মিটিং-মিছিলের ঝামেলা নয়, পড়াশোনা-ভবিষ্যতে মন দিক তরুণরা ! বার্তা সংখ্যালঘু মহলের
তরুণদের অন্যের প্ররোচনায় পা না-দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে । ইটিভি ভারতের শামশের আলীর প্রতিবেদন ৷

Published : September 2, 2026 at 4:58 PM IST
কলকাতা, 2 অগস্ট: রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল বা সমাবেশে গিয়ে সাময়িক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ার বদলে তরুণ প্রজন্মকে পড়াশোনা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মন দেওয়ার পরামর্শ উঠে এসেছে বিভিন্ন সংখ্যালঘু মহল থেকে । বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখার কথা বলা হয়েছে । কারণ, একটি মিছিল বা জমায়েতে ঘটে যাওয়া ছোট কোনও ঘটনাও কখনও বড় সংঘাতের চেহারা নিতে পারে । তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শিক্ষা ও কর্মজীবনেও ।
রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পালটা ধাওয়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে মিছিলে থাকা সাধারণ তরুণরাও সমস্যায় পড়তে পারেন । কোনও ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না-থেকেও তাঁদের আইনি জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে । আবার কোনও ঘটনার গায়ে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া হলে তার অভিঘাত আরও বড় হতে পারে । এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক উত্তেজনা এবং প্রতিশোধের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না ।
এই কারণেই তরুণদের অন্যের প্ররোচনায় পা না-দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে । রাজনৈতিক মত বা সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা থাকলেও সেই অধিকার যেন কোনওভাবেই হিংসা, বেআইনি কাজ বা সংঘাতের কারণ না-হয়, সেই বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে ।
সংখ্যালঘু যুবকদের আলাদা করে নয়, সমস্ত সম্প্রদায়ের তরুণদেরই শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দিকে মন দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন আইনজীবী সৈয়দ নাসিরুল ইসলাম । তাঁর মতে, "এই বয়সে কেউ পড়াশোনা করছেন, কেউ চাকরির সন্ধান করছেন । তাই এমন কোনও বক্তব্য বা প্ররোচনায় কান দেওয়া উচিত নয়, যার জন্য একজন তরুণের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে ।"
তিনি বলছেন, "প্রত্যেক নাগরিকের আইনি অধিকার রয়েছে । সেই অধিকার প্রয়োগ করতে হবে দেশের আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকেই । অন্যায় বা বেআইনি কাজে নিজেকে না-জড়িয়ে যতটা সম্ভব ভালো শিক্ষার দিকে এগিয়ে যেতে হবে । নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ছোটদের পড়াশোনার প্রতিও নজর দিতে হবে ।"
রাজনৈতিক র্যালি বা কর্মসূচিতে গিয়ে তরুণদের অনেক সময় অন্যের প্ররোচনায় ভুল পথে চালিত হওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন তিনি । তাঁর আবেদন, "যাঁরা ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে, তাঁদের কথায় প্রভাবিত না-হয়ে নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে ।"
দেশের সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের বলেই মনে করেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল'বোর্ডের সদস্য মৌলানা আবু তালিব রহমনি । তাঁর মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা, নারীর সম্মানহানি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়ার মতো প্রবণতাকে দেশের পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ।
তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, "দেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন । স্বাধীনতার লড়াই থেকে শুরু করে দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে হিন্দু-মুসলিম-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে ।" তিনি আরও বলেন, "ধর্ম, ভাষা বা জীবনযাপনের ধরন আলাদা হলেও দেশের প্রতি দায়িত্ব সবার । তাই দেশপ্রেমে বিশ্বাসী নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে । বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্যও দেশের শান্তি, সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে ৷"
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিচয় এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে আলাদা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন দুর্গাপুর ল'কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজকর্মী নওশাদ আনোয়ার । তাঁর মতে, একজন ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুযায়ী কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন । কিন্তু একটি গোটা সম্প্রদায়কে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা ঠিক নয় ।
তিনি জানান, "রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী কাজ করবে । অন্যদিকে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেই দেশের নাগরিক হিসেবে আইনসম্মত অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন । তবে সব ক্ষেত্রেই দেশের আইন মেনে চলা এবং উত্তেজনা বা কোনও ধরনের গণ্ডগোল থেকে দূরে থাকতে হবে ৷ দেশের সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । সংখ্যালঘু হোক বা অন্য কোনও সম্প্রদায়, সবাই ভারতের নাগরিক । তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যেন দেশের শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট না-হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে ৷"
সকলের মন্তব্যে সুর আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল উঠে আসছে ৷ আসলে তরুণদের সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা বা অন্যের প্ররোচনায় এমন কোনও পরিস্থিতিতে জড়ানো উচিত নয়, যার মূল্য তাঁদের ভবিষ্যৎকে দিতে হয় । নিজেদের আইনসম্মত অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, একইসঙ্গে আইন মেনে চলা, পড়াশোনা ও কর্মজীবনের প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাই তরুণ প্রজন্মের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এই বার্তাই উঠে এসেছে সবার গলায় ।

