ETV Bharat / state

মৃত ভেবে শেষকৃত্য করেছে পরিবার, সেই কিশোর 35 বছর পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরলেন

13 বছর বয়সে কাজে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন ৷ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রায় এক বছর হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন ৷

Missing man returns home
জাহিদ শেখ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 30, 2025 at 5:51 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 30 নভেম্বর: রাখে হরি মারে কে ৷ 35 বছর পর আগে হারিয়ে যাওয়া 'কিশোর' সশরীরে উপস্থিত নিজের বাড়িতে ৷ সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান ৷ যদিও 13 বছর বয়সি ওই 'কিশোর' জাহিদ শেখ এখন 48 বছরের ব্যক্তি ৷ তবে এতদিন পর তাঁর বাড়ি ফেরার ঘটনায় শনিবার রাত থেকে শোরগোল পড়ে গিয়েছে মালদা জেলার কালিয়াচক থানার নওদা যদুপুর গ্রামের নয়াগ্রাম এলাকায় ৷ রবিবার সকাল হতে না হতেই মানুষের ভিড় উপচে পড়েছে ওই ব্যক্তির পৈতৃক বাড়িতে ৷

কীভাবে নিখোঁজ হন ?

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল ৷ তাই হাল ফেরাতে মাত্র 13 বছর বয়সেই ঘর ছেড়েছিল জাহিদ শেখ ৷ শ্রমিকের কাজ করতে পাড়ি দিয়েছিল পঞ্জাবে ৷ কিন্তু সেখানে কাজ করতে করতে একদিন দলছুট হয়ে পড়ে সে ৷ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি ৷ একসময় অভিভাবকরাও হাল ছেড়ে দেন ৷ কয়েক বছর গড়িয়ে যাওয়ার পরও ওই কিশোরের সন্ধান না-পেয়ে বাড়ির লোকজন ধরে নেন, সে আর বেঁচে নেই ৷ ইসলামি নিয়মে তার শেষকৃত্যও সম্পন্ন করে দেওয়া হয় ৷ কিন্তু সবাইকে অবাক করে 35 বছর পর বাড়ি ফিরলেন সেই জাহিদ শেখ ৷

জাহিদ শেখকে নিয়ে শোরগোল কালিয়াচকে (নিজস্ব ভিডিয়ো)

বাড়ি ফিরে তিনি জানিয়েছেন, পঞ্জাবে কাজ করার সময় একদিন তিনি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন ৷ স্থানীয় লোকজন তাঁকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করে দেন ৷ প্রায় এক বছর হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি ৷ বছর দেড়েক পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান ৷ কিন্তু বাড়ি ফেরার মতো পরিস্থিতি তাঁর ছিল না ৷ সেই সময় এক দয়ালু ব্যক্তি তাঁকে নিজের আশ্রয়ে রাখেন ৷

Missing man returns home
কালিয়াচকে জাহিদ শেখকে দেখতে মানুষের ভিড় (নিজস্ব ছবি)

ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে তিনি ওই ব্যক্তির হয়ে কাজ শুরু করেন ৷ বেশ কয়েক বছর পর তিনি সেখান থেকে দিল্লির গাজিয়াবাদে চলে যান ৷ সেখানে কাজকর্ম শুরু করেন ৷ গাজিয়াবাদেই তাঁর নতুন জীবন গড়ে ওঠে ৷ সেখানকার এক যুবতীকে বিয়ে করে তিনি গাজিয়াবাদেই সংসার পাতেন ৷ তাঁদের সাতটি ছেলেমেয়ে হয় ৷ ইতিমধ্যে দু'জনের বিয়ে দিয়েছেন ৷

কী বলছেন স্থানীয়রা

নওদা যদুপুর গ্রামের বাসিন্দা উমর ফারুক বলছেন, "35-36 বছর আগে জাহিদ এখান থেকে কাজে চলে যায় ৷ এতদিন তার কোনও সন্ধান মেলেনি ৷ হঠাৎ সেই ছেলে বাড়ি ফিরে এসেছে ৷ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনও সন্ধান না-পেয়ে পরিবারের লোকজন ওর আশা ছেড়েই দিয়েছিল ৷ ওর শেষকৃত্যও হয়েছিল ৷ ও নাকি সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ৷ পরে ও গাজিয়াবাদে চলে যায় ৷ সেখানে ও বিয়ে করেছে ৷ সংসার পেতেছে ৷"

