11 হাজার শূন্যপদে নিয়োগ, স্বচ্ছতা ফেরাতে বার্তা পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের
বৃহস্পতিবার কলকাতার মৃত্তিকা ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ৷ সেখানেই তিনি এই কথা বলেন৷

Published : June 4, 2026 at 3:59 PM IST
কলকাতা, 4 জুন: রাজ্যের ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় গতি আনতে এবং গ্রামীণ উন্নয়নের কাজকে ত্বরান্বিত করতে একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বৃহস্পতিবার কলকাতার মৃত্তিকা ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, পঞ্চায়েতের তিনটি স্তরে দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকা 11 হাজারেরও বেশি শূন্যপদে দ্রুত কর্মী নিয়োগ করা হবে৷ একই সঙ্গে রাজ্যে থমকে থাকা একশো দিনের কাজ, গ্রামীণ সড়ক যোজনা ও আবাস যোজনার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় প্রকল্প পুনরায় পুরোদমে চালু করার রূপরেখাও এদিনের বৈঠক থেকে পেশ করেন তিনি।
সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘মহাত্মা গান্ধির 'গ্রাম স্বরাজ' থেকে শুরু করে অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলের নীতি — সব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।’’
এরপরই বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ মিলিয়ে রাজ্যে মোট 11 হাজার 154টি শূন্যপদ রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরেই 9 হাজার 936টি পদ খালি। পূর্ববর্তী সরকার সাড়ে ছয় হাজার পদে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছিল৷ তবে সমস্ত শূন্যপদে একযোগে নিয়োগ না হলে কাজে গতি আসবে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাতে কোনোরকম দুর্নীতি বা অস্বচ্ছতার অভিযোগ না ওঠে, তার জন্য একটি নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে সম্পূর্ণ পরীক্ষা প্রক্রিয়া পরিচালনা করার বিষয়ে দফতর চিন্তাভাবনা করছে।
রাজ্যের গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিয়ে পঞ্চায়েত মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনার কাজ রাজ্যে ফের দ্রুতগতিতে শুরু হতে চলেছে। গত 27 মে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ কমিটির বৈঠকে রাজ্যে প্রায় 2 হাজার 790 কিলোমিটার নতুন গ্রামীণ রাস্তা এবং 45টি সেতু নির্মাণের নীতিগত অনুমোদন মিলেছে। এই প্রকল্পে কেন্দ্র এবং রাজ্যের যৌথ অংশীদারিত্বে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে বন্ধ থাকা একশো দিনের কাজের প্রকল্প পুনরায় চালু করার বিষয়েও এদিন আশ্বস্ত করেছেন দিলীপ ঘোষ। এর ফলে রাজ্যের প্রায় আড়াই কোটির বেশি জবকার্ডধারী মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। মনরেগা প্রকল্পের নাম বদলে কেন্দ্রীয় সরকার ভিবি জিরামজি (বিকশিত ভারত গ্রামীণ রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন - গ্রামীণ) করেছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ ওই প্রকল্পে 100 দিনের বদলে 125 দিনের কাজ দেওয়া হবে৷ সেই প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ আগামী 1 জুলাই থেকে যুক্ত হতে চলেছে বলে দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন৷
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রাপকদের চিহ্নিত করতে 'আবাস প্লাস 2024' সমীক্ষার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, যা 20 জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে রাজ্য গ্রামীণ জীবিকা মিশনের অধীনে চলতি অর্থবর্ষে 1 লক্ষ নতুন স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলির জন্য প্রায় 40 হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য বিপুল সংখ্যক 'লাখপতি দিদি' তৈরি করা।
প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ রুখতে এদিন বেশ কিছু কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন দিলীপ ঘোষ। তিনি জানান, স্বচ্ছ ভারত মিশনের আওতায় রাজ্যের জন্য প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে কেন্দ্র। কিন্তু কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক পঞ্চায়েতকে আর্থিক তহবিল দেওয়া হলেও তারা কাজ শুরু করেনি। এই পরিস্থিতিতে কাজের গতি বৃদ্ধি করতে এবং দুর্নীতি ধরতে রাজ্যের মোট পঞ্চায়েতগুলির অন্তত 10 শতাংশ বেছে নিয়ে সেখানে 'স্পেশাল অডিট' বা বিশেষ আর্থিক নিরীক্ষা করা হবে। এছাড়া, তিন বছরের বেশি সময় ধরে একই পঞ্চায়েতে কর্মরত প্রায় 1 হাজার 100 কর্মীকে বদলি করার প্রক্রিয়া এই মাসেই শুরু হচ্ছে।
পঞ্চায়েত এলাকাগুলির সুষম উন্নয়নের জন্য আগামিদিনে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে এবং উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করতে সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতে আগামী 5 জুন থেকে পুনরায় নিয়ম মেনে গ্রাম সভা শুরু করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।
নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যেসব পঞ্চায়েতে নির্বাচিত প্রধানরা আসতে পারছেন না, সেখানে জেলাশাসক বা বিডিও-দের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থায় উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। নিয়ম মেনে উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করতে সরকার যে বদ্ধপরিকর, এদিনের ঘোষণায় তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

