ETV Bharat / state

SIR আবহে বাদুড়িয়ায় আস্ত 'বাংলাদেশি কলোনি' !

বাংলাদেশ থেকে এলেও নিজেদেরকে যাযাবর দাবি করে প্রায় শতাধিক লোকজন রীতিমতো জাঁকিয়ে বসেছেন বাদুড়িয়ার একটি পাড়ায় ৷ স্থানীয়দের অভিযোগে তুঙ্গে শাসক-বিরোধী তরজা ৷

Crowd of Bangladeshi in Baduria
বাদুড়িয়ায় বাংলাদেশিদের ভিড় (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : November 30, 2025 at 2:47 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

বাদুড়িয়া, 30 নভেম্বর: কোনওটার ওপর পলিথিনের ছাউনি দেওয়া । আবার কোনওটায় ইটের গাঁথনির দেওয়াল । পরপর এভাবেই গড়ে উঠেছে একের পর এক ঝুপড়ি । বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই । যে কারওরই মনে হতে পারে, এগুলো ভারতীয় নাগরিকদের কোনও বাসস্থান ।আদতে তা নয় ।

ঝুপড়ি ঘরের আড়ালে বসবাসকারী প্রত্যেকেই ওপার বাংলার নাগরিক । বছরের পর বছর বসবাস করতে করতে আস্ত একটা 'বাংলাদেশি কলোনি'-গড়ে উঠেছে উত্তর 24 পরগনার বাদুড়িয়ায় । এদের মধ্যে অধিকাংশেরই এদেশের ভোটার কার্ড-সহ যাবতীয় নথিপত্র তৈরি হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ । এমনকি সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন এই বাংলাদেশিরা । অভিযোগ, SIR চালু হওয়ার পরেও অচেনা লোকেদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে বাদুড়িয়ার গ্রামে ।

বাদুড়িয়ায় বাংলাদেশিদের ভিড় নিয়ে সবপক্ষের বক্তব্য (ইটিভি ভারত)

স্বভাবতই এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে । ভয়ে ভয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁদের । বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, 'SIR আবহে যেভাবে বহিরাগতদের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে তাতে এলাকায় থাকতেও রীতিমতো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে । এরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের নাগরিক । 2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় এদের কারওরই নাম নেই । তা সত্ত্বেও শাসকদলের প্রশ্রয় ও মদতে এরা এখানে থাকতে পারছে । রেশন থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডার, এমনকি আবাস যোজনার ঘরও পেয়ে গিয়েছেন কেউ কেউ ।'

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই হইচই শুরু হয়েছে বাদুড়িয়ার চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কেওটশা মাঠপাড়ায় । এ নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে দায় ঠেলাঠেলির পালা । গেরুয়া শিবির যেখানে সরাসরি শাসকদলকে দায়ী করে সুর চড়িয়েছেন । সেখানে আবার শাসক শিবির অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছে । আর এই রাজনৈতিক তরজায় ভোটের হাওয়া এখন থেকেই গরম হতে শুরু করেছে বাদুড়িয়া বিধানসভা এলাকায় ।

Crowd of Bangladeshi in Baduria
এই গ্রামেই ভিড় বাড়ছে বাংলাদেশিদের (ইটিভি ভারত)

জানা গিয়েছে, বাদুড়িয়ার কেওটশা মাঠপাড়া এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছেন শতাধিক বাংলাদেশি পরিবার । এদের মাথা গোঁজার আস্তানা বলতে পলিথিনের ছাউনি দেওয়া ঝুপড়ি ঘর । তবে, তাঁর মধ্যে কেউ কেউ আবার সরকারি আবাস যোজনার ঘর পেয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করেছেন । এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ,'বসবাসকারী এই সমস্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ এসেছেন 10 বছর আগে । আবার কেউ এসেছেন 5 বছর কিংবা 15 বছর আগে । এদের কারওর কাছেই বৈধ কোনও কাগজপত্র ছিল না । কিন্তু, এদেশে আসার পর ধীরে ধীরে ভারতীয় সমস্ত নথি বানিয়ে ফেলেন অধিকাংশই । এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র ক্ষমতায় থাকা শাসকদলের মদতেই ।'

আরও অভিযোগ, ওপার বাংলা থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় দিন দিন বেড়ে চলায় সেখানে আস্ত একটা 'বাংলাদেশি কলোনি'-ই গড়ে উঠেছে ।এসআইআর আবহে যা ঘিরে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে বিতর্ক ।

এই বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সালাম মণ্ডল বলেন,"কী আর বলব ! এখানে আমাদের থাকতে খুবই সমস্যা হচ্ছে । এত বাংলাদেশি এখানে আস্তানা গেড়ে বসে রয়েছে কিছুই বলার নেই । ইদানিং বাইরে থেকেও অচেনা লোকেদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে । প্রায় একশো বাংলাদেশি পরিবার বসবাস করছে । সরকারি সমস্ত সুযোগ সুবিধাও মিলছে । আমরা চাই প্রশাসন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক ।"