Missing man returns home
35 বছর পর বাড়ি ফিরলেন নিখোঁজ ব্যক্তি (নিজস্ব ছবি)

জাহিদের দাদা মহম্মদ সুলতান শেখের কথায়, "35 বছর বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দিয়েছে ভাই ৷ আমরা ওকে অনেক খুঁজেছি ৷ বাইরেও খুঁজতে গিয়েছি ৷ কোথাও ওর খোঁজ পাইনি ৷ তবে আমরা ওর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে জানাইনি ৷ আমরা ভেবে নিয়েছিলাম, ও বেঁচে নেই ৷ শেষ পর্যন্ত ও ফিরে এসেছে ৷ আমরা খুব খুশি ৷ ও যে বাড়ি ফিরে আসছে, আগে আমাদের জানায়নি ৷ ও এলেই জাহিদ কি না তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল ৷ কিন্তু ওর শরীরে বিশেষ চিহ্ন দেখে আমরা বুঝে গিয়েছি, ও-ই জাহিদ ৷"

কেন বাড়ি ফিরলেন ব্যক্তি ?

এদিকে জাহিদ নিজে বলেন, "12-13 বছর এই বাড়িতেই কাটিয়েছি ৷ তারপর 35 বছর বাইরে ছিলাম ৷ গাজিয়াবাদে বেশিরভাগ সময় থেকেছি ৷ পঞ্জাবে আমার দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৷ এক বছর হাসপাতালে বেহুঁশ হয়ে পড়ে ছিলাম ৷ দু'বছর পর ঠিকমতো হুঁশ ফিরে আসে ৷ আমাকে ওখানে অনেকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার বাড়ি কোথায় ৷ আমি সবাইকেই জানিয়েছিলাম মালদা জেলার যদুপুরে আমার গ্রাম ৷ মালিককে দিয়ে চিঠি লিখিয়ে আমি বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম ৷ কিন্তু মালিক জানান, 10 বার আমার বাড়িতে চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি ৷ বারবার চিঠি ফেরত চলে আসছে ৷ তখন আমি তাঁকে বলি, আর চিঠি পাঠিয়ে কাজ নেই ৷ আমি ওখানেই কাজকর্ম করব ৷ পরে বাড়ি যাব ৷ এরই মধ্যে আমি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি ৷ বেঁচে থাকার কথা ছিল না ৷ সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই ৷ ঠিক হওয়ার পর আমি গাজিয়াবাদ চলে যাই ৷ বিয়ে করি ৷ ছেলেমেয়ে হয় ৷ এসব নিয়ে এতদিন বাড়ি ফিরতে পারিনি ৷"

Missing man returns home
13 বছর বয়স থেকে খোঁজ মিলছিল না জাহিদ শেখের (নিজস্ব ছবি)

তিনি আরও বলেন, "একসময় বাচ্চারা বলে, আমারও তো বাবা-মা আছে, ঘর আছে, পরিবার আছে ৷ বাচ্চারা আমার ঘর দেখার জেদ করে ৷ বাড়ির সবার সঙ্গে মিলিত হতে চায় ৷ তাই ওদের নিয়ে এবার বাড়ি ফিরেছি ৷ অনেকে বলছে, এসআইআর শুরু হওয়ার জন্য আমি এখানে এসেছি ৷ কিন্তু আমার বাড়ি ফেরার সঙ্গে এসআইআর-এর কোনও সম্পর্ক নেই ৷ আমি হাপুর কেন্দ্রের ভোটার ৷ ভোটার কার্ডে আমার বাবার নামও রয়েছে ৷ এতদিন আমি ওখানেই ভোট দিচ্ছি ৷ এখানে সবার সঙ্গে মিলিত হতে এসেছি ৷ এবার থেকে প্রতি বছর বাড়ি আসব ৷ গাজিয়াবাদে এখনও পাঁচ ছেলেমেয়ে রয়েছে ৷ গাজিয়াবাদে আমি একটি পোলট্রি কোম্পানিতে কাজ করি ৷ ভবিষ্যতে পাকাপাকিভাবে এখানে চলে আসার ইচ্ছে রয়েছে ৷"