়ে তাঁর খোঁজে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে রাজবাড়ি ফাঁড়ির পুলিশ।
এই বিষয়ে বসিরহাট জেলা পুলিশের এক পদস্থ কর্তা বলেন, "ধৃত এই তিন জনকে হেফাজতে নিয়ে মুসার লুকিয়ে থাকার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। যাতে তাঁর নাগাল পাওয়া সম্ভব হয়। তদন্ত দ্রুত গতিতে চলছে। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না।" এদিকে, ঘটনার পর থেকে মূল অভিযুক্ত শাহজাহান ঘনিষ্ঠ মুসা মোল্লার একের পর কীর্তি সামনে আসতে শুরু করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, মুসা জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের পোষা গুণ্ডা। তাঁর কায়দাতেই কৃষিজমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে দেওয়া, গায়ের জোরে সাধারণ মানুষের জল দখল করে সেখানে রাতারাতি ভেড়ি বানানো মুসার কাছে ছিল জলভাত। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাঁর উপর নেমে আসত অত্যাচারের খাঁড়া ৷ অভিযোগ, মারধর, লুটপাট করা ছিল মুসার দৈনন্দিন রুটিন। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনও লাভ হত না বলে অভিযোগ। যার ফলে দিনদিন এলাকায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন ত্রাস ৷

মাস কয়েক আগে বাসন্তী হাইওয়ের পাশে চুঁচুড়া মোড়ে এভাবেই এক ব্যক্তির জমি রাতারাতি দখল করে সেখানে ভেড়ি তৈরি করার অভিযোগ উঠেছিল এই মুসার বিরুদ্ধে । সেই নিয়ে থানা, পুলিশ এমনকী আদালত পর্যন্ত জল গড়িয়েছিল। শেষে আদালত ওই জমির উপর 144 ধারা জারি করে । আদালতের নির্দেশে নড়েচড়ে বসে ন্যাজাট থানার অন্তর্গত রাজবাড়ি ফাঁড়ির পুলিশও । নোটিশ দিয়ে মুসাকে থানায় এসে তলব করা হয় । পুলিশের তরফে বেশ কয়েকটি তলবি নোটিশ দেওয়া হলেও তাতে সাড়া দেননি তিনি।
এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে পুলিশের কাছে খবর আসে, আদালতের জারি করা 144 ধারা ভেঙে সেই জমি-সহ আশপাশে অবৈধভাবে দখল করছেন মুসা মোল্লা। সেই খবর পেয়ে রাতেই ন্যাজাটের হুলোপাড়ায় মুসার বাড়িতে হানা দেয় রাজবাড়ি ফাঁড়ির পুলিশ। সেই সময় আচমকাই মুসার দলবল হামলা চালায় পুলিশের উপর । ঘটনায় এক পুলিশ অফিসার-সহ আরও তিন পুলিশকর্মী জখম হন। তবে, পুলিশের হাত থেকে মূল অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়া-সহ একাধিক অভিযোগে মুসার এক আত্মীয়-সহ মোট ন'জনকে সেই সময় গ্রেফতার করা হয়েছিল । হামলার ঘটনায় মুসার পাশাপাশি তাঁর বড় ভাই মুরতাজা মোল্লা এবং মুসার দুই ভাইপোও সমানভাবে যুক্ত ছিলেন । তাই, তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই ঘটনা দু'বছর আগে সন্দেশখালিতে ইডি'র উপর হামলার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে । 2024 সালের 5 জানুয়ারি রেশন দুর্নীতি মামলার তদন্তে তৎকালীন তৃণমূলের দাপুটে নেতা শেখ শাহজাহানের আকুঞ্জিপাড়ার বাড়িতে গিয়ে ঠিক একইভাবে হামলার মুখে পড়তে হয়েছিল ইডি আধিকারিকদের। শেষ পর্যন্ত শাহজাহান অনুগামীদের হাতে মার খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় সেখান থেকে ফিরে আসতে হয় তাঁদের। দু'বছরের মাথায় ফের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল পুলিশের ক্ষেত্রে।
অন্যদিকে, পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় এবার মুখ খুলেছেন জেলবন্দি শেখ শাহজাহান ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের 'হুমকি'র মুখে পড়া সন্দেশখালির মণ্ডল পরিবারের সদস্য নির্মলকুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, "নিরীহ মানুষকে মারধর, বাড়ি থেকে উৎখাত করা মুসার স্বভাব । 2011 সাল থেকেই শাহজাহান ওকে পুষে রেখেছে । বেআইনি কাজে জুরি মেলা ভার মুসার ৷ সরবেড়িয়ায় শেখ শাহজাহান মার্কেটেও কুকর্ম করত সে । নামেই ছিল ওর মাছের কারবার। পিছনে করত যত বেআইনি কারবার । মুসা একজন কুখ্যাত দুষ্কৃতী। ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তাভীনতায় ভুগছি আমরা। যেখানে পুলিশের কোনও নিরাপত্তা নেই, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় ? যারা অশান্তি করছে তাদের ধরে জেলে দেওয়া হোক।"