যদিও বাংলাদেশি নয়, নিজেদেরকে এদেশের 'যাযাবর' বলে দাবি করেছেন মহম্মদ সুয়াদ নামে এক বাসিন্দা । তাঁর কথায়,"2002 সালের সংশোধিত ভোটার তালিকায় বসবাসকারী অনেকেরই নাম রয়েছে । আমারও রয়েছে ।" কোথা থেকে এসেছেন সেই বিষয়ে অবশ্য স্পষ্ট কোনও উত্তর দিতে পারেননি তিনি ।

2002 সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকার লিস্টও দেখাতে পারেননি ওই বাসিন্দা । এ নিয়ে আজব যুক্তি খাড়া করেছেন । তাঁর দাবি,"ভোটার তালিকার নথিপত্র জমা দিয়ে দেওয়া হয়েছে । তাই কাছে নেই ।"

তবে, এই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছেন খোদ স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য তথা সিপিএম নেতা তারকচন্দ্র সরকার । তিনি বলেন,"এঁরা সকলেই বহিরাগত ।এককথায় বললে বাংলাদেশি । এটা ঠিক, আস্ত একটা বাংলাদেশি পাড়া গড়ে উঠেছে এখানে । এদের বেশিরভাগেরই না আছে ঘরদোর । না আছে ঠিকানা । লোটা-কম্বল নিয়ে থাকতে শুরু করেছেন এখানে । বছর দু'য়েক ধরে দেখছি হুহু করে ভোটার তালিকায় নামও উঠে যাচ্ছে বাংলাদেশিদের ।এর পিছনে মদত রয়েছে শাসকদলের ।"

এদিকে, এই ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক তরজায় জড়িয়েছে শাসক ও গেরুয়া শিবির উভয়ই । এই নিয়ে তৃণমূলের বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি বুলবুল রহমান বলেন,"বিষয়টি আমার জানা নেই । তবে, নিশ্চয় খোঁজ নিয়ে দেখব । আজকে যাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে তারা যখন ভারতের সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ঢুকল, তখন বিএসএফ কী করছিল ? আরও যেটা ভারতে আসার পর এরা যদি ভোটার তালিকায় নাম তুলেই থাকে সেই দায়িত্বও তো নির্বাচন কমিশনের । তারপরেও বিজেপি কী করে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাড়ে দায় ঠেলতে পারে ? আসলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এসব নিয়ে অভিযোগ করছে গেরুয়া শিবির । বাংলার মানুষ সব জানে, সব বোঝে । ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে চতুর্থবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্বে আসবেন তখন বিজেপি নেতাদের বড় বড় কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে ।"

যদিও এ নিয়ে পাল্টা তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে গেরুয়া শিবির । বিষয়টি নিয়ে বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার যুব মোর্চার সভাপতি পলাশ সরকার বলেন,"বাদুড়িয়ার চণ্ডীপুর পঞ্চায়েতের কেওটশা মাঠপাড়ায় যে শতাধিক বাংলাদেশি পরিবারের হদিশ মিলেছে তাতে স্পষ্ট পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের প্রয়োজনীয়তা কতখানি । এরা আমাদের করের টাকায় একদিকে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করেছে । অন‍্যদিকে, আবার খাদ্য এবং বাসস্থানে ভাগ বসিয়েছে । এদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ নেওয়া উচিত । আর তাদের থাকতে দিয়ে যে সমস্ত তৃণমূল নেতারা সহযোগিতা করেছে তাঁদেরকেও অবিলম্বে গ্রেফতার করে সাজা দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি । শাসকদল এসআইআরের বিরোধিতা কেন করছে এবার বোঝা যাচ্ছে । এই সমস্ত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক । তৃণমূল জানে, এদের ভোট না পেলে ক্ষমতায় আসা অসম্ভব । তাই, ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে ।"

প্রসঙ্গত, SIR প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই একের পর এক বাংলাদেশির হদিশ মিলতে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে । কোথাও শ্বশুরকে বাবা সাজিয়ে ভোটার লিস্টে নাম তোলা, আবার কোথাও প্রতিবেশী ভারতীয় নাগরিকের নথি কারচুপি করে ভোটার-আধার কার্ড বানিয়ে এদেশেই পাকাপাকিভাবে বসবাস করা । এসআইআর আবহে বসিরহাটের সীমান্তবর্তী গ্রাম-গুলি যেন এক একেকটা মিনি বাংলাদেশ ! তারই মধ্যে বাদুড়িয়ায় খোঁজ মিলল আস্ত 'বাংলাদেশি কলোনি'-র !